মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রকাশঃ সাধনা – আশ্বিন, কার্তিক ১৩০০

মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

নাটকের ব্যক্তিগণ:

অমরমাণিক্য – মহারাজ; চন্দ্রমাণিক্য – যুবরাজ; ইন্দ্রকুমার – মধ্যম রাজকুমার; রাজধর – কনিষ্ঠ রাজকুমার; ধুরন্ধর – ঐ মামাতো ভাই; ইশা খাঁ – সেনাপতি; আরাকান-রাজ;  প্রতাপ; নিশানধারী; ভাট; দূত; সৈনিক প্রভৃতি

মুকুটঃ প্রথম পরিচ্ছেদ

প্রথম দৃশ্য

ত্রিপুরার সেনাপতি ইশা খাঁর কক্ষ
ত্রিপুরার কনিষ্ঠ রাজকুমার রাজধর ও ইশা খাঁ
ইশা খাঁ অস্ত্র পরিষ্কার করিতে নিযুক্ত
রাজধর।
দেখো সেনাপতি,আমি বারবার বলছি তুমি আমার নাম ধরে ডেকো না।
ইশা খাঁ।
তবে কী ধরে ডাকা? চুল ধরে না কান ধরে?
রাজধর।
আমি বলে রাখছি,আমার সম্মান যদি তুমি না রাখ তোমার সম্মানও আমি রাখব না ।
ইশা খাঁ।
আমার সম্মান যদি তোমার হাতে থাকবার ভার থাকত তবে কানা কড়ার দরে তাকে হাটে বিকিয়ে আসতুম। নিজের সম্মান আমি নিজেই রাখতে পারব।
রাজধর।
তাই যদি রাখতে চাও তা হলে ভবিষ্যতে আমার নাম ধরে ডেকো না।
ইশা খাঁ।
বটে!
রাজধর।
হাঁ।
ইশা খাঁ।
হা হা হা হা! মহারাজাধিরাজকে কী বলে ডাকতে হবে? হুজুর, জনাব,জাঁহাপনা!
রাজধর।
আমি তোমার ছাত্র বটে, কিন্তু আমি রাজকুমার সে কথা তুমি ভুলে যাও।
ইশা খাঁ।
সহজে ভুলি নি, তুমি যে রাজকুমার সে কথা মনে রাখা শক্ত করে তুলেছ।
রাজধর।
তুমি যে আমার ওস্তাদ,সে কথাও মনে রাকতে দিলে না দেখছি।
ইশা খাঁ।
বস্‌। চুপ ।
দ্বিতীয় রাজকুমার ইন্দ্রকুমারের প্রবেশ
ইন্দ্রকুমার।
খাঁ সাহেব,ব্যাপারখানা কী?
ইশা খাঁ।
শোনো তো বাবা। বড়ো তামাশার কথা। তোমাদের মধ্যে এই যে ব্যক্তিটি সকলের কনিষ্ঠ এঁকে জাঁহাপনা শাহেন্‌শা বলে না ডাকলে ওঁর আর সম্মান থাকে না– ওঁর সম্মানের এত টানাটানি!
ইন্দ্রকুমার।
বল কী! সত্যি নাকি! হা হা হা হা!
রাজধর।
চুপ করো দাদা।
ইন্দ্রকুমার।
তোমাকে কী বলে ডাকতে হবে? জাঁহাপনা! হা হা হা হা! শাহেন্‌শা!
রাজধর।
দাদা, চুপ করো বলছি।
ইন্দ্রকুমার।
জনাব,চুপ করে থাকা বড়ো শক্ত, হাসিতে যে পেট ফেটে যায় হুজুর!
রাজধর।
তুমি অত্যন্ত নির্বোধ।
ইন্দ্রকুমার।
ঠান্ডা হও ভাই,ঠান্ডা হও। তোমার বুদ্ধি তোমারই থাক্‌,তার প্রতি আমার কোনো লোভ নেই।
ইশা খাঁ।
ওঁর বুদ্ধিটা সম্প্রতি বড়োই বেড়ে উঠেছে।
ইন্দ্রকুমার।
নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না,মই লাগাতে হবে।
অনুচরসহ যুবরাজ চন্দ্রমাণিক্য ও মহারাজ অমরমাণিক্যের প্রবেশ
রাজধর।
মহারাজের কাছে আমার নালিশ আছে।
মহারাজ।
কী হয়েছে ?
রাজধর।
ইশা খাঁ পুনঃপুনঃ নিষেধসত্ত্বে আমার অসম্মান করেন। এর বিচার করতে হবে ।
ইশা খাঁ।
অসম্মান কেউ করে না,অসম্মান তুমি করাও। আরো তো রাজকুমার আছেন। তাঁরাও মনে রাখেন আমি তাঁদের গুরু,আমি মনে রাখি তাঁরা আমার ছাত্র– সম্মান-অসম্মানের কোনো কথাই ওঠে না ।
মহারাজ।
সেনাপতি সাহেব,কুমারদের এখন বয়স হয়েছে,এখন ওঁদের মান রক্ষা করে চলতে হবে বৈকি।
ইশা খাঁ।
মহারাজ যখন আমার কাছে যুদ্ধ শিক্ষা করেছেন তখন মহারাজকে যেরকম সম্মান করেছি রাজকুমারদের তা অপেক্ষা কম করি নে।
রাজধর।
অন্য কুমারদের কথা বলতে চাই নে, কিন্তু–
ইশা খাঁ।
চুপ করো বৎস। আমি তোমার পিতার সঙ্গে কথা কচ্ছি। মহারাজ, মাপ করবেন, রাজবংশের এই কনিষ্ঠ পুত্রটি বড়ো হলে মুন্‌শির মতো কলম চালাতে পারবে, কিন্তু তলোয়ার এর হাতে শোভা পাবে না। (যুবরাজ এবং ইন্দ্রকুমারকে দেখাইয়া) চেয়ে দেখুন মহারাজ, এঁরাই তো রাজপুত্র, রাজগৃহ আলো করে আছেন।
মহারাজ।
রাজধর, খাঁ সাহেব কী বলছেন! তুমি অস্ত্রশিক্ষায় ওঁকে সন্তুষ্ট করতে পার নি?
রাজধর।
সে আমার ভাগ্যের দোষ, অস্ত্রশিক্ষার দোষ নয়। মহারাজ নিজে আমাদের ধনুর্বিদ্যার পরীক্ষা গ্রহণ করুন, এই আমার প্রার্থনা।
মহারাজ।
আচ্ছা, উত্তম। কাল আমাদের অবসর আছে, কালই পরীক্ষা হবে। তোমাদের মধ্যে যে জিতবে তাকে আমার এই হীরে-বাঁধানো তলোয়ার পুরস্কার দেব।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
ইশা খাঁ।
শাবাশ রাজধর, শাবাশ! আজ তুমি ক্ষত্রিয়সন্তানের মতো কথা বলেছ। অস্ত্রপরীক্ষায় যদি তুমি হার তাতেও তোমার গৌরব নষ্ট হবে না। হার-জিত তো আল্লার ইচ্ছা, কিন্তু ক্ষত্রিয়ের মনে স্পর্ধা থাকা চাই।
রাজধর।
থাক্‌ সেনাপতি, তোমার বাহবা অন্য রাজকুমারদের জন্য জমা থাক্‌; এত দিন তা না পেয়েও যদি চলে গিয়ে থাকে তবে আজও আমার কাজ নেই।
যুবরাজ।
রাগ কোরো না ভাই রাজধর। সেনাপতি সাহেবের সরল ভর্ৎসনা ওঁর সাদা দাড়ির মতো সমস্তই কেবল ওঁর মুখে। কোনো একটি গুণ দেখলেই তৎক্ষণাৎ উনি সব ভুলে যান। অস্ত্রপরীক্ষায় যদি তোমার জিত হয় তা হলে দেখবে, খাঁ সাহেব তোমাকে যেমন মনের সঙ্গে পুরস্কৃত করবেন এমন আর কেউ নয়।
রাজধর।
দাদা, আজ পূর্ণিমা আছে, আজ রাত্রে যখন গোমতী নদীতে বাঘে জল খেতে আসবে তখন শিকার করতে গেলে হয় না?
যুবরাজ।
বেশ কথা। তোমার যদি ইচ্ছে হয়ে থাকে তো যাওয়া যাবে।
ইন্দ্রকুমার।
কী আশ্চর্য! রাজধরের যে শিকারে প্রবৃত্তি হল! এমন তো কখনো দেখা যায় নি।
ইশা খাঁ।
ওঁর আবার শিকারে প্রবৃত্তি নেই! উনি সকলের চেয়ে বড়ো জীব শিকার করে বেড়ান। রাজসভায় দুই পা-ওয়ালা এমন একটি জীব নেই যিনি ওঁর কোনো-না-কোনো ফাঁদে আটকা না পড়েছেন।
যুবরাজ।
সেনাপতি সাহেব, তোমার তলোয়ারও যেমন তোমার জিহ্বাও তেমনি, দুইই খরধার– যার উপর পড়ে তার একেবারে মর্মচ্ছেদ না করে ফেরে না।
রাজধর।
দাদা, তুমি আমার জন্যে ভেবো না। খাঁ সাহেব জিহ্বায় যতই শান দিন-না কেন আমার মর্মে আঁচড় কাটতে পারবেন না।
ইশা খাঁ।
তোমার মর্ম পায় কে বাবা! বড়ো শক্ত।
ইন্দ্রকুমার।
যেমন, হঠাৎ আজ রাত্রে তোমার শিকারে যাবার শখ হল, এর মর্ম ভালো বোঝা যাচ্ছে না।
যুবরাজ।
আহা ইন্দ্রকুমার! প্রত্যেক কথাতেই রাজধরকে আঘাত করাটা তোমার অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে।
রাজধর।
সে আঘাতে বেদনা না পাওয়াও আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।
ইন্দ্রকুমার।
দাদা, আজ রাত্রে শিকারে যাওয়াই তোমার মত নাকি?
যুবরাজ।
তোমার সঙ্গে, ভাই, শিকারে করতে যাওয়াই বিড়ম্বনা। নিতান্ত নিরামিষ শিকার করতে হয়। তুমি বনে গিয়ে বড়ো বড়ো জন্তু মেরে আন, আর আমরা কেবল লাউ কুমড়ো কচু কাঁঠাল শিকার করেই মরি।
ইশা খাঁ।
(ইন্দ্রকুমারের পিঠ চাপড়াইয়া) যুবরাজ ঠিক বলেছেন পুত্র। তোমার তীর সকলের আগে ছোটে এবং নির্ঘাত গিয়ে লাগে–তোমার সঙ্গে পেরে উঠবে কে!
ইন্দ্রকুমার।
না দাদা, ঠাট্টা নয়। তুমি না গেলে কে শিকার করতে যাবে!
যুবরাজ।
আচ্ছা, চলো। আজ রাজধরের ইচ্ছে হয়েছে, ওঁকে নিরাশ করব না।
ইন্দ্রকুমার।
কেন দাদা, আমার ইচ্ছে হয়েছে বলে কি যেতে নেই?
যুবরাজ।
সে কী কথা ভাই, তোমার সঙ্গে তো রোজই যাচ্ছি!
ইন্দ্রকুমার।
তাই বুঝি পুরোনো হয়ে গেছে?
যুবরাজ।
আমার কথা অমন উল্টো বুঝলে বড়ো ব্যথা লাগে।
ইন্দ্রকুমার।
না দাদা, ঠাট্টা করছিলুম–চলো প্রস্তুত হই গে।
ইশা খাঁ।
ইন্দ্রকুমার বুকে দশটা বাণ সইতে পারে, কিন্তু দাদার সামান্য অনাদরটুকু সইতে পারে না।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
অনুচরগণ
প্রথম।
কথাটা তো ভালো ঠেকছে না হে। আমাদের ছোটো কুমারের ধনুর্বিদ্যার দৌড় তো সকলেরই জানা আছে, উনি মধ্যম কুমারের সঙ্গে অস্ত্রপরীক্ষায় এগোতে চান এর মানে কী?
দ্বিতীয়।
কেউ বা তীর দিয়ে লক্ষ্য ভেদ করে, কেউ বা বুদ্ধি দিয়ে।
প্রথম।
সেই তো ভয়ের কথা। অস্ত্রপরীক্ষায় অস্ত্র না চালিয়ে যদি বুদ্ধি চালাও সেটা যে দুষ্টবুদ্ধি।
তৃতীয়।
দেখো বংশী, অস্ত্রই চলুক আর বুদ্ধিই চলুক মাঝের থেকে তোমার ঐ জিভটিকে চালিয়ো না, আমার এই পরামর্শ। যদি টিকে থাকতে চাও তো চুপ করে থাকো।
দ্বিতীয়।
বনমালী ঠিক কথাই বলেছে। ঐ ছোটো কুমারের কথা উঠলেই তুমি যা মুখে আসে তাই বলে ফেল। রাজার ছেলে–কে ভালো কে মন্দ সে বিচারের ভার আমাদের উপর নেই। তবে কিনা, আমাদের যুবরাজ বেঁচে থাকুন আর আমাদের মধ্যম কুমার ভাই লক্ষ্ণণের মতো সর্বদা তাঁর সঙ্গে সঙ্গে থেকে তাঁকে রক্ষে করুন, ভগবানের কাছে এই প্রর্থনা করো। ছোটো কুমারের কথা মুখে না আনাই ভালো।
প্রথম।
ইচ্ছে ক’রে তো আনি নে। আমাদের মধ্যম কুমার সরল মানুষ, মনে তাঁর ভয়-ডরও নেই, পাক-চক্রও নেই–সর্বদাই ভয় হয় ঐ যাঁর নামটা করছি নে তিনি কখন তাঁকে কী ফেসাদে ফেলেন।
দ্বিতীয়।
চল্‌ চল্‌, ঐ আসছেন।
প্রথম।
ঐ-যে সঙ্গে ওঁর মামাতো ভাই ধুরন্ধরটিও আছেন–শনির সঙ্গে মঙ্গল এসে জুটেছেন।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
রাজধর ও ধুরন্ধর
রাজধর।
অসহ্য হয়েছে।
ধুরন্ধর।
কিন্তু সহ্য করতেও তো কসুর নেই। ইন্দ্রকুমারের সঙ্গে তো প্রায় জন্মাবধিই এইরকম চলছে, কিন্তু অসহ্য হয়েছে এমন তো লক্ষণ দেখি নে।
রাজধর।
লক্ষণ দেখিয়ে লাভ হবে কী? যখন দেখাব একেরারে কাজে দেখাব। একটা সুযোগ এসেছে। এইবার অস্ত্রপরীক্ষায় আমি লক্ষ্যভেদ করব।
ধুরন্ধর।
ইন্দ্রকুমারের বক্ষে না কি?
রাজধর।
বক্ষে নয়, তার হৃদয়ে। এবারকার পরীক্ষায় আমি জিতব, ওঁর অহংকারটাকে বিঁধে এফোঁড় ওফোঁড় করব।
ধুরন্ধর।
অস্ত্রপরীক্ষায় ইন্দ্রকুমারকে জিতবে এইটেকেই সুযোগ বলছ?
রাজধর।
সুযোগ কি তীরের মুখে থাকে? সুযোগ বুদ্ধির ডগায়। তোমাকে কিন্তু একটি কাজ করতে হবে।
ধুরন্ধর।
কাজ তো তোমার বরাবরই করে আসছি, ফল তো কিছু পাই নে।
রাজধর।
ফল সবুরে পাওয়া যায়। কোনোরকম ফন্দিতে ইন্দ্রকুমার-দাদার অস্ত্রশালায় ঢুকে তাঁর তূণের প্রথম খোপটি থেকে তাঁর নাম-লেখা তীরটি তুলে নিয়ে আমার নাম-লেখা তীর বসিয়ে আসতে হবে। তার সঙ্গে আমার তীর বদল করতে হবে, ভাগ্যও বদল হবে।
ধুরন্ধর।
সবই যেন বুঝলুম কিন্তু আমার প্রাণটি? সেটি গেলে তো কারো সঙ্গে বদল চলবে না।
রাজধর।
তোমার কোনো ভয় নেই, আমি আছি।
ধুরন্ধর।
তুমি তো বরাবরই আছ, কিন্তু ভয়ও আছে। সেই যখন ইন্দ্রকুমারের রুপোর-পাত-দেওয়া ধনুকটার উপরে তুমি লোভ করলে আমিই তো সেটি সংগ্রহ করে তোমার ঘরে এনে লুকিয়ে রেখেছিলুম। শেষকালে যখন ধরা পড়লে ইন্দ্রকুমার ঘৃণা করে সে ধনুকটা তোমাকে দান করলেন, কিন্তু আমার যে অপমানটা করলেন সে আমার জীবন গেলেও যাবে না। তখন তো ভাই, তুমি ছিলে, রক্ষা যত করেছিলে সে আমার মনে আছে।
রাজধর।
এবার তোমার সময় এসেছে, সেই অপমানের শোধ দেবার জোগাড় করো।
ধুরন্ধর।
সময় কখন কার আসে সেটা যে পরিষ্কার বোঝা যায় না। দুর্বল লোকের পক্ষে অপমান পরিপাক করবার শক্তিটাই ভালো; শোধ তোলবার শখটা তার পক্ষে নিরাপদ নয়। ঐ-যে ওঁরা সব আসছেন। আমি পালাই। তোমার সঙ্গে আমাকে একত্রে দেখলেই ইন্দ্রকুমার যে কথাগুলি বলবেন তাতে মধুবর্ষণ করবে না, আর ইশা খাঁও যে তোমার চেয়ে আমার প্রতি বেশি ভালোবাসা প্রকাশ করবেন এমন ভরসা আমার নেই।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

দ্বিতীয় দৃশ্য

ইন্দ্রকুমারের অস্ত্রশালার দ্বারে
ইন্দ্রকুমার।
কী হে প্রতাপ, ব্যাপারখানা কী? আমাকে হঠাৎ অস্ত্রশালার দ্বারে যে ডাক পড়ল?
প্রতাপ।
মধ্যম বউরানীমা আপনাকে খবর দিতে বললেন যে, আপনার অস্ত্রশালার মধ্যে একটি জ্যান্ত অস্ত্র ঢুকেছেন, তিনি বায়ু-অস্ত্র না নাগপাশ না কী সেটা সন্ধান নেওয়া উচিত।
ইন্দ্রকুমার।
বল কী প্রতাপ, কলিযুগেও এমন ব্যাপার ঘটে নাকি?
প্রতাপ।
আজ্ঞে, কুমার, কলিযুগেই ঘটে। সত্যযুগে নয়। দরজাটা খুললেই সমস্ত বুঝতে পারবেন।
ইন্দ্রকুমার।
তাই তো বটে, পায়ের শব্দ শুনি যে! (দ্বার খুলিতেই রাজধরের নিষ্ক#মণ) একি! রাজধর যে! হা হা হা হা, তোমাকে অস্ত্র বলে কেউ ভুল করেছিল নাকি! হা হা হা হা!
রাজধর।
মেজবউরানী তামাশা করে আমাকে এখানে বন্ধ করে রেখেছিলেন।
ইন্দ্রকুমার।
এ ঘরটা তো সহজ তামাশার ঘর না, এখানকার তামাশা যে ভয়ংকর ধারালো তামাশা–এখানে তোমার আগমন হল যে!
রাজধর।
আজ রাত্রে শিকারে যাব বলে অস্ত্র খুঁজতে গিয়ে দেখলুম আমার অস্ত্রগুলোতে সব মর্চে পড়ে রয়েছে। কালকের অস্ত্রপরীক্ষার জন্যে সেগুলোকে সমস্ত সাফ করতে দিয়ে এসেছি। তাই বউরানীর কাছে এসেছিলুম তোমার কিছু অস্ত্র ধার নেবার জন্যে।
ইন্দ্রকুমার।
তাই তিনি বুঝি সমস্ত অস্ত্রশালাসুদ্ধই তোমাকে ধার দিয়ে বসে আছেন! হা হা হা হা! তা বেরিয়ে এলে কেন? যাও, ঢুকে পড়ো। ধারের মেয়াদ ফুরিয়েছে না কি? হা হা হা হা!
রাজধর।
হাসো, হাসো। এ তামাশায় আমিও হাসব। কিন্তু এখন নয়। চললুম দাদা, আজ আর শিকারে যাচ্ছি নে।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
প্রতাপ।
ছোটোকুমারকে নিয়ে আপনাদের এ-সমস্ত ঠাট্টা আমার ভালো বোধ হয় না।
ইন্দ্রকুমার।
ঠাট্টা নিয়ে ভয় কিসের? উনিও ঠাট্টা করুন না।
প্রতাপ।
ওঁর ঠাট্টা বড়ো সহজ হবে না।
মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

তৃতীয় দৃশ্য

পরীক্ষাভূমি
রাজা, রাজকুমারগণ, ইশা খাঁ, নিশানরী ও ভাট
ইন্দ্রকুমার।
দাদা, আজ তোমাকে জিততেই হবে, নইলে চলবে না।
যুবরাজ।
চলবে না তো কী! আমার তীরটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও জগৎসংসার যেমন চলছিল ঠিক তেমনিই চলবে। আর, যদিবা নাই চলত তবু আমার জেতবার কোনো সম্ভাবনা দেখছি নে।
ইন্দ্রকুমার।
দাদা, তুমি যদি হারো তবে আমি ইচ্ছাপুর্বক লক্ষ্যভ্রষ্ট হব।
যুবরাজ।
না ভাই, ছেলেমানুষি কোরো না। ওস্তাদের নাম রাখতে হবে।
ইশা খাঁ।
যুবরাজ, সময় হয়েছে, ধনুক গ্রহণ করো। মনোযোগ কোরো। দেখো, হাত ঠিক থাকে যেন।
যুবরাজের তীর-নিক্ষেপ
ইশা খাঁ।
যাঃ! ফসকে গেল।
যুবরাজ।
মনোযোগ করেছিলুম খাঁ সাহেব, তীরযোগ করতেই পারলুম না।
ইন্দ্রকুমার।
কখনো না। মন দিলে তুমি নিশ্চয়ই পারতে। দাদা, তুমি কেবল উদাসীন হয়ে সব জিনিস ঠেলে ফেলে দাও, এতে আমার ভারি কষ্ট হয়।
ইশা খাঁ।
তোমার দাদার বুদ্ধি তীরের মুখে কেন খেলে না, তা জান? বুদ্ধিটা তেমন সূক্ষ্ম নয়।
ইন্দ্রকুমার।
সেনাপতি সাহেব, তুমি অন্যায় বলছ।
ইশা খাঁ।
(রাজধরের প্রতি) কুমার, এবার তুমি লক্ষ্য ভেদ করো, মহারাজ দেখুন।
রাজধর।
আগে দাদার হোক।
ইশা খাঁ।
এখন উত্তর করবার সময় নয়, আমার আদেশ পালন করো।
রাজধরের তীর-নিক্ষেপ
ইশা খাঁ।
যাক্‌, তোমার তীরও তোমার দাদার তীরেরই অনুসরণ করেছে–লক্ষ্যের দিকে লক্ষও করে নি।
যুবরাজ।
ভাই, তোমার বাণ অনেকটা নিকট দিয়েই গেছে, আর-একটু হলেই লক্ষ্য বিদ্ধ করতে পারত।
রাজধর।
লক্ষ্য বিদ্ধ তো হয়েছে! দূর থেকে তোমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছ না। ঐ-যে বিদ্ধ হয়েছে।
যুবরাজ।
না, রাজধর, তোমার দৃষ্টির ভ্রম হয়েছে–লক্ষ্য বিদ্ধ হয় নি।
রাজধর।
আমার ধনুর্বিদ্যার প্রতি তোমাদের বিশ্বাস নেই বলেই তোমরা দেখেও দেখতে পাচ্ছ না। আচ্ছা, কাছে গেলেই প্রমাণ হবে।
ইন্দ্রকুমারের ধনুক-গ্রহণ
যুবরাজ।
(ইন্দ্রকুমারের প্রতি) ভাই আমি অক্ষম, সেজন্যে আমার উপর তোমার রাগ করা উচিত না। তুমি যদি লক্ষ্যভ্রষ্ট হও তা হলে তোমার ভ্রষ্টলক্ষ্য তীর আমার হৃদয় বিদীর্ণ করবে এ তুমি নিশ্চয় জেনো।
ইন্দ্রকুমারের তীর-নিক্ষেপ
নেপথ্যে জনতা।
জয়, কুমার ইন্দ্রকুমারের জয়!
বাদ্য বাজিয়া উঠিল
যুবরাজ ইন্দ্রকুমারকে আলিঙ্গন করিলেন
ইশা খাঁ।
পুত্র, আল্লার কৃপায় তুমি দীর্ঘজীবী হয়ে থাকো। মহারাজ, মধ্যমকুমার পুরস্কারের পাত্র। যেরূপ প্রতিশ্রুত আছেন তা পালন করুন।
রাজধর।
না মহারাজ, পুরস্কার আমারই প্রাপ্য। আমারই তীর লক্ষ্যভেদ করেছে।
মহারাজ।
কখনোই না।
রাজধর।
সেনাপতি সাহেব পরীক্ষা করে আসুন কার তীর লক্ষ্যে বিঁধে আছে।
ইশা খাঁ।
আচ্ছা, আমি দেখে আসি।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
তীর হাতে লইয়া ইশা খাঁর পুনঃপ্রবেশ
ইশা খাঁ।
(ইন্দ্রকুমারের প্রতি) বাবা, আমি বুড়োমানুষ, চোখে তো ভুল দেখছি নে? এই তীরের ফলায় যেন রাজধরের নাম দেখা যাচ্ছে।
ইন্দ্রকুমার।
হাঁ, রাজধরেরই নাম।
মহারাজ।
দেখি, তাই তো! একসঙ্গে আমাদের সকলেরই ভুল হল!
রাজধর।
আজ নয় মহারাজ, আমার প্রতি বরাবরই ভুল হয়ে আসছে!
ইশা খাঁ।
কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
ইন্দ্রকুমার।
আমি বুঝেছি।
রাজধর।
মহারাজ, আজ বিচার করুন।
ইন্দ্রকুমার।
(জনান্তিকে) বিচার! তুমি বিচার চাও! তা হলে যে মুখে চুনকালি পড়বে! বংশের লজ্জা প্রকাশ করব না, অন্তর্যামী তোমার বিচার করবেন।
ইশা খাঁ।
কী হয়েছে বাবা? এর মধ্যে একটা রহস্য আছে। শিলা কখনো জলে ভাসে না, বানরে কখনো সংগীত গায় না। বাবা ইন্দ্রকুমার ঠিক কথা বলো তো কী হয়েছে। তূণ বদল হয় নি তো?
রাজধর।
কখনোই না। পরীক্ষা করে দেখো।
ইশা খাঁ।
তাই তো দেখছি–তূণ তো ঠিকই আছে। আচ্ছা, বাবা ইন্দ্রকুমার, সত্য করে বলো, এর মধ্যে তোমার অস্ত্রশালায় কেউ কি প্রবেশ করেছিল?
ইন্দ্রকুমার।
সে কথায় প্রয়োজন নেই খাঁ সাহেব।
ইশা খাঁ।
ঠিক করে বলো বাবা, তুমি নিশ্চয় জান কেউ তোমার অস্ত্রশালায় গিয়ে তোমার সঙ্গে তীর বদল করেছে।
ইন্দ্রকুমার।
চুপ করো খাঁ সাহেব। ও কথা থাক্‌।
ইশা খাঁ।
তা হলে তুমি হার মানছ?
ইন্দ্রকুমার।
হাঁ, আমি হার মানছি।
ইশা খাঁ।
শাবাশ বাবা, শাবাশ! তুমি রাজার ছেলে বটে। মহারাজ, কোথাও একটা-কিছু অন্যায় হয়ে গেছে, সে কথাটা প্রকাশ হচ্ছে না। আর-একবার পরীক্ষা না হলে ঠিকমত মীমাংসা হতে পারবে না।
রাজধর।
খাঁ সাহেব, অন্যায় আর কিছু নয়, আমার জেতাই অন্যায় হয়েছে। কিন্তু তাই বলে আবার পরীক্ষার অপমান আমি স্বীকার করতে পারব না। আমার জিত হওয়া যদি অন্যায় হয়ে থাকে সে অন্যায়ের সহজ প্রতিকার আছে। আমি পুরস্কার চাই নে, মধ্যম কুমারকেই পুরস্কার দেওয়া হোক।
মহারাজ।
সে কথা আমি বলতে পারি নে–তীরে যখন তোমার নাম লেখা আছে তখন তোমাকে পুরস্কার দিতেই আমি বাধ্য। এই তুমি নাও।
তলোয়ার প্রদান
রাজধর।
পুরস্কার আমি শিরোধার্য করে নিচ্ছি, কিন্তু আমার এই সৌভাগ্যে কারো মন যখন প্রসন্ন হচ্ছে না তখন এই তলোয়ার আমি দাদা ইন্দ্রকুমারকেই দিলুম।
ইন্দ্রকুমারের দিকে তলোয়ার অগ্রসর-করণ
ইন্দ্রকুমার।
(তলোয়ার মাটিতে নিক্ষেপ করিয়া) ধিক্‌! তোমার হাত থেকে এ পুরস্কারের অপমান গ্রহণ করবে কে?
ইশা খাঁ।
(ইন্দ্রকুমারের হাত ধরিয়া) কী? ইন্দ্রকুমার, মহারাজের দত্ত তলোয়ার তুমি মাটিতে ফেলে দিতে সাহস কর! তোমার এই অপরাধের সমুচিত শাস্তি হওয়া চাই।
ইন্দ্রকুমার।
(হাত ছাড়াইয়া লইয়া) বৃদ্ধ, আমাকে স্পর্শ কোরো না।
ইশা খাঁ।
পুত্র, একি পুত্র! তুমি আজ আত্মবিস্মৃত হয়েছ।
ইন্দ্রকুমার।
সেনাপতি সাহেব, আমাকে ক্ষমা করো। আমি যথার্থই আত্মবিস্মৃত হয়েছি। আমাকে শাস্তি দাও।
যুবরাজ।
ক্ষান্ত হও ভাই, ঘরে ফিরে চলো।
ইন্দ্রকুমার।
(মহারাজের পদধূলি লইয়া) পিতা, অপরাধ মার্জনা করুন। আজ সকল রকমেই আমার হার হয়েছে।
ইশা খাঁ।
মহারাজ, আমার একটি নিবেদন আছে। খেলার পরীক্ষা তো চুকেছে, এবার কাজের পরীক্ষা হোক। দেখা যাবে তাতে আপনার কোন্‌ পুত্র পুরস্কার আনতে পারে।
মহারাজ।
কোন্‌ কাজের কথা বলছ সেনাপতি।
ইশা খাঁ।
আরাকান-রাজের সঙ্গে মহারাজের যুদ্ধের মতলব আছে। সৈন্যও তো প্রস্তুত হয়েছে। এইবার কুমারদের সেই যুদ্ধে পাঠানো হোক।
মহারাজ।
ভালো কথাই বলেছ সেনাপতি। খবর পেয়েছি আরাকানের রাজা চট্টগ্রামের সীমানার কাছে এসেছেন। বারবার শিক্ষা দিয়েছি, কিন্তু মূর্খের শিক্ষার শেষ তো কিছুতেই হয় না, যমরাজের পাঠশালায় না পাঠালে গতি নেই। কী বল বৎসগণ! আমাদের সেই চিরশত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে যাত্রা করে ক্ষাত্রচর্যে দীক্ষা গ্রহণ করতে রাজি আছ কি?
ইন্দ্রকুমার।
রাজি। দাদাও যাবেন।
রাজধর।
আমিও যাব না মনে করছ না কি?
মহারাজ।
তবে ইশা খাঁ, তুমি সৈন্যাধ্যক্ষ হয়ে এঁদের সকলকে শত্রুবিজয়ে নিয়ে যাও। ত্রিপুরেশ্বরী তোমদের সহায় হোন।
মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

মুকুটঃ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

প্রথম দৃশ্য

রাজধরের শিবির
রাজধর ও ধুরন্ধর
ধুরন্ধর।
তুমি পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে তফাতে থাকবে না কি?
রাজধর।
হাঁ–ইশা খাঁর কাছে আমি এই প্রস্তাব পাঠিয়েছিলুম।
ধুরন্ধর।
সে তো আমি জানি; আমি তখন সেখানে উপস্থিত ছিলুম। তাই নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়ে গেল।
রাজধর।
কিরকম?
ধুরন্ধর।
প্রথমেই তো ইন্দ্রকুমার অট্টহাস্য করে উঠলেন। তিনি বলেলেন, রাজধরের যুদ্ধপ্রণালীটাই ঐরকম, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরে থেকেই তিনি যুদ্ধ করতে ভালোবাসেন।
রাজধর।
সে কথা ঠিক। ক্ষেত্র হতে যুদ্ধ করে মজুররা, দূরে থেকে যে যুদ্ধ করতে পারে সেই যোদ্ধা। ইশা খাঁ কী বললেন?
ধুরন্ধর।
তোমার উপর তাঁর বিশ্বাস কিরকম সে তো তুমি জানই। তুমি যদি পায়ে ধরতে যাও তা হলেও তিনি সন্দেহ করেন নিশ্চয় জুতোজোড়াটা তোমার সরাবার মতলব আছে। তাই, ইশা খাঁ বললেন, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজধর তফাতে থাকতে চান সেটা তাঁর পক্ষে আশ্চর্য নয়, কিন্তু পাঁচ হাজার সৈন্য সঙ্গে রাখতে চান সেইটে আমার ভালো ঠেকছে না।
রাজধর।
যুবরাজ কিছু বললেন না?
ধুরন্ধর।
যুবরাজ কাউকে যে সন্দেহ করবেন সে পরিমাণ বুদ্ধি ভগবান তাঁকে দেন নি– এমন-কি, তুমি যে তুমি, তোমার উপরেও তাঁর সন্দেহ হয় না।
রাজধর।
দেখো ধুরন্ধর, দাদার কথা তুমি অমন করে বোলো না।
ধুরন্ধর।
ওঃ, ঐ জায়গাটা তোমার একটু নরম আছে সেটা মাঝে মাঝে ভুলে যাই। যা হোক, তিনি বললেন, না, না, রাজধরের প্রতি তোমরা অন্যায় অবিচার করছ। তাঁর প্রস্তাবটা তো আমার ভালোই ঠেকছে। যুদ্ধে যদি সংকট উপস্থিত হয় তা হলে তিনি তাঁর সৈন্য নিয়ে আমাদের সাহায্য করতে পারবেন। যুবরাজের অনুরোধেই তো ইশা খাঁ তোমার প্রস্তাবে রাজি হলেন, নইলে তাঁর বড়ো ইচ্ছে ছিল না। যাই হোক, কিন্তু আমি তোমার আলাদা থাকবার মতলব ভালো বুঝতে পারছি নে।
রাজধর।
ওঁদের সঙ্গে একত্রে মিলে যুদ্ধ করে আমার লাভ কী? জিত হলে সে জিতকে কেউ আমার জিত বলবে না তো।
ধুরন্ধর।
তবু ভুলেও কেউ তোমার নাম করতে পারে, কিন্তু তফাতে বসে থাকলে যুদ্ধে জয় হলেও তোমার অপযশ, হারলে তো কথাই নেই।
রাজধর।
আমার এই পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়েই আমি যুদ্ধে জিতব এবং আমি একলাই জিতব।
দূতের প্রবেশ
রাজধর।
কী রে, যুদ্ধের খবর কী?
দূত।
আজ্ঞে, লড়াই তো সমস্ত দিন ধরেই চলেছে, কিন্তু এ পর্যন্ত এঁরা শত্রুদের ব্যূহ ভেদ করতে পারেন নি। সূর্য অস্ত যাবার আর তো বেশি দেরি নেই, অন্ধকার হয়ে এলে বোধ হয় যুদ্ধ আজকের মতো বন্ধ রাখতে হবে।
দ্বিতীয় দূতের প্রবেশ
রাজধর।
কে তুমি?
দ্বিতীয় দূত।
আজ্ঞে আমি ব্যোমকেশ, যুবরাজ আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন–সেও প্রায় দুই প্রহরে হয়ে গেল–আপনার যেখানে সৈন্য নিয়ে থাকবার কথা ছিল সেখানে আপনার কোনো চিহ্ন না পেয়ে বহু সন্ধানে এখানে এসেছি।
রাজধর।
যুবরাজের আদেশ কী?
দূত।
শত্রুসৈন্যের সংখ্যা আমরা যেরকম অনুমান করেছিলুম তার চেয়ে অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধ খুব কঠিন হয়ে এসেছে। কুমার ইন্দ্রকুমার তাঁর অশ্বারোহীদল নিয়ে শত্রুসৈন্যের উত্তর দিক আক্রমণ করেছিলেন, আর কিছুক্ষণ সময় পেলেই তিনি সে দিক থেকে শত্রুসৈন্যকে একেবারে নদীর কিনারা পর্যন্ত হঠিয়ে আনতে পারতেন।
রাজধর।
সত্যি নাকি! সময় পেলে কী করতে পরতেন সে কথা কল্পনা করে বিশেষ লাভ দেখি নে, কিন্তু সময় পান নি বলেই বোধ হচ্ছে।
দূত।
শত্রুসৈন্যকে যখন প্রায় টলিয়ে এনেছেন এমন সময় খবর পেলেন যে যুবরাজ সংকটে পড়ছেন, শত্রু তাঁকে ঘিরে ফেলেছে। ইশা খাঁ তখন অন্য দিকে যুদ্ধে নিযুক্ত ছিলেন, তিনি খবর পেয়ে বললেন, যুবরাজকে উদ্ধার করবার জন্যে আমি এখানে আসি নি, আমাকে যুদ্ধে জিততে হবে; আমি এখান থেকে নড়তে গেলেই শত্রুরা সুবিধা পাবে।
রাজধর।
দাদা কি তবে–
দূত।
না, তাঁর কোনো বিপদ এখনো ঘটে নি। ইন্দ্রকুমার সৈন্য নিয়ে তাঁকে উদ্ধার করেছেন। কিন্তু এই গোলেমালে যুদ্ধে আমাদের অসুবিধা ঘটল। আপনাকে সন্ধান করবার জন্যে নানা দিকে দূত গিয়েছে। আপনার সাহায্য না হলে বিপদ ঘটতেও পারে, অতএব আপনি আর কিছুমাত্র বিলম্ব করবেন না।
রাজধর।
না, কিছুমাত্র বিলম্ব করব না। যাও, বিশ্রাম করো গে যাও–আমি প্রস্তুত হচ্ছি।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
ধুরন্ধর।
তুমি যাচ্ছ নাকি?
রাজধর।
যাচ্ছি বটে, কিন্তু ও দিকে নয়, অন্য দিকে।
ধুরন্ধর।
বাড়ির দিকে?
রাজধর।
তুমিও কি ইশা খাঁর কাছ থেকে বিদ্রূপ অভ্যেস করেছ! বীরত্ব যাঁর খুশি তিনি দেখান, কিন্তু যুদ্ধে জয় করে যদি কেউ বাড়ি ফেরে তো সে রাজধর। ধুরন্ধর, যাও তুমি–দেখো গে আমার শিবিরে কোথাও যেন কেউ আগুন না জ্বালে, একটি প্রদীপও যেন না জ্বলতে পায়।
ধুরন্ধর।
আচ্ছা আমি সকলকে সতর্ক করে দিচ্ছি, কিন্তু কী তোমার অভিপ্রায় খুলেই বলো না–তুমি যদি আমাকে আর আমি যদি তোমাকে সন্দেহ করি তা হলে পৃথিবীতে আমাদের দুটির তো কোথাও ভর দেবার জায়গা থাকবে না।
রাজধর।
আজ রাত্রের অন্ধকারে আমি সৈন্য নিয়ে গোপনে নদী পার হয়ে যাব। হঠাৎ আরাকান-রাজের শিবিরে উপস্থিত হয়ে তাকে বন্দী করতে হবে।
ধুরন্ধর।
এখানে কোথায় পার হবে? ঘাট তো নেই।
রাজধর।
পথঘাট আমি সমস্তই সন্ধান করে ঠিক করে রেখেছি। সূর্য তো অস্ত গেল। আজ আড়াই প্রহর রাত্রে চাঁদ উঠবে, তার পূর্বেই আমাদের কাজ শেষ করতে হবে। অতএব আর বড়ো বেশি দেরি নেই–তুমি যাও, প্রস্তুত হও গে। আর-একটি কাজ করো–যুবরাজের দূত যেন ফিরে যেতে না পারে, তাকে বন্দী করে রাখো।
মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

দ্বিতীয় দৃশ্য

ইশা খাঁর শিবির
ইন্দ্রকুমার ও ইশা খাঁ
ইন্দ্রকুমার।
সেনাপতি সাহেব, আপনি দাদার উপর রাগ করবেন না। আজ রাত্রে সৈন্যেরা বিশ্রাম করুক, কাল আমরা যুদ্ধে জয়লাভ করব।
ইশা খাঁ।
দেখো ইন্দ্রকুমার, আগুন যত শীঘ্র নেবানো যায় ততই মঙ্গল; তাকে সময় দিলে কিসের থেকে কী ঘটে কিছুই বলা যায় না। আজই আমরা জিতে আসতুম, কেবল তোমার দাদা নিতান্ত নির্বোধের মতো শত্রুদের মাঝখানে নিজেকে খামকা জড়িয়ে বসলেন; আমাদের সমস্ত পণ্ড হয়ে গেল।
ইন্দকুমার।
নির্বোধের মতো কেন বলছ খাঁ সাহেব, বলো বীরের মতো– তিনি সামান্য কয়জন সৈন্য নিয়ে–
ইশা খাঁ।
যেখানে গিয়ে পড়েছিলেন সেখানে কেবল নির্বোধই যেতে পারে–
ইন্দ্রকুমার।
(উত্তেজিত স্বরে) না, সেখানে বীর না হলে কেউ প্রবেশ করতে সাহস করতে পারে না।
ইশা খাঁ ।
আচ্ছা বাবা, তোমার কথা মানছি। কিন্তু শুধু বীর নয়, নির্বোধ বীর না হলে সে দিকে কেউ যেত না।
ইন্দ্রকুমার।
কিন্তু তাতে তোমার লড়াইয়ের তো কোনো ব্যাঘাত হয় নি।
ইশা খাঁ।
খুব ব্যাঘাত হয়েছিল। আমার সৈন্যেরা খবর পেয়ে সকলেই চঞ্চল হয়ে উঠল, তাদের কি আর লড়াইয়ে মন ছিল? আমাদের সৈন্যের মধ্যে একজনও নেই যুবরাজের বিপদের খবর শুনে যে স্থির থাকতে পারে।
ইন্দ্রকুমার।
কিন্তু সেনাপতি সাহেব, আমাদের রাজধরের খবর কী?
ইশা খাঁ।
আমি চার দিকেই দূত পাঠিয়েছিলুম; একজন ছাড়া সব দূতই ফিরে এসেছে, কোথাও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
ইন্দ্রকুমার।
হা হা হা হা, সে নিশ্চয় পালিয়েছে।
ইশা খাঁ।
হাসির কথা নয় বাবা।
ইন্দ্রকুমার।
তা কী করব সেনাপতি সাহেব, আমি খুশি হয়েছি। আমরা যুদ্ধ করে মরতুম, আর ও যে আমাদের খ্যাতিতে ভাগ বসাত সে আমার কিছুতে সহ্য হত না; তার চেয়ে ও ভেগে গেছে সে ভালোই হয়েছে। এবারকার অস্ত্রপরীক্ষায় তো ফাঁক চলবে না।
ইশা খাঁ।
কিন্তু সেবার কী হয়েছিল তুমি আমার কাছে বল নি।
ইন্দ্রকুমার।
সে বলবার কথা না খাঁ সাহেব; সে আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা কোরো না, সেবার আমি হেরেছিলুম।
ইশা খাঁ।
তীর ছুঁড়ে হারো নি বাবা, রাগ করে হেরেছিলে।
মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

তৃতীয় দৃশ্য

আরাকান-রাজের শিবির
আরাকান-রাজ ও রাজধর
আরাকান।
দেখুন রাজকুমার, আমাকে বন্দী করে আপনাদের কোনো লাভ নেই।
রাজধর।
কেন লাভ নেই রাজন্‌? এই যুদ্ধের মধ্যে আপনাকে লাভ করাই তো সব চেয়ে বড়ো লাভ।
আরাকান।
তাতে যুদ্ধের অবসান হবে না। আমার ভাই হাম্‌চু রয়েছে, সৈন্যেরা তাকেই রাজা করবে, যুদ্ধ যেমন চলছিল তেমনি চলবে।
রাজধর।
আপনাকে মুক্তিই দেব, কিন্তু সেটা তো একেবারে বিনা মূল্যে দেওয়া চলবে না।
আরাকান।
সে আমি জানি, মূল্য দিতে হবে। আমি আপনার কাছে পরাজয় স্বীকার করে সন্ধিপত্র লিখে দিতে রাজি আছি।
রাজধর।
শুধু সন্ধিপত্র দিলে তো হবে না মহারাজ। আপনি যে পরাজয় স্বীকার করলেন তার কিছু নিদর্শন তো দেশে নিয়ে যেতে হবে।
আরাকান।
আপনাকে পাঁচ শত ব্রহ্মদেশের ঘোড়া ও তিনটি হাতি উপহার দেব।
রাজধর।
সে উপহারে আমার প্রয়োজন নেই; মহারাজের মাথার মুকুট আমাকে দিতে হবে।
আরাকান।
তার চেয়ে প্রাণ দেওয়া সহজ ছিল।
রাজধর।
প্রাণ দিলেও মুকুটটি তো বাঁচাতে পারবেন না, মাঝের থেকে প্রাণটাই বৃথা যাবে।
আরাকান।
তবে মুকুট নিন, কিন্তু এই মুকুটের সহিত আরাকানের চিরস্থায়ী শত্রুতা আপনি ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। এই মুকুট যতদিন না আবার ফিরে পাব ততদিন আমার রাজবংশে শান্তি থাকবে না।
রাজধর।
এই তো রাজার মতো কথা। আমরাও তো শান্তি চাই নে মহারাজ, আমরা ক্ষত্রিয়। আর-একটি কর্তব্য বাকি আছে। শীঘ্র যুদ্ধ নিবারণ করে এক আদেশপত্র আপনার সেনাপতির নিকট পাঠিয়ে দিন, ও পারে এতক্ষণ যুদ্ধের উদ্যোগ হচ্ছে।
আরাকান।
এখনই আমার আদেশ নিয়ে দূত যাবে।
রাজধর।
তবে চলুন, সন্ধিপত্র লেখার ব্যাবস্থা করা যাক।
মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

চতুর্থ দৃশ্য

রণক্ষেত্র
যুবরাজ ও ইন্দ্রকুমার
যুবরাজ।
আজকের যুদ্ধে গতিকটা ভালো বোঝা যাচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে আমাদের সৈন্যেরা কালকের ব্যাপারে আজও নিরুৎসাহ হয়ে রয়েছে, ওরা যেন ভালো করে লড়ছে না। ইশা খাঁ কোন্‌ দিকে?
ইন্দ্রকুমার।
ওই-যে পূর্বকোণে তাঁর নিশান দেখা যাচ্ছে।
যুবরাজ।
ভাই, তুমি কেন আজ আমার সঙ্গে সঙ্গে রয়েছ? তোমার বোধ হয় ঐ উত্তরের দিকে যাওয়াই কর্তব্য।
ইন্দ্রকুমার।
না, আমার এই জায়গাই ভালো।
যুবরাজ।
ইন্দ্রকুমার, তুমি তোমার দাদাকে আজ নির্‌বুদ্ধিতা থেকে বাঁচাবার জন্যে সতর্ক হয়ে কাছে কাছে ফিরছ। খাঁ সাহেব যে আবার কোনো সুযোগে আমার বুদ্ধির দোষ ধরবেন এটা তোমার ভালো লাগছে না। কিন্তু ভাই, আমারও নির্‌বুদ্ধিতার সীমা আছে, আমি আজ বোধ হয় সাবধানে কাজ করতে পারব। ঐ দেখো, চেয়ে দেখো, আমার কিন্তু ভালো বোধ হচ্ছে না। ঐ দেখো, ঐ পাশে আমাদের সৈন্যেরা যেন টলেছে, এখনই পালাতে আরম্ভ করবে; তুমি না হলে কেউ ওাদের ঠেকাতে পারবে না। ইন্দ্রকুমার, দেরি কোরো না, আমার জন্যে তোমার কোনো ভয় নেই। একি! একি! একি!
ইন্দ্রকুমার।
তাই তো একি! শত্রুসৈন্যরা হঠাৎ যুদ্ধ বন্ধ করলে যেন!
যুবরাজ।
ঐ-যে সন্ধির নিশান উড়িয়েছে! ওদের তো পরাজয়ের কোনো লক্ষণ ছিল না, তবে কেন এমন ঘটল? আমার তো মনে হচ্ছিল আজকের যুদ্ধে আমাদের সৈন্যেরাই টল্‌মল্‌ করছে।
দূতের প্রবেশ
দূত।
যুবরাজ, শত্রুপক্ষ যুদ্ধে ক্ষান্ত হয়েছে।
যুবরাজ।
সে তো দেখতে পাচ্ছি। এর কারণ কী?
দূত।
কারণ এখনো জানতে পারি নি, কিন্তু শুনতে পেয়েছি আরাকান-রাজ আর আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন না বলে সংবাদ পাঠিয়েছেন।
যুবরাজ।
সুসংবাদ। আমার কেবল মনে একটি বেদনা বাজছে।
ইন্দ্রকুমার।
কিসের বেদনা দাদা?
যুবরাজ।
রাজধর কেন সৈন্য নিয়ে চলে গেল! সে যদি থাকত তা হলে কী আনন্দের সঙ্গে আমরা তিন ভাই জয়োৎসব করতে পারতুম। আজকের আমাদের জয়গৌরবের মধ্যে এই একটি মস্ত অভাব রয়ে গেল–রাজধর যুদ্ধে যোগ না দিয়ে আমাকে বড়ো দুঃখ দিয়েছে।
ইন্দ্রকুমার।
জয়ের ভাগ না নিয়েই সে যদি পালিয়ে থাকে তাতে এমনি কী ক্ষতি হয়েছে দাদা!
যুবরাজ।
না ভাই, আমরা তিন ভাই একত্রে বেরিয়েছি, বিজয়লক্ষ্মীর প্রসাদ আমরা ভাগ করে ভোগ না করতে পারলে আমার তো মনে দুঃখ থেকে যাবে। রাজধর যদি মাথা হেঁট করে বাড়ি ফেরে, আমাদের সৌভাগ্যে যদি তার মুখ বিমর্ষ হয়, তা হলে এই কীর্তি আমাকে কিছুমাত্র সুখ দেবে না।– ঐ-যে ঘোড়া ছুটিয়ে সেনাপতি সাহেব আসছেন।
ইশা খাঁর প্রবেশ
ইন্দ্রকুমার।
খাঁ সাহেব, শত্রুসৈন্য হঠাৎ যুদ্ধ থামিয়ে দিলে কেন তার কোনো খবর পেয়েছ?
ইশা খাঁ।
পেয়েছি বৈকি। রাজধর আরাকান-রাজকে বন্দী করেছে।
ইন্দ্রকুমার।
রাজধর! মিথ্যা কথা!
ইশা খাঁ।
যা মিথ্যা হওয়া উচিত ছিল এক-এক সময় তাও সত্য হয়ে ওঠে। আমি দেখতে পাচ্ছি আল্লার দূতেরা এক-এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে, শয়তান তখন সমস্ত হিসাব উল্টা করে দিয়ে যায়।
ইন্দ্রকুমার।
শয়তানও কি রাজধরকে জিতিয়ে দিতে পারে!
ইশা খাঁ।
একবার তো জিতিয়েছিল সেই অস্ত্রপরীক্ষার সময়– এবারও সেই শয়তান জিতিয়েছে।
যুবরাজ।
সেনাপতি সাহেব, তুমি রাজধরের উপর রাগ কোরো না। সে যদি জিতে থাকে তাতে তো আমাদেরই জিত। কখন সে যুদ্ধ করলে, কখন বা বন্দী করলে, আমরা তো জানতে পারি নি।
ইশা খাঁ।
কাল সন্ধ্যার পরে আমরা যখন যুদ্ধে ক্ষান্ত দিয়ে শিবিরে ফিরে এলেম তখন সে অন্ধকারে গোপনে নদী পার হয়ে হঠাৎ আরাকান-রাজের শিবির আক্রমণ করে তাঁকে বন্দী করেছে। আমাদের সাহায্য করবার জন্যে আমি তাকে যেখানে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলুম সেখানে সে ছিলই না। আমি সেনাপতি, আমার আদেশ সে মান্যই করে নি।
ইন্দ্রকুমার।
অসহ্য! এজন্যে তার শাস্তি পাওয়া উচিত।
ইশা খাঁ।
শুধু তাই! যুবরাজ উপস্থিত থাকতে সে কিনা নিজের ইচ্ছামত সন্ধিপত্র রচনা করেছে!
ইন্দ্রকুমার।
এর শাস্তি না দিলে অন্যায় হবে।
ইশা খাঁ।
তোমার দাদাকে এই সহজ কথাটি বুঝিয়ে দাও দেখি।
রাজধরের প্রবেশ
ইন্দ্রকুমার।
রাজধর! তুমি কাপুরুষতা প্রকাশ করেছ।
রাজ-ধর।
তোমার মতো যুদ্ধে ভঙ্গ দিয়ে পুরুষকার প্রকাশ করতে আমি এত দূরে আসি নি–আমি যুদ্ধ জয় করতে এসেছিলুম।
ইন্দ্রকুমার।
তুমি যুদ্ধ করেছ! এবং জয় করেছ! জয়লক্ষ্মীর মুখ যে লজ্জায় লাল করে তুলেছ!
রাজ-ধর।
তা হতে পারে, সেটা প্রণয়ের লজ্জা। কিন্তু তিনি যে আমাকে বরণ করেছেন তার সাক্ষ্মী এই।
ইন্দ্রকুমার।
এ মুকুট কার?
রাজ-ধর।
এ মুকুট আমার। এ আমার জয়ের পুরস্কার।
ইন্দ্রকুমার।
যুদ্ধ থেকে পালিয়েছ তুমি, তুমি পুরস্কার পাবে কিসের! এ মুকুট যুবরাজ পরবেন।
রা-জধর।
আমি জিতে এনেছি, আমিই পরব।
যুবরাজ।
রাজধ-র ঠিক কথাই বলছেন। ওঁর জয়ের ধন তো উনিই পরবেন।
ইশা খাঁ।
সেনাপতির আদেশ লঙ্ঘন করে উনি অন্ধকারে শৃগালবৃত্তি অবলম্বন করলেন–আর, উনি পরবেন মুকুট! ভাঙা হাঁড়ির কানা পরে যদি দেশে যান তবেই ওঁকে সাজবে।
রাজ-র।
আমি যদি না থাকতুম ভাঙা হাঁড়ির কানা তোমাদের পরতে হত। এতক্ষণ থাকতে কোথায়?
ইন্দ্রকুমার।
যেখানেই থাকি তোমার মতো পালিয়ে থাকতুম না।
যুবরাজ।
ইন্দ্রকুমার, তুমি অন্যায় বলছ ভাই। সত্য বলতে কি, রাজ-ধর না থাকলে আজ আমাদের বিপদ হত।
ইন্দ্রকুমার।
কিচ্ছু বিপদ হত না। রাজ-ধর সৈন্য লুকিয়ে রেখেই আমাদের বিপদে ফেলবার চেষ্টা করেছিল। রাজ-ধর না থাকলে এ মুকুট আমি যুদ্ধ করে আনতুম। রাজ-ধর চুরি করে এনেছে। দাদা, এ মুকুট এনে আমি তোমাকেই পারতুম, নিজে পরতুম না।
যুবরা-জ।
(রাজ-ধরের প্রতি) ভাই, তুমিই আজ জিতেছ। তুমি না থাকলে অল্প সৈন্য নিয়ে আমাদের কি বিপদ হত বলা যায় না। এ মুকুট আমি তোমাকেই পরিয়ে দিচ্ছি।
ইন্দ্রকুমার।
(রুদ্ধকন্ঠে) রা-জধর ক্ষাত্রধর্ম লঙ্ঘন করেছে বলে তোমার কাছ থেকে আজ পুরস্কার পেলে, আর আমি-যে প্রাণকে তুচ্ছ করে বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করলুম তোমার মুখ থেকে একটা প্রশংসার কথাও শুনতে পেলুম না! এমন কথা তোমার মুখ থেকে আজ শুনতে হল যে, রাজ–ধর না থাকলে কেউ তোমাকে বিপদ হতে উদ্ধার করতে পারত না! কেন দাদা, আমি কি প্রত্যুষ থেকে আর সন্ধ্যা পর্যন্ত তোমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে লড়াই করি নি! আমি কি রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়েছিলুম! আমি কি শত্রুসৈন্যের বেষ্টন ছিন্ন করে তোমার সাহায্যের জন্যে আসি নি! কী দেখে তুমি বললে তোমার স্নেহের রাজ-ধর ছাড়া কেউ তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারত না!
যুবরাজ।
ভাই, আমি নিজের বিপদের কথা বলছি নে।
ইন্দ্রকুমার।
থাক্‌ দাদা, থাক্‌। আর কিছুই বলতে হবে না। রাজ-ধরের মতো এমন অসাধারণ বীরকে যখন তুমি সহায় পেয়েছ তখন আমার আর প্রয়োজন নেই–আমি চললেম।
যুবরাজ।
ভাই, আবার! আবার তুমি আত্মবিস্মৃত হচ্ছ!
ইন্দ্রকুমার।
যেখানে আমার প্রয়োজন নেই সেখানে আমার পক্ষে থাকাই অপমান।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
ইশা খাঁ।
যুবরাজ, এ মুকুট তোমার কাউকে দেবার অধিকার নেই। আমি সেনাপতি, আমি যাকে দেব এ তারই হবে।
[ রা-জধরের মাথা হইতে মুকুট লইয়া যুবরাজকে পরাইয়া দিতে উদ্যত হইলেন
যুবরাজ।
(সরিয়া গিয়া) না, এ মুকুট আমি নিতে পারি নে।
ইশা খাঁ।
তবে থাক্‌। এ মুকুট কেউ পাবে না। এ কর্ণফুলির জলে যাক। (মুকুট নিক্ষেপ) রাজ-ধর যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন, উনি শাস্তির যোগ্য।
রা-জধর।
দাদা, তুমি সাক্ষী রইলে। এ আমি ভুলব না।
যুবরাজ।
এইটেই কি সকলের চেয়ে মনে রাখবার কথা! মুকুটটাও যদি জলে গিয়ে থাকে তবে ওর সমস্ত লাঞ্ছনাও যাক। তোমারও যা ভোলবার ভোলো, আমাদেরও যা ভোলবার ভুলে যাই।–দেখি, ইন্দ্রকুমার সত্যিই রাগ করে আমাদের ছেড়ে চলে গেল কি না।
মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

পঞ্চম দৃশ্য

শিবির
রাজ-ধর ও ধুরন্ধর
রা-জধর।
ধুরন্ধর, আমার মুকুট যেখানে গিয়েছে আমাদের যুদ্ধজয়কেও সেই কর্ণফুলির জলে জলাঞ্জলি দেব।
ধুরন্ধর।
আবার হারাবে নাকি?
রাজ-ধর।
হাঁ, এবার হেরে জিতব। ইন্দ্রকুমারের অহংকারকে ধুলোয় না লুটিয়ে দিয়ে আমি ফিরব না। আমার হাতের জিতকে তিনি গ্রহণ করবেন না! দেখি,এবার নিজে তিনি কেমন জিততে পারেন।
ধুরন্ধর।
অত বেশি নিশ্চিন্ত হোয়ো না, দৈবাৎ জিতে যেতেও পারে। সত্যি কথায় রাগ করলে চলবে না, যুদ্ধবিদ্যাটা ইন্দ্রকুমার একটু শিখেছে।
রাজ-ধর।
আচ্ছা, সে-সব তর্ক পরে হবে। এখন তোমাকে একটি কাজ করতে হবে। আরাকান-রাজ সৈন্য নিয়ে কাল প্রাতেই যাত্রা করবেন। কথা আছে যতদিন না তিনি চট্টগ্রামের সীমানা পেরিয়ে যাবেন ততদিন তাঁর সেনাপতিরা আমার শিবিরে বন্দী থাকবেন। তিনি শিবির তোলবার পূর্বেই আজ রাত্রে গোপনে তাঁর কাছে তুমি আমার এই চিঠিখানি নিয়ে যাবে।
ধুরন্ধর।
চিঠিতে কী আছে সেটা তো আমার জানা ভালো। কেননা, যদি দুটো-একটা কথা বলবার হয় তা হলে ব’লে কাজটা চুকিয়ে আসতে পারব।
রাজ-ধর।
আমি লিখেছি আমি অপমানিত হয়েছি, এইজন্য আমার ভাইদের কাছ থেকে আমি অবসর নিলুম। আমার পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে আমি গৃহে ফেরবার ছলে দূরে চলে যাব, ইন্দ্রকুমারও দাদার উপর অভিমান করে চলে গেছে, সৈন্যেরাও যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে জেনে ফেরবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে– এই অবকাশে যদি আরাকান-রাজ সহসা আক্রমণ করেন তা হলে ত্রিপুরার সৈন্যদের নিশ্চয় হার হবে।
ধুরন্ধর।
হার তো হবে। তার পরে? তুমি-সুদ্ধ শেষে হায় হায় করে মরবে না তো! আগুন যদি লাগাতে হয় তো নিজের ঘরের চালটা সামলে লাগাতে হবে।
রা-জধর।
আমাকে সাবধান করে দেবার জন্যে আর-কারো বুদ্ধির প্রয়োজন হবে না। তুমি প্রস্তুত হও গে– দেখো, কেউ যেন জানতে না পারে। আমার সৈন্যেরা যদি কোনোমতে সন্দেহ করে তা হলে সমস্তই পণ্ড হবে।
ধুরন্ধর।
দেখো রাজ-ধর, আমাকে সাবধান করে দেবার জন্যেও আর-কারো বুদ্ধির প্রয়োজন হবে না– তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।
মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

ষষ্ঠ দৃশ্য

রণক্ষেত্র
ইশা খাঁ ও যুবরাজ
ইশা খাঁ।
যুবরাজ, আল্লাকে স্মরণ করো। আজ বড়ো শক্ত সময় এসেছে।
যুবরাজ।
শক্তটা কিসের খাঁ সাহেব! ভগবানের যখন ইচ্ছা হয় তখন মরাও শক্ত নয়, বাঁচাও শক্ত নয়– সবই সহজ।
ইশা খাঁ।
মহারাজ আমার হাতে তোমাদের দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন, সেইজন্যেই মনে আক্ষেপ হচ্ছে। নইলে যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যু তো বিবাহশয্যায় নিদ্রা। যুবরাজ, তুমি পালাবার চেষ্টা করো–যুদ্ধের ভার আমার উপর রইল।
যুবরাজ।
তুমি আমাদের অস্ত্রগুরু, তোমার মুখে এ উপদেশ সাজে না। তা ছাড়া পথই বা কোথায়? আজ মরবার যেমন চমৎকার সুযোগ হয়েছে পালাবার তেমন নয়।
ইশা খাঁ।
কিন্তু বাবা, মনের মধ্যে একটা আগুন জ্বলছে। ইন্দ্রকুমার যে অভিমান করে দূরে চলে গেল, তার এই অপরাধের শাস্তি দেবার জন্যে আমি হয়তো বেঁচে থাকব না।
যুবরাজ।
যদি বেঁচে না থাক সেনাপতি, তা হলে তার শাস্তি আরো ঢের বেশি হবে। সে-যে তোমাকে পিতার মতো জানে।
ইশা খাঁ।
আল্লা! সে কথা সত্য। বাবা, আজ বুঝছি আমার সময় হবে না। কিন্তু যদি তোমার সুযোগ হয় তবে তাকে বোলো, যদি ইশা খাঁ বেঁচে থাকত তবে তাকে শাস্তি দিত, কিন্তু মরবার আগে তাকে ক্ষমা করে মরেছে। বাস, আর সময় নেই– চললুম বাবা। এসো, একবার আলিঙ্গন করে যাই। আল্লার হাতে দিয়ে গেলুম, তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন।
যুবরাজ।
খাঁ সাহেব, কতদিন কত অপরাধ করেছি, আজ সমস্ত মার্জনা করে যাও।
ইশা খাঁ।
বাবা, জন্মকাল থেকে তোমাকে দেখছি, কোনোদিন কোনো অপরাধ তুমি জমতে দাও নি, হাতে হাতে সমস্তই নিকাশ করে দিয়েছ।– আজ মার্জনা করব এমন তো কিছুই রাখ নি। তোমার নির্মল প্রাণ আজ যদি নেন তবে তাঁর স্বর্গোদ্যানের কোনো ফুলের কাছেই সে ম্লান হবে না।

মুকুটঃ তৃতীয় পরিচ্ছেদ

প্রথম দৃশ্য

রণক্ষেত্র
সৈন্যদল
প্রথম সৈনিক।
এ কি সত্যি?
দ্বিতীয় সৈনিক।
কী জানি ভাই, শুনছি তো!
প্রথম।
তবে তো সর্বনাশ হবে।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
দ্বিতীয় দলের প্রবেশ
প্রথম।
কে বললে রে, কে বললে?
দ্বিতীয়।
আমাদের উমেশ বললে।
প্রথম।
কী জানি ভাই, শুনে যেন মাথায় বজ্রঘাত হল, ভালো করে সব কথা জিজ্ঞাসা করতে পারলুম না।
দ্বিতীয়।
চল্‌, ভালো করে খোঁজ করে আসি গে।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
তৃতীয় দলের প্রবেশ
প্রথম।
আমরা তাঁর হাতিকে দেখেছি– হাওদা খালি, মাহুত নেই। প্রভুকে হারিয়ে সে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
দ্বিতীয়।
আমাদেরও যে সেই দশা হয়েছে।
তৃতীয়।
কোন্‌ দিকে পড়েছেন কেউ দেখে নি?
প্রথম।
তা তো কেউ বলতে পারে না।
দ্বিতীয়।
আমাদের শিবু বলছিল,যুবরাজকে যখন বাণ এসে লাগল তখন মাহুত তাঁর হাতি নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাচ্ছিল, পালাবার সময় মাহুত মারা যায়– তার পরে যুবরাজ যে সেই হাতির উপর থেকে কোন্‌খানে পড়ে গিয়েছেন তা তো কেউ বলতে পারে না।
আর-এক দলের প্রবেশ
চতুর্থ।
ওরে, সর্বনাশ হয়ে গেল যে রে! কুমার ইন্দ্রকুমারকে কি কেউ খবর দিতে ছোটে নি?
তৃতীয়।
অনেক্ষণ গিয়েছে, আরাকানের ফৌজ আমাদের ফাঁকি দিয়ে আক্রমণ করতেই তখনই লোক গেছে– তাঁকে খুঁজে পেলে তো হয়।
দ্বিতীয়।
কুমার রাজ-ধর কি এখনো খবর পান নি?
চতুর্থ।
তিনি কোথায় আছেন খবরই পাওয়া গেল না, বোধ করি ত্রিপুরার দিকে চলে গেছেন। যুবরাজের সংবাদ জানতে পেলে এতক্ষণে তিনিও দৌড়ে ছুটে আসতেন।
প্রথম।
আমরা কোন্‌ মুখে দেশে ফিরব!
তৃতীয়।
ফিরব কেন, মরা যাক।
চতুর্থ।
যুদ্ধই ফুরিয়ে গেল তো মরব কী করে!
অপর ব্যক্তির প্রবেশ
অপর।
ওরে, করছিস কী! সর্বনাশ হল যে– একবার খোঁজ করবি চল্‌।
চতুর্থ।
হাঁ রে, চল– আমরা ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন দিকে যাই।
তৃতীয়।
আমাদের ভাগ্যে তিনি কি বেঁচে আছেন!
দ্বিতীয়।
আমি ভাবছি,ইন্দ্রকুমার যখন এ খবর শুনবেন তখন তিনি কি প্রাণ রাখতে পারবেন!
মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

দ্বিতীয় দৃশ্য

রণক্ষেত্র
ইন্দ্রকুমার ও সৈনিক
ইন্দ্রকুমার।
কোথায়– কোথায়? ওরে, দাদা কোথায়?
সৈনিক।
তাঁকেই তো খুঁজছি প্রভু।
ইন্দ্রকুমার।
আর, ইশা খাঁ?
সৈনিক।
আজ বেলা চার প্রহরের সময় যুবরাজ স্বহস্তে ইশা খাঁর কবরে মাটি দিয়েছেন, সেই মাটিতে তাঁর নিজেরও রক্ত তখন মিশছিল।
ইন্দ্রকুমার।
ধিক্‌ ধিক্‌ ইন্দ্রকুমার! ধিক্‌ তোকে! ধিক্‌ তোর চণ্ডাল রাগকে! দাদা! দাদা! এই নরাধমকে একবার মাপ চাইতেও সময় দেবে না? (উচ্চৈঃস্বরে) দাদা! সাড়া দাও। কেবল এক মুহূর্তের জন্যেও সাড়া দাও। ওরে, আর কেউ নেই নাকি? যে যেখানে আছিস সকলে মিলে তাঁকে খোঁজ্‌–আজ আমার দাদাকে চাইই যে।
দ্বিতীয় সৈনিকের প্রবেশ
দ্বিতীয়।
এই দিকে চলুন কুমার। তাঁর দেখা পেয়েছি।
ইন্দ্রকুমার।
কোথায়? কোথায়?
দ্বিতীয়।
কর্ণফুলির তীরে সেই অর্জুন গাছের তলায়।
ইন্দ্রকুমার।
সত্য করে বল্‌, তিনি কি–
দ্বিতীয়।
তিনি বেঁচে আছেন, তোমার জন্যেই অপেক্ষা করে রয়েছেন।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
মুকুট ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ । mukut । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

তৃতীয় দৃশ্য

কর্ণফুলির তীর
তরুতলে জ্যোৎস্নার ক্ষীণালোকে
যুবরাজ।
ওরে, সরিয়ে দে রে, একটু সরিয়ে দে। গাছের ডালগুলো একটু সরিয়ে দে, আজ আকাশের চাঁদকে একটু দেখে নিই। কেউ নেই! এ কি গাছেরই ছায়া! না আমার চোখের উপরে ছায়া পড়ে আসছে! এখনো কর্ণফুলির স্রোতের শব্দ তো শুনতে পাচ্ছি! এই শব্দটিতেই কি পৃথিবীর শেষ বিদায়সম্ভাষণ শুনব! ইন্দ্রকুমার! ভাই ইন্দ্রকুমার! এখনো তোমার রাগ গেল না!
ইন্দ্রকুমারের প্রবেশ
ইন্দ্রকুমার।
দাদা! দাদা!
যুবরাজ।
আঃ, বাঁচলুম ভাই! তুমি আসবে জেনেই এত দেরি করেই বেঁচে ছিলুম। তুমি অভিমান করে গিয়েছিলে বলেই আমি যেতে পাচ্ছিলুম না। কিন্তু, অনেক রাত হয়ে গেছে ভাই, এবার তবে ঘুমোই, মা কোল পেতেছেন।
ইন্দ্রকুমার।
দাদা! মার্জনা করলে কি?
যুবরাজ।
সমস্তই, সমস্তই! এখানকার যা-কিছু ছিল এই রক্ত দিয়ে মার্জনা করে গেলুম। কিছুই বাকি রাখি নি। কেবল একটি দুঃখ রইল, মহারাজের কাছে খবর পাঠাতে হবে আমার পরাজয় হয়েছে।
ইন্দ্রকুমার।
পরাজয় তোমার হয় নি দাদা, আমারই পরাজয় হয়েছে।
সৈনিকের প্রবেশ
সৈনিক।
কুমার রাজধর যুবরাজের পদধূলি নেবার জন্যে প্রার্থনা জানিয়ে পাঠিয়েছেন।
ইন্দ্রকুমার।
কখনো না! কিছুতেই না!
যুবরাজ।
ডাকো, ডাকো তাকে, ডাকো!
ইন্দ্রকুমার।
(রাগিয়া) দাদা– রাজধরকে–
যুবরাজ।
আবার ভাই! আবার!
ইন্দ্রকুমার।
না, না, না, আর নয়। আমার আর রাগ নেই।
রাজধরের প্রবেশ ও প্রণাম
রাজধর।
আমি নরাধম। এ মুকুট তোমার পায়ে রাখলুম। এ তোমারই।
যুবরাজ।
আমার সময় নেই। ইন্দ্রকুমারকে দাও ভাই।
রাজধর।
দাদার আদেশ মাথায় করলেম। এ মুকুট তুমি নাও।

মন্তব্য করুন