রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীতে রাগ-রাগিণীর ব্যবহার, রবীন্দ্র সঙ্গীত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব, রাগাশ্রয়ী রবীন্দ্র সঙ্গীত, রাগ প্রধান রবীন্দ্র সঙ্গীত – এসব বিষয়ে অনেকেই প্রশ্ন করেন। সেসব আগ্রহের কারণেই আমরা ঠাকুর পরিবারের অন্তরালে ঢুকে দেখার চেষ্টা করবো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিষয়টি কিভাবে সেখানে ছিল।

রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

ঠাকুর পরিবারের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তথা বিভিন্ন শিল্প ধারার বীজ সর্বপ্রথম রোপিত হয় প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময়কাল হতে। তিনি তৎসময়ে বহু বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং নাট্যমঞ্চের পৃষ্ঠপোষক ও উৎসাহদাতা ছিলেন। তারই যোগ্য পুত্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহচার্য্যে এবং অনুপ্রেরণায় ঠাকুর বাড়ীতে হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের চর্চা আরো ব্যাপকতা লাভ করে। ঠাকুর বাড়ির ছেলে মেয়ে যাতে করে যথাযথ সঙ্গীত চর্চার দ্বারা শিক্ষিত হতে পারে তার জন্য তিনিও বড় বড় ওস্তাদের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন।

ঠাকুর বাড়ির শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নেপথ্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, তাতে বিষ্ণুপুর ঘরণার প্রাদুর্ভাব যথেষ্ট। ১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায়ের প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজের গায়ক হিসাবে রানাঘাটের প্রখ্যাত ধ্রুপদিয়া ও বিষ্ণুপুর ঘরনার বিশিষ্ট ধারক ও বাহক বিষ্ণুচক্রবর্ত্তী ও কৃষ্ণচক্রবর্তী নিযুক্ত হন।

রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দেরর রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ আদি ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত সভায় এবং বাড়ীর সঙ্গীত শিক্ষক হিসাবে তিনি বিষ্ণুচক্রবর্ত্তীকে নিযুক্ত করেন। ইনি তানসেন ঘরানার একজন মুসলীম ধ্রুপদীয়ার কাছে ধ্রুপদের তালিম নেন।

তাঁর সাবলীল শিক্ষাদানের বৈশিষ্ট্যগুণে তিনি ঠাকুর বাড়ির ছেলেমেয়েদের কাছে সবিশেষে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। বিষ্ণুচক্রবর্ত্তীর তিরোধানের পর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষ্ণুপুর ঘরনার প্রখ্যাত ধ্রুপদীয়া ওস্তাদ যদুভট্টকে বাড়ীর ছেলে মেয়েদের সঙ্গীত শিক্ষকরূপে নিযুক্ত করেন।

যতটুকু জানা যায় যদুভট্টের বিষমছন্দ ও বিষমপদী তাল বেশ পছন্দ ছিল। গুরুর এই প্রভাব শিষ্য রবীন্দ্রনাথকেও প্রভাবিত করে। মনে হয় সে কারণেই রবীন্দ্রসৃষ্ট সকল তালগুলি বিষমপদীছন্দের এবং কবির প্রথম বয়সের গানগুলো প্রায় সবই গুরুর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে রাগের ভিত্তিতে সুরারোপীত।রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

ওস্তাদ যদুভট্টক ঠাকুর বাড়িতে দীর্ঘ ৫ বৎসর অবস্থানের পর তিনি ত্রিপুরার রাজবাড়ীতে সভা গায়ক হিসাবে নিযুক্ত হন। যদুভট্টের প্রতিভার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘ছেলেবেলায় আমি একজন বাঙালী গুণীকে দেখেছিলাম, যাঁর অন্তরের সিংহাসন রাজমর্যাদায় ছিল।

কণ্ঠের দেউড়িতে ভোজপুরী দারোয়ানের মত তাল ঠোকাঠুকি করত না।’ যখন আমাদের জোড়াসাঁকোয় বাড়িতে থাকতেন, নানাবিধ লোক আসত তাঁর কাছে শিখতে; কেউ শিখত মৃদঙের বোল, কেউ শিখত রাগরাগিনীর আলাপ, বাংলাদেশে এরকম ওস্তাদ জন্মায়নি, তাঁর প্রত্যেকটি গানে Originality ছিল।

রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আলবার্ট আইনস্টাইন

ঊনবিংশ শতাব্দীর সঙ্গীত জগতে রাধিকা প্রসাদ গোস্বামী একটি অবিস্মরণীয় প্রতিষ্ঠান। তিনি বিষ্ণুপুর ঘরানার একজন অন্যতম ধারক। যদুভট্টের পর তিনি ঠাকুর পরিবারের সঙ্গীত শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। এছাড়া তিনি আদি ব্রাহ্মসমাজের গায়ক এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় সঙ্গীত সমাজের সংগীতাচার্য্য ছিলেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক থেকে ব্রাহ্মসমাজের পৃষ্ঠপোষকরূপে যে ধ্রুপদীগানের সূচনা তা ঠাকুরবাড়ির প্রকোষ্ঠে পল্লবিত হতে থাকে এবং বিষ্ণুপুর ঘরনার বিভিন্নমুখী ধ্রুপদী গায়কদের সাহচর্য্যে তা প্রায় বিংশ দশক অবধি বিস্তৃত হয়।

রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ধ্রুপদ গানে চারটি তুক থাকে সেজন্য একে চারতুক বলা হয়। অর্থাৎ স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ এবং উক্ত বিভাগগুলির সুর সঞ্চালনের নির্দিষ্টস্থান শাস্ত্রীয় মতে নির্দেশিত আছে। ভাষাগত গভীরতা আধ্যাত্ববোধ আত্মত্মসংযম এর প্রধান উপজীব্য।

ধ্রুপদ গানের ঐশ্বর্য্য বর্ণনা করতে গিয়ে গুরুদেব বলেছেন, তার আভিজাত্য বৃহসীমার মধ্যে আপন মর্যাদা লাভ করে। এই ধ্রুপদগানে আমরা দুটি জিনিস পেয়েছি। একদিকে তার বিপুলতা, গভীরতা, আর একদিকে তার আত্মদমন, সুসংগতির মধ্যে ওজন রক্ষা করা।

বিষ্ণুপুর ঘরনার সঙ্গীতের এই অন্তর্নিহিত ভাবধারা কবি গুরুকে সবিশেষ অনুপ্রাণিত করে এবং তাঁর জীবনব্যাপি সঙ্গীত সাধনায় এই সুরবৈভব পল্লবিত হয়ে বরীন্দ্রসঙ্গীতকে তার আপন বিভায় মহিমান্বিত করেছে। তাঁর সঙ্গীত সাগরে অনুপ্রবেশে এটি অনুভুত হয় যে, যে সমস্ত গানগুলি ধ্রুপদের অঙ্গীভূত নয়।

রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু

যে গানগুলি চারতুকের অনুসরণে চারটি ভাগে বিভক্ত করেছেন এবং যে সমস্ত তালের প্রকৃতি গম্ভীর, যথা চৌতাল, ধামার, আড়াচৌতাল, ঝাঁপতাল, তারই চলনের দিকে লক্ষ্য রেখে তিনি অজস্রগান রচনা করেছেন। ধ্রুপদ গানে অলংকার নিষিদ্ধ, সে রকম গুরুদেবের চারকলীর যাবতীয় গান সুর ও অলংকার বিহীন। কবিগুরুর সৃষ্ট কয়েকটি তাল যথা ঝম্পক, ষষ্ঠী তাল, রূপকড়া, নবতাল, একাদশী, নবপঞ্চতাল।

এসব তালে যে গানগুলি তিনি রচনা করেছেন তার গঠন ও গীতপদ্ধতি হুবহু চারকলির হিন্দীধ্রুপদের মত। এই গান গুলি মূলতঃ পূজা পর্যায়ে পাওয়া যায় এবং উক্ত তালগুলি তালি ভিন্ন খালি নেই কোথাও। কবিগুরুর সঙ্গীত ভাণ্ডারে ধামার গানের সংখ্যা বিরল নয়, তবে হিন্দুস্থানী সঙ্গীতে ভাতখণ্ডেঞ্জীর অনুসৃত ধামার গানের বিভাগ ও ছন্দ হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

হিন্দুস্থানী সঙ্গীতে ৫+২+৩+৪= ১৪ মাত্রা এবং রবীন্দ্র সঙ্গীতে ৩+২+২+৩+৪ = ১৪ মাত্রা। বলাবাহুল্য, হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের মত, তাল আলাপ ইত্যাদি লয়কারী রবীন্দ্র সঙ্গীতে প্রযোজ্য হয় না। কারণ ভাবের গভীরতা ও সুরের গাম্ভীর্য্যও বৈভব এই গানের প্রধান উপজীব্য।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠোর অনুশাষণ এবং বাধ্যবাধকতায় কবি ছিলো পরাংমুখ। তাই কবির সৃষ্ট রাগভিত্তিক বহু সঙ্গীতেরাগে বিবর্জিত স্বর প্রয়োগ। রাগের মূল ভাবটিকে সামান্যতম ক্ষুণ্ণ না করে তথা শ্রোতাকে আস্বদনে আপ্লুত করেছে। কবির এই পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে আমরা তাঁর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যক্তিগত গভীরতার দৃষ্টিভঙ্গী যে কতটা গভীর ছিল তা তাঁর নিজের লেখাতেই সুপরিস্ফুট, গান নিজের ঐশ্বর্য্যেই বড়ো; বাক্যের দাসত্ব সে কেন করিতে যাইবে।

কাব্য যেখানে শেষ হয়েছে সেখানেই গানের আরম্ভ। যেখানে অনির্বচনীয় সেখানেই গানের প্রভাব। বাক্য যা বলতে পারে না গান তাই বলে। এজন্য গানের কথাগুলিতে কথার উপদ্রপ যতই কম থাকে ততই ভাল।

রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


হিন্দুস্থানী গানের কথা সধারণত এতই অকিঞ্চিতকর যে, তাহাদের অতিক্রম করিয়া সুর আপনার আবেদন অনায়সে প্রচার করতে পারে। এই রূপে রাগিনী শুধুমাত্র স্বর রূপেই আমাদের চিত্তকে অপরূপভাবে জাগ্রিত করতে পারে। সেখানেই সঙ্গীতের উৎকর্ষ। হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি কবিগুরুর শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠা তাঁর সৃষ্ট গান এবং রাগে স্বর প্রয়োগের একান্ত সাক্ষ্য বহন করে।

জনশ্রুতি আছে যে, আমি হিন্দুস্থানী সঙ্গীত জানিনে বুঝিনে, আমার আদি যুগের রচিতগানে হিন্দুস্থানী ধ্রুবপদ্ধতির রাগ রাগিনীর বিশুদ্ধ প্রমাণসহ দুরভাবী শতাব্দীর প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। ইচ্ছে করলেও সেই সঙ্গীতকে আমি প্রত্যাখ্যাত করতে পারিনে, “সেই সঙ্গীত থেকেই আমি প্রেরণালাভ করি, একথা যারা জানে না তারাই হিন্দুস্থানী সঙ্গীত জানে না।”

কবি গুরুর শাস্ত্রীয়, সঙ্গীতের পরিশিলিত ধারায় যে গানগুলি রচিত তা শুধু বাণী ও সুরের মধ্যেই নিহিত। ধ্রুপদ ধামার খেয়ালে, টপ্পা, ঠুমরী অংগের গান হলেও তাতে শাস্ত্রীয় ধারা বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয় না। শুধু বাণীতে এবং সুরের ধারাবাহিকতায় তা বোঝা যায়। নজরুলের শাস্ত্রীয় ধারার গান মোটামুটিভাবে শাস্ত্রীয় নিয়মের মত করেই গাওয়া হয়। কিন্তু রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্পূর্ণ আলাদা। – রবীন্দ্র সঙ্গীতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিশিলিত ধারার গানের উদাহরণঃ

১.জয় তব বিচিত্র আনন্দ-(ধ্রুপদ)
২. সাজাব তোমারে হে-(ধামার)
৩. শীতিল তব পদছায়ে – (খেয়াল)
৪. এ পরবাসে রবেকে সার্থক জনম আমর (টপ্পা)

রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে আরও পড়ুন:

“রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন