আমার রবীন্দ্রনাথ – মহাশ্বেতা দেবী

আমার রবীন্দ্রনাথ [ মহাশ্বেতা দেবী ] : রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন ১৮৬১ সালে। ২০১০ সালটা ধরলে বয়েসটা ১৪৯ হয়ে র যায়। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নতুন কিছু তো লেখার ধরেই, অথবা বলা চলে, তিনি চিরনতুনই থেকে যাবেন। ১৯৩৬-১৯৩৮, শান্তিনিকেতনে পাঠভবনে পড়েছি রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালে। সেদিনের আশ্রমে (আমরা শান্তিনিকেতনকে আশ্রমই বলতাম) ওই দিন পালনের কথাটাই আজ বলব।

আমার রবীন্দ্রনাথ - মহাশ্বেতা দেবী [ Mahasweta Devi ]
মহাশ্বেতা দেবী [ Mahasweta Devi ]

[ আমার রবীন্দ্রনাথ – মহাশ্বেতা দেবী ]

এ বছর, প্রতি বছরই মে মাসে ২৫ বৈশাখ আসে। শান্তিনিকেতনে তখন গরমের ছুটি। আমি যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় (হয়তো আজও) গরম দুঃসহ ছিল। আশ্রমের জলাধারে যথেষ্ট জল থাকত না। সেই জন্য নববর্ষের দিনই ২৫ বৈশাখটা পালন করা হত।

‘পাতার নাচে মেতে আছে আমলকী কানন? যে শান্তিনিকেতনে, সেখানে বৈশাখের দাবদাহ কল্পনা করা যেত না। সেদিনের শান্তিনিকেতন তো যথেষ্ট ছোট, পরিসরে। ছাত্র-ছাত্রী, অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, কর্মী ও শিক্ষক, সব মিলিয়ে জনসংখ্যা ১০০০ তো নয়, হয়তো ৩০০ থেকে ৪০০ এমনই হবে। কিংবা তার থেকেও কম। সেদিনের শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব হত। পৌষমেলা হতো। কবির জীবিতকালের কথাই বলছি। কিন্তু সে সব সময়ে কলকাতা থেকে বেশি মানুষ যেতেন না। সব উৎসবই আশ্রমিকদের নিয়ে। জন্মদিনের উৎসবের পরেই গরমের ছুটি।

শান্তিনিকেতনে আমরা অভ্যস্ত হয়েছিলাম ঘণ্টা শুনে সময় অনুযায়ী কাজ করতে। সিংহসদনে বড় ঘণ্টা বাজত ঢং ঢং করে। ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠতাম। শীতকালে সেটা খুব কষ্টের অভিজ্ঞতা। কিন্তু স্বভাবে ঢুকে গিয়েছিল শিক্ষা—সময়ের কাজ সময়ে করো। তাই পাঁচটার সময়েই উঠে পড়তাম। তারপর দৌড়ও, দৌড়ও। আজ নববর্ষ। আম্রকুঞ্জে যেতে হবে। সেদিন ভোরবেলা স্নান করে তৈরি হয়ে ঘণ্টার নির্দেশে শ্রীভবনের খিড়কির দোর খুলে লাইন বেঁধে চললাম কিচেনে।

যাওয়ার পথে বাঁদিকে পড়ে আশ্রমের শাকসবজির বাগান, জলের ট্যাঙ্ক আর কালোর দোকান। পরে কালো দিনে দিতে বিখ্যাত হয়েছে। আমার ছোটবেলার কালোর দোকানটি ছোটখাট। চা, বেকারির বিস্কুট পাওয়া যায়। আমরা ছোট। ওদিকে তাকানো নিষেধ। আমরা সেদিন যে যার আসন নিয়েছি শুধু। নববর্ষের দিন কিচেনে সরোজিনী দিদির নির্দেশে বড় বড় আটার রুটি, ঘন ছোলার ডাল আর পানতুয়া খেতাম।

আমার রবীন্দ্রনাথ - মহাশ্বেতা দেবী
আমার রবীন্দ্রনাথ – মহাশ্বেতা দেবী

তারপর বৈতালিকের ঘণ্টা। প্রভাতী বৈতালিকে নববর্ষের গান ছিল ‘এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার’, নয়তো ‘নব আনন্দে জাগো’। বৈতালিক দিয়ে আশ্রমের জীবন শুরু হয় প্রত্যহ তারপর লাইন বেঁধে আমরা চললাম আম্রকুঞ্জে। লাইব্রেরির পিছনে আম্রকুঞ্জ। সেদিন পয়লা বৈশাখ। স্বয়ং গুরুদেব থাকবেন। আগের দিনই মাস্টারমশাইয়ের (নন্দলাল বসু) বড় মেয়ে গৌরীদি আতপ চাল গোলা দিয়ে (নাকি সাদা চক গোলা দিয়ে) আলপনা দিয়েছেন। গোবর নিকোনো আঙিনায় আলপনা যেন ঝলমল করছে।

আমরা তো যে যার আসন পেতে জোড়াসন হয়ে বসে আছি। ক্ষিতিমোহন সেন উপস্থিত। সেদিনের গানের দলে থাকতেন ইন্দুদি (ইন্দুলেখা ঘোষ), সঙ্গীতভবনের ছাত্রছাত্রীরা (সকলের নাম মনে নেই), শৈলজারঞ্জন মজুমদার এসরাজ নিয়ে বসেছেন—’এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার’ গানটি খুব মনে পড়ছে।

উত্তরায়ণের দিক থেকে মস্ত গাড়ি চলে এল, গুরুদেব এলেন। গরদের পাঞ্জাবি আর ধুতি। অমন সুন্দর মানুষ আমি তো আর দেখিনি, কে-ই বা দেখেছে। গুরুদেব বসলেন। গানের পর গান হল। ক্ষিতিমোহন সেনের বক্তব্য আমার খুব ভালো লাগত, বুঝি আর না বুঝি। আর সব কিছুর পর আমাদের শান্তিনিকেতন’ গেয়েই প্রভাতী নববর্ষ বন্দনা শেষ হত। বুড়িদিও (নন্দিতা কৃপালনী) দরাজ গলায় গান গাইতেন। ১৯৩৬ সালেই মোহর মধুকণ্ঠী।

১৯৩৭ সালে সে রেকর্ড করেছিল—’গান নিয়ে মোর খেলা’ সেটা রবীন্দ্রসঙ্গীত নয়। আমাদের নববর্ষের দিন ফুরোেত রাতের বৈতালিকে ‘বিপুল তরঙ্গ রে’ গান শুনে। রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালে, তাঁর সাক্ষাৎ উপস্থিতিতে শান্তিনিকেতনে পয়লা বৈশাখেই ২৫ বৈশাখের অনুষ্ঠানে ১৯৩৬-১৯৩৮ তিন বছর যোগ দিয়েছি। ভাবলে আজ বুঝি, কী বিরল সে অভিজ্ঞতা। আর এখন, রাজ্যের মধ্যেই যখন দেখছি, ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’র সদৃশ কাণ্ড, তখন মনে হয়, তিনি স্বাধীনতা বলতে কী চেয়েছিলেন, কী বুঝেছিলেন।

শুধু গান গেয়ে ও অনুষ্ঠান করেই কি ২৫ বৈশাখ উদযাপন করলে চলবে? আর কিছু করার ছিল না বাঙালির?

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি [ Jorshanko Thakurbari ]
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি [ Jorshanko Thakurbari ]
মহাশ্বেতা দেবী একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কথাশিল্পী ও মানবাধিকার কর্মী। তিনি ১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে বর্তমান ঢাকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মহাশ্বেতা দেবীর প্রচুর রচনার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য – হাজার চুরাশির মা, রুদালি, অরণ্যের অধিকার ইত্যাদি। তার “হাজার চুরাশির মা” রচিত হয় ১৯৭০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। সেই গল্পে চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে। তিনি পদ্মশ্রী ও পদ্মবিভূষণ সহ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। পেয়েছেন সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার, র‍্যামন ম্যাগসাইসাই, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার সহ একাধিক দেশি ও বিদেশি পুরস্কারে।

আরও পড়ুন:

“আমার রবীন্দ্রনাথ – মহাশ্বেতা দেবী”-এ 3-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন