আমার রবীন্দ্রনাথ – পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী – আমার রবীন্দ্রনাথ : রবির আলোয় ভুবন দৃশ্যমান, তেমনই রবীন্দ্র চেতনার আলোকে সমগ্র যেভারতবর্ষ আলোকিত। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে ভারতবাসীর, ভারতবর্ষের পরিচয় অসম্পূর্ণ, অসম্ভব। আমাদের দেশ পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ।

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী [ আমার রবীন্দ্রনাথ ]

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী [ আমার রবীন্দ্রনাথ ]

আমি বিশ্বাস করি সম্পদের পরিমাপ অর্থ দিয়ে কখনওই সম্ভব নয়। সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মায়া-মমতা—এ সবই হল জীবনের আসল ঐশ্বর্য, যা যুগ যুগ ধরে ভারতবর্ষের বুকে লালিত। ভারতবর্ষের এই মননের সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির মধ্যে। তাঁর কথাতেই তাই মনে মনে শতকোটি বার বলি– ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’, যে দেশে জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং।

আমি যখনই তাঁর ছবি দেখি, মনে হয়, আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার পরে, সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে’। আমাদের মধ্যে বড় বেশি অহঙ্কার। এ অহঙ্কারই বারবার আমাদের পতনের কারণ ডেকে আনছে এবং আনবে। এই অহঙ্কারকে বাদ দিতে হবে। অহঙ্কার বর্জনের শিক্ষাই আসলে ভারতবর্ষের আদি সংস্কৃতি। সম্ভ কবীর বলেছিলেন, ‘ফুট কুম্ভ জল, জল হি সমানা’—কলসিকে ফুটো না করলে পুরোনো জল সেখানে চিরকাল আটকেই থাকবে।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নতুন জলে তাকে পূর্ণ করা যাবে না। রবীন্দ্রনাথের রচনায়, তাঁর গানে তাঁর কবিতায় তিনি বারংবার বলেছেন, এক বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ থেকো না, বহির্বিশ্বকে জানো, চেনো। এবং সেটা অবশ্যই নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতির ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। তিনি বলেছেন, ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি?’ অসংখ্যবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, অথচ কখনও তাঁর মধ্যে অহঙ্কার আসেনি। [পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী বিশিষ্ট সঙ্গীতকার ]

কারণ, দেশ এবং বিদেশ, ভিতর ও বাহির—এই দুই ভিন্ন দর্শন ও ভাবধারার মধ্যে তিনি সামঞ্জস্য সাধন করতে পেরেছিলেন। তাই তো আমার চোখে তিনি শ্রেষ্ঠ কবি। যিনি জগৎকে দেখেছেন, জীবনের ছোটবড় সমস্ত অনুভূতি, উপলব্ধিকে নিবিড় করে চিনেছেন। ‘ভ্রমর সেথা হয় বিবাগী, নিভৃত নীল পদ্ম লাগি।’ এই নিভৃত নীল পদ্মটি আসলে কী, কীসের জন্যই বা তিনি কান পেতে থাকেন? সেই অমৃতের সন্ধান সকলে

পান না, রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন। তাই তো আমার কাছে তিনি সত্যস্রষ্টা ঋষি। ওঁর প্রত্যেকটি কবিতা জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাব নিয়ে এসেছে। একই কবিতা ঘুরেফিরে বহু বার পড়েছি। প্রতিবারই নতুন মনে হয়েছে। ওঁর কবিতা, গান তাই কালোত্তীর্ণ, একই সঙ্গে প্রাচীন এবং নবীন। দু’টির মধ্যে এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। আর শব্দ নিয়ে ওঁর কী বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অথচ কবিতা হোক বা গান,—কোথাও, কখনও কোনও শব্দ ছন্দপতন ঘটায় না।

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী [ আমার রবীন্দ্রনাথ ]
পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী [ আমার রবীন্দ্রনাথ ]
মাঝে মাঝে ভাবি, স্বয়ং ঈশ্বর বোধহয় ওঁকে শব্দের সন্ধান দিতেন। শুধু সাহিত্য বা রচনার কথাই বা বলি কেন, বাঙালিকে তিনি যে আরও কত কিছু দিয়েছেন তার কোনও শেষ নেই। শাড়ি পরা শিখিয়েছেন, গ্রামীণ ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, এমনকী আধুনিক বাঙালির খাদ্যতালিকায় নৈনিতাল আলুর উপস্থিতির পিছনেও আছেন রবীন্দ্রনাথ।

এবার বিশেষ করে গানের কথায় আসি। রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে আমার পরিচয় তো বহু ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু একটা কথা না বলে পারছি না, ওঁর গানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক যিনি সুদৃঢ় করেছেন, তিনি আমার স্ত্রী। অত্যন্ত সুগায়িকা। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত এক অন্যরকম মাত্রায় পৌঁছোয়। বলতে দ্বিধা নেই, আজ যে আমি রবীন্দ্রনাথের গানকে এত গভীর ভাবে অনুভব করতে পারি, সেটা তাঁরই প্রত্যক্ষ প্রভাবে।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ছোটবেলা থেকেই ওঁদের বাড়িতে সুবিনয় রায়, রাজেশ্বরী দত্ত ইত্যাদি বহু গুণিজনের সমাগম ছিল। সেই দিকপালদের সংস্পর্শে থেকে তিনি যেভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বুঝেছেন, সেই শিক্ষা বা বোধ সঞ্চারিত হয়েছে আমার মধ্যেও। বলা যায়, আমার রবীন্দ্রনাথকে নিবিড়ভাবে পাওয়ায় আমার স্ত্রী সর্বদা আমার সঙ্গী।

আর কী আশ্চর্য গানই না সৃষ্টি করে গিয়েছেন এই ঋষিতুল্য মানুষটি। ওঁর গানে ধ্রুপদ, ঠুংরি, টপ্পা, লোকসঙ্গীত, পশ্চিমী ধ্রুপদী সঙ্গীত—সবকিছুই আছে, অথচ তাঁর প্রতিটি গান কী অসম্ভব স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র গায়কীর মধ্যে বজায় রাখাই একজন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর পক্ষে সবচেয়ে দুরূহ কাজ। আমি এতদিন ধরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গাইছি।

এখনও আমি নিজেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক বিনীত ছাত্রই মনে করি। সবিনয়েই বলছি, আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের গান রাগসঙ্গীতের থেকেও কঠিন। সঠিক ভাবে ওঁর গান গাইতে পারেন খুব কম শিল্পী। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় সুর প্রধান হয়ে ওঠে, নয়তো কথা। দুইয়ের সামঞ্জস্য করাটা যে অসম্ভব কঠিন, তা আমি গাইতে গিয়ে প্রতি পদে পদে অনুভব করি।

আমি তো মনে করি এত বছর ধরে শিখেও, এখনও আমি ওঁর গান গাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করিনি। আর যাঁরা স্বরলিপি দেখে ওঁর গান করেন, তাঁদের আমার সঙ্গীতের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বল্পশিক্ষিত বলেই মনে হয়। এ গান উপলব্ধির, অনুসরণের নয়। শ্রদ্ধেয় বালমুরলিকৃষ্ণন যেমন বলেন, রবীন্দ্রনাথের গান সবচেয়ে চিন্তানির্ভর, সবচেয়ে শিক্ষিত, সবচেয়ে বিচার-নির্ভর এবং সবচেয়ে বিশ্লেষণ নির্ভর যা আমাদের এক আশ্চর্য বোধের সন্ধান দেয়।

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি অনুভূতির সঙ্গে তাই গান, কবিতা ও যাবতীয় রচনা নিয়ে জাগ্রত, শাশ্বত আমার রবীন্দ্রনাথ।

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী (জন্ম: ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৫২) প্রথিতযশা ভারতীয় হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় গায়ক, সুরকার, গীতিকার ও সংগীতগুরু। তাঁকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন:

“আমার রবীন্দ্রনাথ – পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন