আমার রবীন্দ্রনাথ – নবনীতা দেবসেন

আমার রবীন্দ্রনাথ [ নবনীতা দেবসেন] :

আমি আঁধার বিছায়ে আছি রাতের আকাশে, তোমারি আশ্বাসে

আমাদের দক্ষিণের জানালা নিয়ে এক টুকরো চাঁদের আলো এসে পড়ত খাটের ওপরে, যেখানে আমাকে শুইয়ে মা গান করে করে ঘুম পাড়াতেন। উলটোদিকের দেওয়ালে অন্ধকার। সেখানে চকিত চৌকো আলোর সিনেমা হত রাস্তা দিয়ে গাড়ি গেলে। মা আপনমনে গান গাইতেন নীচু গলায়, আর আমি চোখ না বুজে সেই সব দেখতুম। দু’টি গান ছিল মায়ের প্রিয় ঘুমপাড়ানি গান। আস্তে আস্তে কখন যেন আমার চোখ বুজে যেত।

নবনীতা দেবসেন [ Nabaneeta Dev Sen ]
নবনীতা দেবসেন [ Nabaneeta Dev Sen ]

[ আমার রবীন্দ্রনাথ – নবনীতা দেবসেন ]

একটি ছিল, ‘তোমার সুর শুনায়ে যে ঘুম ভাঙাও সে ঘুম আমার রমণীয়।’ এটা তো স্পষ্টতই ঘুম ভাঙানোর গান, ‘জাগরণের সঙ্গিনী সে’, নিদ্রার তো নয়? আরেকটি গান, সেটিও চোখ বন্ধ করার গান নয় মোটেই, চোখ মেলে চেয়ে থাকার গান। ‘আমার মন চেয়ে রয় মনে মনে হেরে মাধুরী’। (মা গাইতেন ‘হ্যারে মাধুরী’, আজকাল অনেককে গাইতে শুনেছি ‘হেরে’ ‘মাধুরী’ কিন্তু আমার মায়েরটাই ঠিক মনে হয়)। মায়ের খুব সুন্দর গানের গলা ছিল এবং কঠিন সুরও সহজে খেলত সেখানে, তাছাড়া স-ব রবীন্দ্রসঙ্গীত মুখস্থ ছিল মায়ের। কিন্তু কখনও সর্বসমক্ষে গান গাইতে শুনিনি তাঁকে।

গানের কথাগুলো যেমনই হোক, ঘুমের সময়ে মায়ের মৃদু গলায় গান আমার দেহে মনে আরামের তুলি বুলিয়ে দিত। যদিও বড় হয়ে পরে ভেবেছি এবং কোনও জবাব পাইনি, মা অমন অদ্ভুত অদ্ভুত গান শুনিয়ে আমাকে ঘুম পাড়াতেন কেন? ঘুম পাড়ানোর গান তো নয় একটাও, দুটোই তো ঘুম ভাঙানোর, দুটোই তো জেগে থাকার গান? ঘুমিয়ে পড়ার তো কথা নেই কোনওটাতেই? ‘তোমার সুর শুনায়ে’ গানটাকে আমি মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলুম, দোতলার উত্তরের বারান্দার ফুঁই ফুলের লতার গান ওটা। ‘সন্ধেবেলার কুঁড়ি সে যে সকালবেলা তুলে নিয়ো’ স্পষ্ট তো বলাই আছে। কিন্তু আসল মজা ছিল অন্য গানটিতে। ওখানে কিছুই স্পষ্ট নয়। কোনও চেনা ছবি পাই না। কেমন সুন্দর অথচ ধাঁধার মতন। তবে হ্যাঁ, দুটো গানই ফুলের গান। তাতে সন্দেহ নেই।

আমার রবীন্দ্রনাথ - নবনীতা দেবসেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ওটাও ফুলের গান। অন্য ফুল। পদ্মফুল। চোখ বুজে দেখতুম নীল জলের মধ্যে আরও ঘন নীল ক্রেয়ন দিয়ে ঢেউয়ের লাইন টানা, তার মধ্যে একটি সাদা গোলাপি পদ্মফুল দুলে দুলে ভাসছে। ‘কূলহারা কোন রসের সরোবরে মূলহারা ফুল ভাসে জলের পরে। বাতাসে লেগে ঢেউ উঠলেই সেই পদ্মফুল কেবলই শিউরে উঠে কেঁপে কেঁপে সরে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেকটা যেন সাত ভাই চম্পার মতো করে। মা আপনমনে গুনগুন করে গাইতেন, ‘হাতের ধরা ধরতে গেলে, ঢেউ দিয়ে তায়, ঢেউ দিয়ে তায় দিই যে ঠেলে, ধরা দেওয়ার ধন সে তো নয়, নয়, অধরা মাধুরী’। মা কি কাঁদছেন? আমি চোখ বড় করে দেখে নিতে চেষ্টা করতুম।

জলে পদ্মফুলের ফুটে থাকা আমি দেখিনি তখনও, কিন্তু অনেক ছবি দেখেছি বিজয়ার কার্ডে, বইয়ের মলাটে। ওই নীল জলের মধ্যে একলা ফুলটির বাতাসে দোল খাওয়ার ছন্দের সঙ্গে সঙ্গে এক সময়ে আমি ঘুমিয়ে পড়তুম মায়ের পাশে। বড় হয়ে যাওয়ার পরে এই গানটি আমার নিজের কাছে অন্যভাবে ফিরে এসেছে এবং আমার প্রিয়তম গানের একটি হয়েছে তার নিজের জোরে। মায়ের গলায় আরও একটি গান আমার খুব আনন্দের ছিল ছোটবেলায়। আমার জন্মদিনের সকালবেলাতে ঘুম ভেঙে চোখ মেলা মাত্রই মা আমাকে আদর করে এই গানটি গেয়ে শোনাতেন, ‘এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার, আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হোলো কার!’ মা’র মুখে গানটা শোনা মানেই আজ আমার জন্মদিন!

আমার রবীন্দ্রনাথ - নবনীতা দেবসেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ছোটবেলাতে মানুষের জীবনে নানা ঝামেলা হয় রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে। একটা গানের লাইন দাদা দিদিরা আমাকে প্রায়ই গাইতে বলত, আমিও খুব খুশি হয়ে গাইতুম, ‘আকাশে উড়িছে জলহাতি, বেদনা আমার তারি সাথী”। শুনে সবাই কেন অত হাসত? গানের সময়ে আমি মনের চোখে দেখতে পেতুম নীল আকাশে এক হাসিখুশি ছোটখাটো হিপোপটেমাস ছোট ছোট ডানা মেলে বেঁটে বেঁটে হাতপা নেড়ে উড়ছে, আর আমার খুব ভালো লাগত। তখনও ডিজনি সায়েব উড়ন্ত জাম্বো হাতি বানিয়ে ফেলেননি।

প্রসঙ্গত মনে পড়ল নন্দনা বেচারির এমনি একটা অবস্থা হয়েছিল। লেকের মসজিদ দ্বীপে আমরা কয়েকজন বেড়তে গেছি অন্তরা, নন্দনাকে নিয়ে, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, অমিয়দেব, সুবীর রায়চৌধুরী। নন্দনা বছর তিনেকের, তখনও আধো আধো ভাষা। কিন্তু ওদের দিম্মার মতো, স্বাভাবিক সুরেলা গলা বলে ওরা দুই বোনেই বেশ গাইতে পারত। সুবীরের অনুরোধে ছোট্ট অন্তরা বেশ শক্ত একটি গান চমৎকার গেয়ে ফেলল, ‘হৃদয় নন্দন বনে’, আমরা খুব ধন্য ধন্য করলুম। সুবীর তখন বলল নন্দনাকে গান গাইতে। সেও প্রস্তুত।

দিদি যে সব গান গায়। তার কথাগুলো সেও জানে। রীতিমতো গাইল, ‘আধেক ঘুমে নয়ন তুমে’। যেই উদাস উদাস ভাব দিয়ে গেয়েছে ‘বনোলা থায়া, মনেলো থাথী, বাথনা নাহি কিথু— / পথেলো ধালে আথন পাতি না তাহি ফিয়ে পিথু’ সেই মিনি সাইজের বাসনাহীনার দার্শনিক গান শুনে আমরা হইহই করে হেসে ফেলেছিলুম। তারপর থেকে মাঝে মাঝেই ওই গানটা ওকে গাইতে বলা হত। আমার জলহাতির গানের মতো।

সুদূর কোন নদীর পারে গহন কোন বনের ধারে

গভীর কোন অন্ধকারে হতেছ তুমি পার—

আমার রবীন্দ্রনাথ - নবনীতা দেবসেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এখন বুঝতে পারি জীবনের অনেকগুলো ভালো গান নষ্ট হয়ে গিয়েছে ইসকুলের প্রার্থনা-সঙ্গীত, ‘অ্যাসেম্বলির প্রেয়ার সং’ হয়ে গিয়ে। কিন্তু তার দু-একটি আবার জীবনে ফিরে এসেছিল অন্য পথে। অবিস্মরণীয় হয়ে। যেমন ভুবনেশ্বর হে। আমার বাবা নরেন্দ্র দেবের মৃত্যুর দিনে বাবার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে মহাশ্বেতাদিদি একের পরে এক গান গেয়েছিলেন, পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহ ভাই’ দিয়ে শুরু। ভালোবাসা বাড়ি থেকে বাবার দেহ বেরুনোর মুখে হঠাৎ উদাত্ত কণ্ঠে গান ধরলেন কেউ ‘ভুবনেশ্বর হে, মোচন কর বন্ধন সব মোচন কর হে’।

লোকনাথ ভট্টাচার্য গেয়ে উঠেছেন। ‘প্রভু মোচন করো ভয় সব দৈন্য করহ লয়, নিত্য চকিত চঞ্চল চিত করো নিঃসংশয়! তিমিররাত্রি অন্ধ যাত্রী সমুখে তব দীপ্ত দীপ তুলিয়া ধরো হে!’ গানের কথাগুলোর গভীর অর্থ সেই প্রথম হৃদয়ঙ্গম হল। ইশকুলের প্রার্থনাসভাতে যা ঘটেনি। এটা যে প্রেয়ার সং ছিল সেটা আর মনেই পড়ল না। আমাদের সঙ্গে লোকনাথদা শ্মশানে এসেছিলেন গান গাইতে গাইতে। তখন নতুন বৈদ্যুতিক চুল্লি হয়েছে, বাবা লিখে গিয়েছিলেন তিনি বৈদ্যুতিক চুল্লি চান, ও মুখাগ্নি চান না। শবদেহের সঙ্গে হরিনাম চান না, রবীন্দ্রসঙ্গীত চান। খাট চান না, শববাহী গাড়ি চান ইত্যাদি।

বৈদ্যুতিক চুল্লি আমি সেই প্রথম দেখলুম। দেখে ঠিক মনে হল গীতার শ্লোকের বাস্তব চিত্র দেখছি। একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড, আগুনের হাঁ-মুখ উন্মোচিত হল, আর সেই করাল জ্বালামুখের মধ্যে ক্রমশ প্রবিষ্ট হচ্ছে বাবার দীর্ঘ, শান্ত শরীর, আমি কাঁটা হয়ে আছি, এই তবে শেষ, হঠাৎ গান ভেসে উঠল। আমার পাশেই। অশোকতরু গাইছেন, ‘শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে।’ আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই ওঁদের কাছে।

ফাগুন করিছে হাহা

আমার রবীন্দ্রনাথ - নবনীতা দেবসেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এক একটা গানের সঙ্গে এক একটা গলা অবিচ্ছেদ্য। যেমন, ‘ফাগুন করিছে হা হা’ গানের মধ্যে ওই হাহাকার কণিকা ছাড়া আর কেউ ওইভাবে করতে পারেননি, পারবেন না। তেমনি শাপমোচনের ‘যখন এসেছিলে, অন্ধকারে চাঁদ ওঠেনি, সিন্ধুপারে চাঁদ ওঠেনি দেবব্রত ছাড়া কারুর গলায় ভাবতে পারিনা। অনেকদিন আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছিল ‘মালা তোমার পড়ে আছে। পঙ্কজ মল্লিক ছাড়া আর কেউ ‘ভ্রমর সেথা হয় বিবাগী নিভৃত নীল পদ্ম লাগি রে’ গাইলে আমার মন ভরে না। ‘একটুকু ছোঁয়া লাগে’ শুধু সায়গলকেই গাইতে হবে। ‘খেলা যখন সাহানা দেবী, ‘এ পথে আমি যে শুধু কনক দাস গাইবেন, বাদলদিনের প্রথম কদমফুল’ রাজেশ্বরী বাসুদেব, আর আর রেখো না আঁধারে আমারে সুচিত্রা মুখোপাধ্যায়। এমনি অগুন্তি।

এক একটা গানের সঙ্গে আমাদের মনে যেমন এক একজনের গলা মিশে যায়, তেমনি আমাদের মনে এক একটা গানের সঙ্গে এক একজনের মুখ জড়িয়ে যায়। তাই না? আমার জীবনে তো দেখি তাই হয়। জীবনের এক একটা সময়কে চিহ্নিত করে গানগুলি, মুখগুলি।

যেমন, আমার তেরো-চোদ্দো বছর বয়েসের সেই কিশোর বন্ধু, তার প্রিয় গান কী, জিগ্যেস করতে, মাউথ অরগানে বাজিয়ে আমাকে শুনিয়েছিল ‘যে ছিল আমার স্বপনচারিণী’। স্বপনচারণের সম্পর্ক কিছুই হয়নি, কিন্তু ওই গানটা সেই থেকে সলিলের সলজ্জ, অল্প গোঁফের রেখা ওঠা ক্লাস টেনের মুখের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আর প্রেসিডেন্সিতে প্রথম প্রেমের আভাসে লেগে আছে—’এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুল গুলি ঝরে, আমি কুড়িয়ে নিয়েছি তোমার চরণে দিয়েছি লহো লহো করুণ করে’।

আমার রবীন্দ্রনাথ - নবনীতা দেবসেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এই সময়ে আমার সিরিয়াস মা একদিন আমার সঙ্গে একটু ঠাট্টা করে ফেলে নিজেই খুব লজ্জা পেয়েছিলেন। মা আমার এই প্রথম প্রেমের সাপোর্টার ছিলেন না। ছুটির দিনে আমি সারাক্ষণ বারান্দায় ঘুরঘুর, আর ফোনের আশেপাশে ছুঁক ছুক করি। মা হঠাৎ একদিন বলে ফেললেন ‘দিবস রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি। বলে নিজেই খুব লজ্জা পেয়ে পালিয়ে গেলেন। আমি লজ্জা পাইনি, খুব মজা পেয়েছিলুম।

এম এ পড়ার সময়ে যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্লাসমেট আমাদের গাইয়ে বন্ধু অমিতের কাছ প্রায়ই গান শুনতুম। সে তখন রেডিওতে এ ক্লাস শিল্পী, তিনবেলার প্রোগ্রাম পেত। আমার মনে বিশেষভাবে অমিতের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে দুটি গান, ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’ আর ‘বড় বেদনার মতো। ওই দুটো গান অমিত অনেকবার শুনিয়েছে। আর কারুর মুখে শুনলে ওকেই মনে পড়ে।

ওই সময়ে পূরবীদের গলাতেও অজস্র গান শুনেছি, ইচ্ছেমতো। সেও ছিল এ-ক্লাস শিল্পী। কিন্তু ফরমাস মতো ওদের কাছে যা মতে চাইতুম ওরা তাই গেয়ে দিত। ওদের সিন্দুকে ছিল অফুরান গান আর সব কথাই মুখস্থ। কেউ বই খাতা দেখে গান গাইত না আমার বন্ধুরা। রবীন্দ্রসঙ্গীতে খাতা দেখা ব্যাপারটা নিম্নশ্রেণির ছিল। গানটি তোমার ভাবনায় না থাকলে ভাব আসবে কেমন করে? এখন তো অবিশ্যি কারুরই স্মৃতিশক্তি নেই দেখি।

এখনও বনের গান বন্ধু হয়নি তো অবসান

আমার রবীন্দ্রনাথ - নবনীতা দেবসেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কিন্তু হায়, যেমন আমার উদ্দেশে আজ অবধি কেউ ‘আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছ দান’ এবং/অথবা ‘আমার পরাণ যাহা চায় তুমি তাই’ গান দুটির একটিও গায়নি, তেমনি আমার প্রেমিকদের অন্যের প্রেমে পড়া থেকে আমি কোনওদিনই নিবৃত্ত করতে পারিনি। যে দুয়েক বার আমি প্রেমে পড়েছি অবধারিত ভাবেই সেই ব্যক্তি আর কারও প্রেমে পড়ে গিয়েছে।

তখন আমার সেই প্রথম প্রেম ভেঙে যাচ্ছে, খুব মনখারাপ। মন ভালো করার একমাত্র উপায় গান শোনা। তাই প্রাণের বন্ধু যশোধরাকে ধরে গান শুনি। ওদের সদ্য নতুন বাড়ি হয়েছে যোধপুর পার্কে, একটু দূরেই আছে দীঘি, ওদের বাড়ির পিছনেই। আমরা দুজনে মাঠ কাঁটাঝোপ পেরিয়ে দীঘির পাড়ে গিয়ে আমগাছের নীচে বসতুম, গলা খুলে যশোধরা গাইত, ‘আমার এ পথ তোমার পথের থেকে অনেক দূরে আর আমি যথারীতি চোখ মুছতুম, রুমালে নয়, আঁচলে। ওটাই নিয়ম।

যশোধরার প্রসঙ্গে বলি, সে আমাদের সময়ে স্কুল ফাইনালে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হল। তার মা-বাবাকে প্রণাম করতে গেলে তাঁরা আদর করে বললেন, ‘রত্না, একটা গান কর।’ রত্না একটু থেমে থেকে গাইল, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে। সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে— এই গল্প আমাকে বলেছেন মাসিমা, যশোধরার মা নীলিমা সেনগুপ্ত। যশোধরারও কোনওদিন খাতা লাগেনি। খাতা লাগাটা চুনারি মে দাগ! সেই যে অনেক যুগ আগের ‘দেশ’-এ সনাতন পাঠক বা নীল উপাধ্যায় কোনও এক ছদ্মনামের সাপ্তাহিক কলমে সুনীল লিখেছিলেন না, একটা খোঁচা খোঁচা দাড়ি যুবক গায়িকার সামনে থেকে গানের খাতাটা কেড়ে নিয়ে পালাবে একদিন। সেটা আমাদের সকলের প্রাণের কথা ছিল।

সংসার যবে মন কেড়ে লয়

আমার রবীন্দ্রনাথ - নবনীতা দেবসেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমাকে মাঝে মাঝে ভীষণভাবে এক একটা গান পেয়ে বসে। এই ক’মাস আগে ‘সংসার যবে মন কেড়ে লয় জাগে না যখন প্রাণ’ গানটা পেয়েছিল, অস্থির লাগছিল, শোনা হচ্ছিল না কিছুতেই, যতক্ষণ না শ্রাবস্তী গিয়ে গানটা কিনে আনল। কিনে, শুনে, শান্তি। ছোট থেকেই এই বদভ্যেস আমার। এক একটা গান এক একটা সময়ে এমন পেয়ে বসে আমার মুক্তি থাকে না, না-শোনা অবধি। তক্ষুনি শুনতে ইচ্ছে করে। অর্ধশতাব্দী আগের একদিন বিকেলে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ফিরছি, সারাদিন ধরে মাথায় ঘুরছে ‘এমন দিনে তারে বলা যায়, কলেজে কাউকে ধরতে পারিনি। শোনা হয়নি। বাস থেকে নেমে সোজা মামাবাড়ি। দাদাভাই (আইএফএ র অশোক ঘোষ) সুন্দর গান গাইতে পারত, কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত না।

দাদাভাই হিন্দি সিনেমার গানে আর আধুনিকে স্পেশালিস্ট, তবু, যদি —? ওটা তখন মাঝে মাঝেই রেডিওতে বাজানো হত। দাদাভাই, তুমি কি ‘এমন দিনে তারে বলা যায়। গানটা জানো? একটু গাইবে?? দাদাভাই একটু গুনগুন করেই ধরে নিল আর পুরোটাই গেয়ে দিল মুখস্থ। স্টাইলটা একটু আধুনিকের মতো বটে, কিছুটা সতীনাথ, কিছুটা চিন্ময়, কিন্তু সুর ঠিক, কথাও ঠিক। দাদাভাইয়ের সঙ্গে সেই থেকে জড়িয়ে আছে ওই নেহাত অমিলের গান, ‘এমন ঘন ঘোর বরিষায়’, শুধু একটু আধুনিক স্টাইলে। দাদাভাইকে আর একদিন গাইতে বলতে হবে। মনে আছে কি গানটা? অর্ধ শতক আগের গান?

এ কী লাবণ্যে

এইভাবে এক একটা গান এক এক জনের সম্পত্তি হয়ে যায়। আর এক দাদা, সত্যেশ চক্রবর্তীর কথা বলি। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে, ‘এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে’ গানটি। দাদামণি ধ্রুপদী সঙ্গীতের ভক্ত এবং বিশারদ। রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, এঁরা ওঁর প্রিয় নন, বড় হালকা! কিন্তু কিছু কিছু কঠিন সুরের জটিল রবীন্দ্রসঙ্গীত ওঁর পছন্দ। কোনটা কোন রাগ ভেঙে, বা না ভেঙে, বা কীসের সঙ্গে কীসের মিশ্রণে সৃষ্টি, সব তিনি জানেন। উনি বলেন কর্ণাটকী সুর বলে এই গানটা ওঁর বিশেষ মনের মতো।

আমার রবীন্দ্রনাথ - নবনীতা দেবসেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অসাধারণ গাইতে পারতেন গানটি দাদামণি, সেদিন সন্ধেবেলায় গানটা আরেকবার ওঁর গলায় শুনতে ইচ্ছে করল বলে ওঁকে বললুম, ‘এ কী লাবণ্যে’ গাইতে। দাদামণি ধরলেন, কিন্তু এক লাইন গেয়েই থেমে গেলেন। বললেন, ‘গলায় আর সুর নেই রে। আশি বছর অনেক কিছুই কেড়ে নেয়। শুধু কি হাঁটু?’

কেড়ে নেওয়ার প্রসঙ্গে এক কেড়ে নেওয়া ছেলের মুখ মনে পড়ছে আমার। এক দুরন্ত ছেলের মুখ। দুরম্ভ আর অবাধ্য। অবাধ্য আর পাগল। চোখ বুজলে দেখতে পাই আমরা কজন দোতলার দালানে আড্ডা মারছি, একতলার সিঁড়ি দিয়ে গলা খুলে গান গাইতে গাইতে উঠে আসছে দীপংকর, ‘আমি কী কথা স্মরিয়া এ তনু ভরিয়া পুলক রাখিতে নারি—ওগো সজনী, আমার মন মানে না, অজস্র গান জানত ছেলেটা। বই লাগত না তারও। যখন তখন, হঠাৎ হঠাৎ, বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে, আমি শুনতে পাই, ‘দিন রজনী, আমার মন মানে না—

‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায় বিদায়ের পাত্রখানি’ গানটা যেমন আমার কানে একমাত্র অলোকদার গলায় বাজে। ১৯৫৭-র শেষে অধ্যাপক অমর্ত্য সেন যখন আবার কেম্ব্রিজে ফিরে যাচ্ছেন, আমরা আর্টসের ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁকে ফেয়ারওয়েল দিলুম, সেখানেই তাঁর শান্তিনিকেতনের সহপাঠী আর যাদবপুরের সহকর্মী কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এই গানটি গেয়েছিলেন। সেই থেকে ওই গানটা অলোকদারই নিজস্ব।

আধেক আঁধির কোণে

সুকুমারী ভট্টাচার্য আমার যুগে যুগে মাস্টারমশাই। ব্রেবোর্নে ইন্টারমিডিয়েটে ইংরিজি পড়িয়েছেন, যাদবপুরে এম এর সময়ে সংস্কৃত। আর মাঝখানে প্রেসিডেন্সিতে তাঁর স্বামী অমলবাবুর কাছে অনার্স পড়েছি। ছাত্রাবস্থায় সুকুমারীদিকে খুব ভয় পেতুম, কিন্তু পরে আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়েছিল। একবার অদ্ভুত এক প্রসঙ্গে তিনি একটি গানের উল্লেখ করেছিলেন, যা আমি কোনওদিন ভুলতে পারিনি।

আমার রবীন্দ্রনাথ - নবনীতা দেবসেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেশে ফিরে একক মায়ের সংসার যাপন শুরু করার পরে সুকুমারীদির সঙ্গে মাঝে মাঝে নানা বিষয়ে দীর্ঘ কথাবার্তা হত। উনি তখন এই পাড়াতেই থাকতেন। একদিন বললেন, ‘আচ্ছা, ও কখনও ফিরে এলে তুমি ওর কাছে যাবে?’ ‘কী জানি। হয়তো না। দিনে দিনে আমিও তো বদলে যাব, তিনি তো এখনই অন্য লোক।’ তখন সুকুমারীদি খানিক চুপ করে থেকে একটি গানের উল্লেখ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ঠিকই বলেছ, পুরোনো জানিয়া চেয়ো না চেয়ো না আমারে আধেক আঁখির কোণে, অলস অন্যমনে। নাঃ ওভাবে একত্রে থাকার চেয়ে এই ভালো। এখন সুকুমারীদির সঙ্গে। আমার দেখা হয় না, নাকতলায় তিনি তিনতলার ওপরে থাকেন, আমি সিঁড়ি চড়তে পারি না।

আর নীরেনদার শোনানো একটি কথা, গান নয়, কবিতা, আমাকে খুব সাহস দিয়েছিল। আমরা একদল লেখক বন্ধুবান্ধব মিলে দীঘা যাচ্ছিলুম, ইউ এস আই এস এর সেমিনারে, সুপ্রিয়দার আমন্ত্রণে, লম্বা ট্যুরিস্ট বাসে চড়ে। বাসে যাওয়ার সময়ে একবার আমার পাশে বসে ছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। এ গল্প সে গল্প চলছে। ভিতরে ভিতরে আমি তখনও খুব টলমলে, একা থাকার শুরুতে।

নীরেনদা অনেক হইচই করে পল্লীগীতি-টিতি গেয়ে, জমিয়ে দিয়েছেন। হঠাৎ বললেন, ‘তোকে একটা কবিতা শোনাই? মন দিয়ে শোন। তারপরে আবৃত্তি করলেন সেই আশ্চর্য সহজ আর মন্ত্রের মতো কবিতা, যার মূল উপদেশ ‘ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে। শুনতে শুনতে জট গেরো খুলে সরল হয়ে গিয়েছিল আমার বুকের ভিতরটা, সমুদ্রগামী বাসের জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস এসে চুপিচুপি বলে গিয়েছিল, শান্ত হ’।

সব কুঁড়ি মোর ফুটে ওঠে তোমার হাসির ইশারাতে

এক দোলের পূর্ণিমার আগের রাতের বৈতানিকে শান্তিনিকেতনে দুজনে পাশাপাশি হেঁটে গিয়েছিল, “ও আমার চাঁদের আলো’ এই গানটির সঙ্গে সঙ্গে। সেই থেকে সেই গান সেই সন্ধ্যা আর সেই যুবকের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে রয়ে গিয়েছে আমার মধ্যে। সব কুঁড়ি সত্যি সত্যি ফুটে উঠেছিল যে! তার সঙ্গে তার পরে বহুদিন বছরাত্রি এক জীবন কেটেছে আমার, ছিঁড়েও গেছে সেই দিবস রজনীর মালা, কিন্তু এই আশ্চর্য গানের কোনও ঠাই বদল হয়নি বুকের মধ্যে। গানটা তারই রয়ে গিয়েছে।

নিভৃত নীল পদ্ম লাগি রে

আমার রবীন্দ্রনাথ - নবনীতা দেবসেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এমন একটা সময় ছিল, আমি যখন বিদেশ-বিভুঁইয়ে একটু শান্তভাবেই পাগল হয়ে যাচ্ছি শিশু দুটি ভাগ্যিস ছিল, ওঁদের জন্য অনেক কাজকর্ম থাকে, দুর্ভেদ্য রুটিন থাকে ওদের, নিয়মমাফিক সংসারের কাজ করতেই হয়। সারাদিন আমাকে ব্যস্ত রাখে ওরা। আর সারারাত একা একাই অস্থির থাকি। দিন নেই রাত নেই গোপনে বুকের মধ্যে সর্বক্ষণ একটা অন্তহীন ভাঙাচোরা চলছে, কিন্তু যেন একটা কাচের জিনিস ভেঙে সহস্র খণ্ড ছড়িয়ে যাচ্ছে চব্বিশ ঘণ্টা, টুকরোগুলোর তীক্ষ্ণ সুচীমুখ, প্রত্যেকটা ছোরার মতন হিংস্র। আমি খুব বিপজ্জনক ব্যক্তি হয়ে উঠছিলুম নিঃশব্দে।

সে বিদেশি শহরে আমার সেই প্রথম বাস। আমার কোনও লোকজন ভালো লাগছিল না তখন। শুধু বাচ্চাদের নিয়ে থাকি। তাদের সঙ্গেও খুব একটা কথা বলার উপায় নেই। বড় কন্যের অস্থির প্রশ্নের উত্তর জানি না। ছোটটি খুব ছোট্ট। মা অনেক দূরে, একা একা বৈধব্যের সঙ্গে কষ্ট করে সদ্য মানিয়ে নিচ্ছেন, তখন মাকে চিঠি লিখে এসব বলা যায় না। নিতে পারবেন না। অনেক পরে যখন জেনেছিলেন, তখনও মা নিতে পারেননি।

আমার রবীন্দ্রনাথ - নবনীতা দেবসেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কথা বলি না। কেউ এলে দেখা করতে ইচ্ছে করে না, মনে হয় আমার অঙ্গে বুঝি যথেষ্ট আচ্ছাদন নেই। কথা বলতে ইচ্ছে করে না। শুনতেও না। বুকের ভিতরে যেন এক বোবা কালা কলোনি হয়েছে। আমি কোনও কিছুতেই মনস্থির করতে পারি না, না পারি একটা বই পড়তে, না এক লাইন লিখতে, না টিভি দেখতে। ও দেশের আলোর রং, বাতাসের স্পর্শ, গাছপাতা মাটির গন্ধ, সব কিছু আমার হঠাৎ অচেনা আর অনাত্মীয় মনে হচ্ছে। ওখানে নিশ্বাস নেওয়াও কঠিন। আমি সারা রাত ঘুমুই না। সারাদিন লোকজন এড়িয়ে চলি। বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিই না। সারাক্ষণ কাঁটার বিছানায়। কোথাও স্বস্তি নেই।

এমনি সময়ে আমার দুই বন্ধু অধ্যাপক তারাপদ মুখোপাধ্যায় আর ডাক্তার অমিয় দেব দুজনে মিলে এসে তারাপদর নিজের মিউজিক সিস্টেমটা আর একরাশ গানের টেপ আমার ঘরের মাঝখানে বসিয়ে রেখে দিয়ে গেলেন। গানগুলো বেশিরভাগই ব্যক্তিগতভাবে টেপ করা, সেগুলো তারাপদর প্রাণ। সেই ছিল তারাপদর নেশা, তাঁর প্রাইভেট কালেকশন। কার নতুন গান নেই তাতে? কণিকা, সুচিত্রা দেবব্রত, হেমন্ত, সুবিনয় রায়, আর অজস্র নতুন রাজেশ্বরী দত্ত।

This is my prayer to thee, my lord | Song Offerings, Gitanjali by Rabindranath Tagore
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তিনি তখন স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ-এ তারাপদর সহকর্মী। ওঁরা রোজ আড্ডা দেন আর রাজেশ্বরী গান করেন, তারাপদ সেই গান টেপ করেন। আরও আছে, নাম না জানা, অপেশাদার কিছু অসাধারণ গায়ক-গায়িকার গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত। তাদের মধ্যে আমার বন্ধু যশোধরারও গান ছিল। সেই আমার গান শোনা শুরু হল। সারাদিন সারারাত আমি গান শুনি। একটানা, নিশ্ছিদ্র। যতক্ষণ বাড়িতে থাকি গানের আড়ালে লুকিয়ে থাকি। আরাম হয়। চেনা শব্দ, চেনা সুর, ক্রমশ ‘অনাত্মীয়’ আলো বাতাসে বদল আনল।

আজন্মের পরিচিত গানগুলি আমার চারিদিকে একটা শক্তপোক্ত আপন-করা বেড়া বুনে দিতে লাগল, সুরক্ষা-বলয়। শব্দ আর সুরের জাদুতে আমি যেন একটি রেশমি গুটিপোকা হয়ে গেলুম। গুটির মধ্যে আমি আর নগ্ন নই, একা নই, আমার হাতটি শক্ত করে ধরে আছেন রবীন্দ্রনাথ। আস্তে আস্তে আমার মাথা ঠান্ডা হতে থাকল। ভিতরের ভাঙচুর কমে আসতে লাগল। আমি লিখতে শুরু করলুম। চাকরির খোঁজ শুরু করলুম। গুটি কেটে যেদিন বেরিয়ে এলুম সেদিন আমি উড়তে শিখে গিয়েছি।

নবনীতা দেবসেন  বিশিষ্ট সাহিত্যিক

আরও পড়ুন:

“আমার রবীন্দ্রনাথ – নবনীতা দেবসেন”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন