আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

আমার রবীন্দ্রনাথ – শিরনামে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন তার একান্ত নিজস্ব রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় [ Ranjan Bandyopadhyay ]
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় [ Ranjan Bandyopadhyay ]

[ আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ]

প্রিয় নতুন বউঠান,

এই প্রথম লিখতে বসে ভেবে পাচ্ছি না ঠিক কেমনভাবে শুরু করব। ভিড় করে আসছে স্মৃতি। জট পাকিয়ে আছে ঘটনার পর ঘটনা। তোমাকে মনে পড়ছে কতভাবে। কখনও নির্জনে কখনও সমাবেশে; কখনও খুশিতে কখনও বিষাদে; কখনও তুমি-আমি তোমার ঘরের পাশের ছাদে বাগান করছি, বাগানটির নাম রেখেছি ‘নন্দনকানন’; কখনও জানালার ধারে নিঃসঙ্গ তুমি, বসে আছ করতলে রাখি মাথা, কোলে ফুল পড়ে রয়েছে, তুমি ভুলে গেছ মালা গাঁধা। কখনও তোমার বন্ধ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আমি তোমাকে গান শোনাচ্ছি, কখনও ডাকছি তোমাকে সেই সব নামে, যে নামে তোমাকে আমি ছাড়া কেউ চেনে না।

ডাক শুনে তাকাও তুমিও আমার দিকে, কিন্তু আমি যে তোমায় জানি সে তো কেউ জানে না, তুমি মোর পানে চাও সে তো কেউ মানে না। ছাদে তুমি-আমি একা, সদ্য স্নানসারা মধুরিমা তোমার সর্বাঙ্গে, গান শোনাচ্ছি তোমাকে, যে-গান লিখেছি তোমারই জন্য, যে-গানে সুর দিয়েছি তোমাকে শোনাব বলে। হঠাৎ আমার কথায়, আমার সুরে সুর মেলালে তুমি, পৃথিবীর আর কোনও মেয়ে তোমার মতো করে আমার গান গাইতে পারেনি, তখন তোমাকে আমাকে মিলিত নিবিড় একা, স্থির আনন্দ মৌনমাধুরী ধারা, মুগ্ধ প্রহর ভরিয়া তোমারে দেখা, তব করতল মোর করতলে হারা।

মনে পড়ছে এক ঝিকিমিকি বিকেলবেলায় দেখেছিলাম তোমাকে, সদ্য গা-ধোয়া তরুণী তুমি, কচি মুখখানি, বয়েস তখন ষোলো, তনু দেহখানি ঘেরিয়াছে ডুরে শাড়ি। পিছন থেকে দেখেছিলাম তোমায়, তোমার কোমল গ্রিবা হয়েছিল লোভন রেশম চিকন চুলে। তবু কত ছবি আবছা। কত স্মৃতি আচ্ছন্ন। কত লিখন ধূলায় হয়েছে ধুলি। তোমায় কোথায় দেখেছি যেন কোন স্বপনের পারা। কবে তুমি গেয়েছিলে আঁখির পানে চেয়েছিলে ভুলে গিয়েছি, শুধু মনের মধ্যে জেগে আছে ওই নয়নের তারা।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা সাত বছর বয়েসে। তোমার বয়েস তখন নয়। একদিন ভোরবেলা ঘুম ভাঙতে শুনলাম বারোয়াঁ সুরে বাজছে সানাই। সেদিনই তুমি এলে আমাদের বাড়িতে, আমার খুব প্রিয় উনিশ বছরের জ্যোতিদাদার বউ হয়ে। জ্যোতিদাদার ডাক নাম ‘নতুন’। তাই মনে-মনে তোমাকে দূর থেকে ডাকলাম, নতুন বউঠান। তুমি যেন চেনাশোনার বাহির সীমানা থেকে মায়াবী দেশের নতুন মানুষ। খুব ভালো লাগত তোমাকে দেখতে, মনে হত আমাদের বাড়ির আর কোনও বউ তোমার মতো নয়, তোমার কচি শ্যামল হাতে সরু সোনার চুড়ি–—–ছুঁতে ইচ্ছে করত আমার। কিন্তু লজ্জা করত তোমার কাছে যেতে।

একদিন খেলার ছলে মৃদু হেসে তুমিই আমাকে কাছে ডাকলে। হঠাৎ সব বাধা হল দূর। মনে হল, যেন দূর পাহাড় থেকে বর্ষার জল নেমে সাবেক বাঁধের তলা দিল খইয়ে। আমাকে সহজে তোমার খেলার সাথি করে কাছে টেনে নিলে তুমি। ক্রমে গড়ে উঠল তোমার-আমার মধুর বন্ধুত্ব। তারপর একদিন জানাশোনা হল বাধাহীন। একদিন ডাকলাম তোমায় তোমার ডাকনামে। একদিন ঘুচে গেল ভয়, পরিহাসে পরিহাসে হল দৌঁহে কথা বিনিময়। সেই ছেলেবেলাতেই তোমার চোখের মায়ায় পড়েছিলাম আমি। আমাদের বাড়ির সবাই কমবেশি গৌরবর্ণ। তুমি ছিলে শ্যামবর্ণা। কিন্তু আমি দেখেছিলাম কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ। অনেক বছর পরেও তুমি আমার স্মৃতিতে বড় বড় কাজল চোখে অসঙ্কোচে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা নবকৈশোরের মেয়ে।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

সেই অসঙ্কোচ মেয়েটির টানেই আমি ইস্কুল পালাতাম, সন্দেহ নেই। আমি পড়ি বেঙ্গল অ্যাকাডেমি স্কুলে। ক্লাসে তোমার কথা ভাবি। জানলা দিয়ে বাইরে চলে যায় আমার অন্যমনস্ক দৃষ্টি। মনে হত, কখন বাড়ি ফিরব তোমার আমসত্ত্ব পাহারা দিতে, তোমার আরও পাঁচরকম খুচরো কাজের সাথি হতে। কখনও কখনও তুমি আমার ওপর দিতে জাঁতি দিয়ে সুপুরি কাটার ভার। খুব সরু করে সুপুরি কাটতে পারতুম। আমার অন্য কোনও গুণ ছিল, সে কথা কিছুতেই তুমি মানতে না। এমনকী তুমি আমার চেহারার খুঁত ধরে বিধাতার ওপর রাগ ধরিয়ে দিতে। কিন্তু আমার সুপুরিকাটা হাতের গুণ বাড়িয়ে বলতে তোমার মুখে বাধত না। তাতে সুপুরিকাটার কাজটা যে চলবে খুব দৌড়বেগে তা তুমি ভালোই বুঝতে।

পাত্তাভাত খেতে যে আমি ভালোবাসি তা তুমি কবে কীভাবে জেনেছিলে বলো তো? যেদিন সেই পাত্তার স্বাদে যুক্ত হত তোমার আঙুলের স্পর্শ, অল্প একটু লঙ্কার আভাস দিয়ে, সেদিন আর কথা ছিল না। একদিন তোমাকে সেই মুগ্ধতার কথা জানাতেই তুমি একটু হেসে বললে, কী বিচ্ছিরি দেখতে তোমায় ঠাকুরপো। আর একদিন তুমি আমাকে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলে আমার ললাট এবং মুখশ্রী পৃথিবীর অন্য অনেকের সঙ্গে তুলনায় কোনওমতে মধ্যশ্রেণির বলে গণ্য হতে পারে। তুলনাটা যে তোমার স্বামী, আমার জ্যোতিদাদার অনিন্দ্যসুন্দর মুখশ্রীর সঙ্গে, সেটা বুঝে ভারী অভিমান হয়েছিল।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

কিন্তু সব থেকে কষ্ট পেতাম সেদিন ইস্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখতাম -তোমার দরজার সামনে তোমার চটিজুতো জোড়া নেই, তুমি বেড়াতে গিয়েছ কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে। রাগ করে তোমার ঘর থেকে কোনও একটা দামি জিনিস লুকিয়ে রাখতুম। তুমি বাড়ি ফিরলে ঝগড়ার পত্তন করতুম। একদিন রাগ করে বললাম, তুমি বাইরে গেল তোমার ঘর সামলাবে কে? আমি কি চৌকিদার? মুখের মতো জবাব দিয়েছিলে তুমি, বলেছিলে, তোমাকে আর ঘর সামলাতে হবে না, নিজের হাত সামলিও। সেই মধুর তিরস্কার আজও মনে আছে আমার। ভুলতে পারিনি ভর্ৎসনার শেষে তোমার হাসিটি।

খুব অভিমান হত, হীনমন্যতায় ভুগতাম যখন তুমি কবি বিহারীলালকে বাড়িতে ডেকে নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াতে, তাঁর কবিতা শুনতে মন দিয়ে, তাঁর সঙ্গে গল্প করতে। আমিও তো লিখতাম কত কবিতা-গান আমার ‘মালতী পুঁথি’ নামের খাতায়, তোমার জন্য কিংবা তোমাকে নিয়ে লেখা কবিতা, তার খোঁজ কি রাখতে তুমি? আমার কবিতা শুনে প্রশংসা করা তো দূরের কথা, বলতে, আমি কোনওদিনই বিহারীলালের মতো লিখতে পারব না। আজ মনে হয় ভাগ্যিস তুমি এইভাবে উস্কে দিতে আমাকে!

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

তখন পনেরো বছর বয়েস আমার। তোমারই অহরহ সমালোচনার জবাব দিতে ‘মালতী পুথি’ জুড়ে অনুবাদ করে বসলাম শেক্সপিয়র-এর ‘ম্যাকবেথ’। এই নাটকেই আছে হেকেটি নামের এক ডাকিনি, যে-ডাকিনি আমার কল্পনায় হয়ে উঠল রহস্যময়ী এক নারী। হেকেটি তো শুধু ডাকিনি নয়। সে তো গ্রিক দেবীও বটে। গ্রিক পুরাণে যে দেবী প্রচ্ছন্ন নিরন্তর নিরালোকে। তাকে বোঝা যায় না, ধরা যায় না, শুধু অনুভব করা যায় তার আকর্ষণ। পনেরো বছর বয়েসে আমার প্রথম মনে হয়েছিল, তুমিও সেই রকম, অন্তরালের নারী। দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে।

তোমাকে ভেবেই কি অনেক বছর পরে লিখিনি, যে কেবল পালিয়ে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে? কখনও কখনও মনে হত তুমি অনেক কাছের, প্রায় আমার নাগালের মধ্যে, যেন তুমি দিলে ধরা গন্ধে ভরা বসন্তের এই সঙ্গীতে। কিন্তু সে ভুল ভাঙতে দেরি হত না, তখন বিষণ্ণ গহনে অনুভব করতাম, না গো না, দাওনি ধরা, হাসির ভরা দীর্ঘশ্বাসে যায় ভেসে। একদিন মনে হল তুমিই আমার হেকেটি, নয়নের আড়ালে যার নিত্য জাগার আসন পাতা। ১৮৭৫ সালের এক বসন্তবিকেল, সবে পনেরোতে পা দিয়েছি, আমার মালতী পুঁথি’র পাতায় পাতায় পাগলের মতো শুধু লিখতে লাগলাম, Hecate Thakroon, Hecate Thakroon, Hecate Thakroon । জলে ঝাপসা হয়ে এল আমার চোখ।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

নতুন বউঠান, সেই প্রথম তুমি আমার জীবনে হয়ে উঠলে ঠাকুরবাড়ির পরিচিত বৃত্তের বাইরে এক গোপনচারিণী, যার সঙ্গে আমার সম্পর্কের সবটুকু বলা যায় না, বোঝাও যায় না। এই আকর্ষণের কতটুকু ন্যায়, কতটুকু অন্যায়, বিচার করবে কে? ন্যায়-অন্যায় অন্তত আমি জানি না। শুধু তোমারে জানি, তোমারে জানি, হে সুন্দরী। আরও ছোট ছিলাম যখন, যখন তুমি ছিলে শুধুই খেলার সাথি, সেই তখন থেকেই শুরু হয়েছিল তোমার জন্যে আমার মন কেমন, যা আজও এই প্রান্তিক রবীন্দ্রনাথের মধ্যে অনির্বাপিত। আমার সব কথা, সব গল্প, শুধু তো ছিল তোমার সঙ্গে।

তুমিই তো শুধু বুঝতে আমার মনের কথা মনে পড়ছে, হঠাৎ একদিন আমাকে ফেলে তুমি অনেক দূরে কোথাও কিছুদিনের জন্যে বেড়াতে চলে গেলে জ্যোতিদাদার সঙ্গে। বুকের মধ্যে কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম আমি। সেই কষ্ট থেকে লিখলাম নিতান্ত কাঁচা এক কবিতা— চলে গেল আর কিছু নাহি কহিবার।/চলে গেল, আর কিছু নাহি গাহিবার। শুধু গাহিতেছে, আর শুধু বলিতেছে,/ চলে গেল সকলেই, চলে গেল সকলেই গো,/বুক শুধু ভেঙে গেল, চলে গেল গো। বুকের মধ্যে ওই হুহু করা কষ্ট আজও মনে পড়ে।

হেকেটি থেকে ‘হে’ – তোমার ডাক নাম দিয়েছিলাম আমি। শুধু হেকেটি থেকে নয়, ‘হেমাঙ্গিনী’ থেকেও ‘হে’। জ্যোতিদাদা নাটক লিখলেন, নাটকের নাম ‘অলীকবাবু,’ নায়িকা হেমাঙ্গিনীর ভূমিকায় অভিনয় করলে তুমি। আর আমি নায়ক অলীকবাবু। তোমাকে ঠাট্টা করে সকলের সামনে ডাকতে শুরু করলাম ‘হেমাঙ্গিনী ঠাকরুণ’। আর আড়ালে তোমাকে ডাকতাম শুধু ‘হে’। এ নামে তোমাকে আর কেউ জানত না। এই সময়ে প্রকাশিত হল আমার ‘ভগ্নহৃদয়’ কাব্যগ্রন্থ। তোমাকে বইটি উৎসর্গ করে লিখলাম, শ্রীমতী ‘হে’ কে উপহার। বেশ একটা রহস্য তৈরি হল কে এই ‘হে’— এই প্রশ্নটি ঘিরে। আমি চুপচাপ। তুমিও।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

নাটকে তুমি আমার প্রেমিকার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলে, এবং সে নাটক লিখেছিলেন তোমার স্বামী, আমার জ্যোতিদাদা। দিনের পর দিন এই নাটকের মহড়া দিতে দিতে আমরা কাছাকাছি সরে এসেছিলাম, বিপজ্জনকভাবে। নাটকে তুমি আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেমপত্র লেখো। একটি প্রেমপত্র তুমি লিখলে, “স্বামিন! কি বলিলাম! আমি কি আপনাকে এখন এরূপ সম্বোধন করিতে পারি? কে বলে পারি না? অবশ্য পারি। সমাজ ইহার জন্য আমাকে তিরস্কার করিতে পারে, পিতামাতা আমাকে জন্মের মতো ত্যাগ করিতে পারেন, কিন্তু এরূপ মধুর সম্বোধন করিতে কেহই আমাকে বিরত করিতে পারিবে না।

আমি জগতের সমক্ষে, চন্দ্র সূর্যকে সাক্ষী করিয়া মুক্তকণ্ঠে স্পষ্টাক্ষরে বলিব, তুমিই আমার স্বামী; শতবার বলিব, সহস্রবার বলিব, লক্ষবার বলিব, আমিই তোমার স্ত্রী।” তোমার কণ্ঠোচ্চারিত এই কথাগুলি আজও নিঃসঙ্গ মুহূর্তে আমার কাছে ফিরে ফিরে আসে—আমার পক্ষে ভুলে থাকা সম্ভব নয়। নতুন বউঠান, তোমার চোখ দুটোই কি কোনওদিন ভুলতে পারলাম? শেষ বয়েসে ছবি আঁকতে শুরু করেছি। আমার মনের মধ্যে গাঁথা আছে তোমার চোখ এমন গভীরভাবে, মানুষের ছবি আঁকতে বসলে অনেক সময়েই তোমার চোখ দুটো আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতে থাকে কিছুতেই ভুলতে পারিনে। তাই ছবিতেও বোধহয় তোমার চোখেরই আদল এসে যায়।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

১৮৭৮ সাল। আমি সতেরো। তুমি উনিশ। আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল বিলেতে। সেই আমাদের প্রথম দীর্ঘ বিচ্ছেদ–১৮৭৮ থেকে ১৮৮০। তোমাকে সরাসরি চিঠি লেখার সঙ্কোচ কাটিয়ে উঠতে পারিনি। কিন্তু তবু লিখেছিলাম অনেক চিঠি যার সঙ্কেত তুমি নিশ্চয় ধরতে পেরেছিলে। সে সব চিঠি ‘ভারতী’ পত্রিকায় ইউরোপ প্রবাসীর পত্র নামে প্রকাশিত হয়েছিল। আমার না হয় প্রবাসে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে দু-বছর কেটে গেল।

লুসি নামের এক কিশোরীর সঙ্গে অস্পষ্ট প্রেমও হল কিছুটা। কিন্তু তুমি কেমন করে কাটালে দুটো বছর? আমার দিদি স্বর্ণকুমারী দেবীর মেয়ে ঊর্মিলাকে সর্বস্ব করেছিলে তুমি। তুমিই তাকে সারাদিন দেখতে শুনতে খাওয়াতে পরাতে। তোমার সঙ্গে সে বাইরের তেতলার ঘরেই থাকত। একদিকে নিঃসন্তান হওয়ার দুঃখ ও গ্লানি, অন্যদিকে আমি নেই—এসব কষ্ট অনেকটাই ভুলিয়ে দিয়েছিল ছোট্ট ঊর্মি। ১৮৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর তোমার জীবনে এক মর্মান্তিক দিন। ছাদের ঘর থেকে লোহার সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে পড়ে গিয়ে মারা গেল ঊর্মিলা। তুমি একা হয়ে গেলে চিরদিনের মতো।

ঠাকুরবাড়ির আর কেউ তোমার সেই নিঃসঙ্গতা অনুভব করেছিলেন কি না। জানি না। আমি করেছিলাম তা-ই না লিখে পারিনি, “তাঁহার সমস্ত ঘরকন্না, তাঁহার সমস্ত কর্তব্যের অন্তঃস্তরের তলদেশে সুড়ঙ্গ খনন করিয়া সেই নিরালোকে নিস্তব্ধ অন্ধকারের মধ্যে অশ্রুমালাসজ্জিত একটি গোপন শোকের মন্দির নির্মাণ করিয়া রাখিলেন, সেখানে তাঁহার স্বামী বা পৃথিবীর আর কাহারও কোনও অধিকার রইল না।”

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

দু-বছর পরে বিলেত থেকে ফিরে এসে দেখলাম, যে উনিশ বছরের মেয়েটিকে ফেলে গিয়েছিলাম, আর যে একুশ বছরের মেয়ের কাছে ফিরে এলাম, তারা যেন এক মেয়ে নয়। তুমি যেন আমার ফিরে আসার জন্যই পথ চেয়ে বসেছিলে। ফিরে এসে বুঝলাম, ঠাকুরবাড়িতে তুমি কত একা। একে তুমি আমাদের কর্মচারী শ্যাম গাঙ্গুলির মেয়ে, তায় তোমার গায়ের রং কালো, সর্বোপরি তুমি নিঃসন্তান—এতগুলি অপরাধের অপরাধিনী তুমি, সুতরাং আমাদের অন্দরমহলে তোমাকে কথা শোনাবার লোকের অভাব ছিল না নিশ্চয়। কিন্তু আমি ফিরে আসতেই আমাদের দুজনের জীবনে যেন উজান এল।

আমি লিখলাম, “যৌবনের আরম্ভ সময়ে বাংলাদেশ ফিরে এলাম। সেই ছাদ, সেই চাঁদ, সেই দক্ষিণের বাতাস, সেই নিজের মনের বিজন স্বপ্ন, সেই ধীরে ধীরে ক্রমে ক্রমে চারিদিক থেকে প্রসারিত সহস্র বন্ধন।” আর তুমি? তোমার কথা লিখতে গিয়ে লিখলাম, “নাগপাশের দ্বারা জড়িত বেষ্টিত হয়ে চুপ করে বসে আছি।” তুমি-আমি যেন একাকার। আমার সেই অনুভব হয়ে উঠল গান: শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে/ তোমারি সুরটি আমার মুখের ‘পরে, বুকের ‘পরে।।/পুরবের আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়নে—/নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে।।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

আর কোনও টানে এমনভাবে ভেসে যাইনি কখনও। একের পর এক বই তোমাকেই উৎসর্গ করেছি। ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’-এর উৎসর্গে লিখলাম, “তোমাকে দিলাম’। ‘শৈশবসংগীত’-এর উৎসর্গে, ‘তোমাকেই দিলাম।’ ‘ভানুসিংহের পদাবলী’ যখন প্রকাশিত হল তুমি নেই। উৎসর্গে লিখলাম, “ভানুসিংহের কবিতাগুলি ছাপাইতে তুমি আমাকে অনেকবার অনুরোধ করিয়াছিলে। তখন সে অনুরোধ পালন করি নাই। আজ ছাপাইয়াছি। আজ তুমি আর দেখিতে পাইলে না।” ছ-বছর পরে প্রকাশিত হল ‘মানসী’, তোমাকে উৎসর্গ করে লিখলাম, “সেই আনন্দ মুহূর্তগুলি তব করে দিনু তুলি/সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণের প্রকাশ।”

আরও পাঁচবছর পরে ‘চৈতালী’র উৎসর্গপত্রে তোমার উদ্দেশ্যে লিখতে পারলাম, “সুখাবেশে লতামূলে/সারাবেলা অলস অঙ্গুলে/বৃথা কাজে যেন অন্যমনে/ খেলাচ্ছলে লহ তুলি।/ তব ওষ্ঠ দর্শনদংশনে/টুটে যাক পূৰ্ণফলগুলি।” তোমার দন্তরুচির কৌমুদিকামড়ে ফেটে যাচ্ছে রসে ভরা ফল, এমন এক চিত্রকল্প ফুটিয়ে তুলতে ভিতর পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল আমার, তবু না লিখেও পারিনি। আট বছর পরে কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গে আবার স্মরণ করলাম তোমাকেই—“কোমল তব কমল করে, পরশ করো পরান পরে।”

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

এখনও আমার কোনও নতুন বই প্রকাশিত হলেই তোমার কথা সর্বাগ্রে মনে পড়ে। কেন জানো? সে কথা আমি অকপটে লিখেছি, “বহুকাল হইল, তোমার কাছে বসিয়াই লিখিতাম, তোমাকে শুনাইতাম। সেই সমস্ত স্মৃতি ইহাদের মধ্যে বিরাজ করিতেছে। তাই মনে হইতেছে, তুমি যেখানেই থাকো না কেন, এ লেখাগুলি তোমার চোখে পড়িবেই।” দুপুরবেলায় জ্যোতিদাদা যেতেন নীচের তলার কাছারিতে। তুমি ফলের খোসা ছাড়িয়ে কেটে কেটে যত্ন করে রুপোর রেকাবিতে সাজিয়ে দিতে। নিজের হাতে মিষ্টান্ন কিছু কিছু থাকত, তার সঙ্গে আর তার উপরে ছড়ানো হত গোলাপের পাপড়ি। গেলাসে থাকত ডাবের জল কিংবা ফলের রস কিংবা তালশাঁস বরফে ঠান্ডা করা। সমস্তটার উপর একটা ফুলকাটা রেশমের রুমাল ঢেকে মোরাদাবাদি খুনচেতে করে জলখাবার বেলা একটা দুটোর সময় রওনা করে দিতে কাছারিতে।

এরপর বিছানায় শুয়ে শুয়ে তোমার সঙ্গে সাহিত্যপাঠ বা সাহিত্যচর্চা। তুমি শুনতে হাতপাখা নাড়তে নাড়তে। সেই বাতাসের একটা ভাগ আদায় করে নিতাম আমি। শুধু কি হাতপাখার হাওয়া? ঠাকুরবাড়ির মঞ্চও তো ভাগ করে নিলাম তোমার সঙ্গে । জ্যোতিদাদা লিখলেন নাটক, যে নাটকে তুমি উবর্শীর ভূমিকায়, আর আমি স্বয়ং মদন। কাছারিবাড়ি থেকে জ্যোতিদাদা ফিরতেন বিকেলবেলা। তুমি ততক্ষণে গা ধুয়ে চুল বেঁধে ঠাকুরবাড়ির বিশাল ছাদে গান-বাজনা আড্ডার জন্য তৈরি। দিনের শেষে ছাদের উপর পড়ত মাদুর আর তাকিয়া।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

একটা রুপোর রেকাবিতে বেলফুলের গোড়ে মালা ভিজে রুমালে, পিরিচে এক গ্লাস বরফ দেওয়া জল, আর বাটিতে ছাঁচি পান। গায়ে একখানা পাতলা চাদর জড়িয়ে আসতেন জ্যোতিদাদা, বেহালাতে লাগাতেন ছড়ি, আমি ধরতুম চড়া সুরের গান। গলায় যেটুকু সুর দিয়েছিলেন বিধাতা তখনও তা ফিরিয়ে নেননি। সূর্যডোবা আকাশে ছাদে ছাদে ছড়িয়ে যেত আমার গান। হুহু করে দক্ষিণে বাতাস উঠত দূর সমুদ্র থেকে, তারপর তারায় তারায় যেতে আকাশ ভরে। এই সময়ে তোমারই উদ্দেশ্যে ‘ছায়ানট’ রাগিনীতে একটি গান লিখেছিলাম আমি, “তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা।” ঠাকুরবাড়ির ছাদে কি শুধু আমিই গাইতাম? তোমার অনন্য কণ্ঠে গাইতে তুমিও। বিখ্যাত সুরস্রষ্টা, সঙ্গীতজ্ঞ জগন্মোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের পৌত্রী তুমি, সঙ্গীত তোমার রক্তে। তোমার কণ্ঠে কণ্ঠ মেলতাম আমি।

আমাকে দ্বিতীয়বার বিলেত পাঠাবার কথা উঠল পরিবারে। কিন্তু সেই বছরেই তো বিলেত থেকে দু-বছর পরে ফিরেছি আমি। এবং ফিরেই তোমার নিঃসঙ্গতার কথা ক্রমশ উপলব্ধি করেছি। আবার চলে যেতে হবে তোমাকে ছেড়ে? আবার বিচ্ছেদ? একাকিত্ব? মনকেমনের কষ্ট? এ কথা বুঝতে আমার দেরি হয়নি, ঠাকুরবাড়ির মেয়েমহলের ব্যবহার তোমার প্রতি ভালো ছিল। না। ‘গরিবের মেয়ে’ আর ‘বন্ধ্যা’ বলে খোঁটা দিতেন তোমাকে অনেকেই। হয়তো আমার সঙ্গে তোমার ঘনিষ্ঠতাও অনেকে ভালো চোখে দেখছিলেন না। জ্যোতিদাদাকে তোমার কাছ থেকে নিজের কাছে ক্রমশ সরিয়ে নিচ্ছিলেন।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

মেজো বউঠাকরুণ জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। তিনি ছিলেন বিলেতের আলোকপ্রাপ্তা। জ্যোতিদাদা তখন মেজো বউঠাকরুণের উড স্ট্রিটের বাড়িতেই সময় কাটান বেশি। তারপর তাঁর পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতেও। সেখানেই ক্রমশ সরে গেল গানবাজনার আড্ডা। ক্রমশ নিভে গেল আমাদের ছাদ বারান্দার মজলিস। একদিকে জাহাজের ব্যবসা, অন্যদিকে জ্ঞানদানন্দিনীর টান, থিয়েটারের জগৎ—জ্যোতিদাদা তো বাড়ি ফিরতেও ভুলে যেতেন। এমনকী তোমার জন্মদিন পাঁচ জুলাইতেও তিনি থাকলেন বাড়ির বাইরে। পাঁচ জুলাই তো তোমার বিয়ের দিনও। ভুলে গেলেন জ্যোতিদাদা! কিন্তু আমি তো ভুলিনি। আমি সব ফেলে ছুটে এসেছিলাম তোমার কাছে, তোমার নিঃসঙ্গ ঘরে।

আমাকে আবার বিলেত যেতে হবে, বলেছিলাম তোমাকে। একাকিত্বের কষ্ট তোমার পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব হচ্ছিল না। আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তুমি। আমি বিলেত যাওয়া বন্ধ করলাম। কিন্তু পরের বছর পারিবারিক চাপে বিলেতযাত্রা করতেই হল, ব্যারিস্টার হওয়ার জন্য! যেই জাহাজ ছাড়ল ভয় ঘনিয়ে এল বুকের মধ্যে, তুমি যদি আবার আত্মহত্যার চেষ্টা করো? যদি সহ্য করতে না পারো আমার সঙ্গে আবার দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর্ব? আমার পক্ষেও কি তোমাকে ছেড়ে থাকা সম্ভব? জাহাজ মাদ্রাজ পর্যন্ত পৌঁছোতেই আমি পালালাম।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

সোজা তোমার কাছে, চন্দননগরে, প্রথমে তেলেনিপাড়ায় বাঁড়ুজ্যেদের বাগানবাড়িতে, পরে মোরান সাহেবের বাগানবাড়ি। আমি যে জাহাজ থেকে নেমে কলকাতার বাড়িতে না ফিরে তোমার কাছে চলে এসেছি, সে খবর বাবামশাইয়ের কাছে পৌঁছোতে দেরি হয়নি। তোমার সঙ্গে সেই ক’টা দিন জীবনের সবচেয়ে সুখের সময়। গঙ্গা সাঁতরে তখন এপার-ওপার হতাম। তুমি দেখে আতঙ্কে শিউরে উঠতে। কত বেড়িয়েছি তুমি আর আমি জঙ্গলে। কত কুল পেড়ে খেয়েছি। ‘এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর’—এ গানে এখানেই সুর দিই। সুর দিয়েই তোমাকে শোনাই। খুব ভালোবাসতুম তোমাকে। তুমিও বাসতে।

বিদ্যাপতির ভরা বাদর মাহ ভাদর গাইতে গাইতে বৃষ্টিপাত মুখরিত জলধারাচ্ছন্ন মধ্যাহ্নে খ্যাপার মতো কাটিয়ে দিতাম তোমার সঙ্গে। কখনও বা সূর্যাস্তের সময় আমরা নৌকা করে বেরিয়ে পড়তাম—তখন পশ্চিম আকাশে সোনার খেলনার কারখানা একেবারে নিঃশেষে দেউলে হয়ে গিয়ে পূর্ব বনান্ত থেকে চাঁদ উঠে আসত। আমরা যখন বাগানের ঘাটে ফিরে নদীতীরের ছাদটার উপর বিছানা করে বসতাম, তখন জলে-স্থলে শুভ্র শান্তি, নদীতে নৌকা প্রায় নেই, তীরের বনরেখা অন্ধকারে নিবিড়।

সেই দুজনে মিলে কল্পনার রাজ্যে বিচরণ, সেই মৃদু গম্ভীর স্বরে গভীর আলোচনা, সেই দুজনে স্তব্ধ হয়ে নীরবে বসে থাকা, সেই প্রভাতের বাতাস, সেই সন্ধ্যার ছায়া, একদিন সেই ঘনঘোর বর্ষার মেঘ, শ্রাবণের বর্ষণ, বিদ্যাপতির গান—তারা সব চলে গেছে। কিন্তু আমার ভাবগুলির মধ্যে তাদের ইতিহাস লেখা রইল। এক লেখা তুমি-আমি পড়ব। আর এক লেখা আর সকলে পড়বে।

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

মোরান সাহেবের বাড়ি থেকে আমরা ফিরলাম কলকাতায়। কিন্তু ঠাকুরবাড়িতে নয়। পাথুরিয়াঘাটার মহারাজা যতীন্দ্রমোহনের ১০ সদর স্ট্রিটের বাড়িটি ভাড়া করে সেখানেই উঠলাম। সর্বক্ষণ কাছে পেলাম তোমাকে। একদিন সকালবেলার আলোয় তোমাকে দেখেছি, চোখের সামনে থেকে যেন সরে গেল পরদা, নতুন রূপে প্রকাশিত হল আকাশ-বাতাস-প্রকৃতি, নতুনভাবে দেখলাম বুঝলাম তোমাকেও, ঘটল নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ।

পরের বছর দুর্গাপুজোয় আমরা গেলাম দার্জিলিঙে। সেই আমাদের শেষ একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়া। কিছুদিনের মধ্যেই, ১৮৮৩-র মে মাসে, প্রকাশিত হল ‘প্রভাতসঙ্গীত’। এবং এক মাস পরেই ‘ভারতী’ পত্রিকার জৈষ্ঠ্য সংখ্যায় আমি ডাক দিলাম আমাদের সর্বনাশকে, লিখলাম, “সেই জানলার ধারটি মনে পড়ে, সেই বাগানের গাছগুলি মনে পড়ে, সেই অশ্রুজলে সিক্ত আমার প্রাণের ভাবগুলিকে মনে পড়ে। আর একজন যে আমার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহাকে মনে পড়ে, সে যে আমার খাতায় আমার কবিতার পার্শ্বে হিজিবিজি কাটিয়া দিয়াছিল, সেইটে দেখিয়া আমার চোখে জল আসে। সেই তো যথার্থ কবিতা লিখিয়া ছিল। তাহার সে অর্থপূর্ণ হিজিবিজি ছাপা হইল না, আর আমার রচিত গোটাকতক অর্থহীন হিজিবিজি ছাপা হইয়া গেল।”

আমার রবীন্দ্রনাথ - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

‘ভারতী’ পত্রিকায় এ লেখা প্রকাশিত হওয়ার পরেই ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে চমকে উঠল অশনি সংকেত। বাবামশাই তলব করলেন আমাকে, বললেন, অবিলম্বে আমাকে বিয়ে করতে হবে। এবং তোমাকে পাঠানো হল যশোরে তোমার প্রিয়তম পুরুষটির বউ খুঁজতে। সেই মানসিক চাপ সহ্য করতে পারোনি তুমি। কলকাতায় ফিরেই অসুস্থ হয়ে পড়লে। আমার বিয়ে হয়ে গেল ১৮৮৩-র ৯ ডিসেম্বর। আমি তখন বাইশ। তুমি চব্বিশ। বিয়ের ভাঁড় খেলতে গিয়ে ভাঁড়গুলিকে দিলেম ইচ্ছে করে উলটে। ছোট কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী চিৎকার করে উঠলেন, “একী করছিস রবি।” আমি বললাম, “সবই তো আজ থেকে ওলোটপালোট হয়ে গেল কাকিমা।”

জ্যোতিদাদার জোব্বার পকেটে তুমি হঠাৎ খুজে পেলে কিছু চিঠিপত্র যা থেকে তোমার হয়তো বুঝতে অসুবিধে হয়নি কেন জ্যোতিদাদা বাড়ি ফিরতে ভুলে যান। জ্যোতিদাদার দুটি নাটক, ‘অশ্রুমতি’ আর ‘সরোজিনী’তে অভিনয় করছিলেন বিনোদিনী। বিনোদিনী লিখলেন, “অভিনয় করতে করতে আমরা একেবারে আত্মহারা হয়ে যেতাম।” ১৮৮৪-র ফেব্রুয়ারিতে বেরল আমার ‘ছবি ও গান’। সদ্য বিবাহিত আমি তোমাকেই উৎসর্গ করলাম এ-বই, লিখলাম, “গত বৎসরকার বসন্তের ফুল লইয়া এ বৎসরকার বসন্তে মালা গাঁথিলাম।”

আমার বিয়ের ঠিক চারমাস পরে ১৮৮৪-র ১৯ এপ্রিল দ্বিতীয়বার আত্মহত্যার চেষ্টায় আফিম খেলে তুমি। তোমার চেষ্টা এবার সফল হল ২১ এপ্রিল সন্ধেবেলা। তোমার আত্মহত্যার সমস্ত প্রমাণ লোপাট করলেন। বাবামশাই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাহান্ন টাকা ঘুষ দিয়ে আর লেঠেলের ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করলেন খবরের কাগজের। তোমার মৃত্যুসংবাদ কোনও সংবাদপত্রে ছাপা হয়নি। তোমার মৃতদেহ, মর্গে পাঠানো হয়নি। জোঁড়াসাঁকোর বাড়িতে গোপনে করোনার কোর্ট বসেছিল। করোনার রিপোর্ট আমি আজও খুঁজে পাইনি।

তোমার মৃত্যুর পরেই মেজো বউঠাকরুণ আর জ্যোতিদাদা জাহাজে করে বেড়াতে গেলেন। ফিরে এসে জ্যোতিদাদা জ্ঞানদানন্দিনীর কাছেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে লাগলেন। ১৯১০ সালে রাঁচির মোরাবাদী পাহাড়টি কিনে সেখানে বাড়ি করে চলে যান জ্যোতিদাদা। সেই পাহাড়ের তলায় তৈরি হল জ্ঞানদানন্দিনীর বাড়ি। আমি রাঁচিতে জ্যোতিদাদার কাছে ভুলেও কখনও যাইনি।

তোমার মৃত্যুর পঁচিশ বছর পরে ‘লিপিকা’র ‘প্রথম শোক’ লেখাটিতে কী লিখেছিলেম জানো? লিখেছিলেম, “বনের ছায়াতে যে পথটি ছিল সে আজ ঘাসে ঢাকা। সেই নির্জনে হঠাৎ পিছন থেকে কে বলে উঠল আমাকে চিনতে পারো না?’ আমি ফিরে তার মুখের দিকে তাকালেম। বললেম, ‘মনে পড়ছে, কিন্তু ঠিক নাম করতে পারছিনে। সে বললে, ‘যে অন্তর্যামির বর, তিনি তো ভোলেননি। আমি সেই অবধি ছায়াতলে গোপনে বসে আছি। আমাকে বরণ করে নাও।”

ইতি

তোমার রবি।

পুনশ্চ । প্ল্যানচেটে তোমাকে কতবার ডেকেছি। শেষবার ডেকেছিলাম ১৯২৯ এর ২৯ ডিসেম্বর, রাত্তিরবেলা। প্রশ্ন করলেম, নাম বলবে? তুমি বললে, না। আমি বললেম, আমি তোমার কথা শান্তিনিকেতনে অনেকবার ভেবেছিলুম। আমার শরীর ভালো ছিল না। তখন তোমায় ভেবেছি। তুমি জানতে? তুমি বললে, জানি। আমি আসতে পারিনি। শেষ রাত্রে শিরশিরে হাওয়ায় তুমি যখন গায়ের কাপড়টা টেনে নিলে, আমি এসেছিলুম তখন। আমার ছায়াটা আজও আছে। প্রাণ আছে। দেহ নেই।

• বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন