আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

আলো আমার আলো ওগো | Aalo Amar Aalo Ogo

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত প্রকৃতি ও আনন্দ পর্যায়ের গানগুলোর মধ্যে ‘আলো আমার আলো ওগো’ এক অনবদ্য এবং প্রাণবন্ত সৃষ্টি। গীতবিতানের এই গানটি যেন প্রকৃতির অবারিত আনন্দ এবং অন্তরের অনন্ত আলোর এক অপূর্ব সাঙ্গীতিক উদ্‌যাপন। সুরের মূর্ছনায় চারপাশের প্রকৃতি, আকাশ, বাতাস এবং আলোর যে স্বর্গীয় রূপ কবি এঁকেছেন, তা শ্রোতার আত্মাকে এক নির্মল প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে।

গানের মূল তথ্য

| গানের নাম | আলো আমার আলো ওগো |

| গীতিকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| সুরকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| পর্যায় | প্রকৃতি / আনন্দ |

| রাগ ও তাল | ইমন ও দাদরা |

| স্বরলিপিকার | ভীমরাও শাস্ত্রী |

| রচনাকাল ও স্থান | ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৮ বঙ্গাব্দ), শিলাইদহ |

গানের পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

এই অসামান্য গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে (১৩১৮ বঙ্গাব্দে) তৎকালীন পূর্ববঙ্গের শিলাইদহে অবস্থানকালে রচনা করেছিলেন। গানটির স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন প্রখ্যাত স্বরলিপিকার ভীমরাও শাস্ত্রী। শিলাইদহের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ নদী ও উন্মুক্ত আকাশ কবির সৃষ্টিশীল মনকে সবসময় গভীরভাবে প্রভাবিত করত। প্রকৃতির এই অবারিত রূপ ও আলোর বন্যায় মুগ্ধ হয়েই কবি তাঁর অন্তরের উচ্ছ্বাসকে এই গানে রূপ দিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের কাব্যসাহিত্যের মূল বৈশিষ্ট্য—প্রকৃতিপ্রেম, গীতিধর্মিতা, চিত্ররূপময়তা এবং আধ্যাত্মিকতা এই গানে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ঠিক পূর্ববর্তী এই সময়টিতে কবির মনে যে বিশ্বপ্রেম ও আধ্যাত্মিক চেতনার গভীর উন্মেষ ঘটছিল, তার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় ‘আলো আমার আলো ওগো’ গানটিতে। এখানে বাহ্যিক আলো কেবল সূর্যরশ্মি নয়, বরং তা অন্তরের এক ঐশ্বরিক জাগরণের প্রতীক হয়ে ধরা দিয়েছে।

গানের সঠিক লিরিক ও কথা

আলো আমার আলো ওগো লিরিক্স বাংলা সংস্করণ

আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন-ভরা।

আলো নয়ন-ধোওয়া আমার, আলো হৃদয়-হরা।

নাচে আলো নাচে, ও ভাই, আমার প্রাণের কাছে

বাজে আলো বাজে, ও ভাই হৃদয়বীণার মাঝে

জাগে আকাশ, ছোটে বাতাস, হাসে সকল ধরা।

আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি।

আলোর ঢেউয়ে উঠল নেচে মল্লিকা মালতী।

মেঘে মেঘে সোনা, ও ভাই, যায় না মানিক গোনা

পাতায় পাতায় হাসি, ও ভাই, পুলক রাশি রাশি

সুরনদীর কূল ডুবেছে সুধা-নিঝর-ঝরা।

Aalo Amar Aalo Ogo Romanized Version

Aalo amar, aalo ogo, aalo bhubon-bhora.

Aalo noyon-dhowa amar, aalo hridoy-hora.

Nache aalo nache, o bhai, amar praner kache

Baje aalo baje, o bhai hridoybinar majhe

Jage akash, chote batas, hase sokol dhora.

Aalor srote pal tuleche hajar projapoti.

Aalor dheuye uthlo neche mollika maloti.

Meghe meghe sona, o bhai, jay na manik gona

Patay patay hasi, o bhai, pulok rashi rashi

Surnodir kul dubeche sudha-nijhor-jhora.

গানের সুর ও ভাবার্থ বিশ্লেষণ

গানটির সুর হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের অত্যন্ত সুপরিচিত ‘ইমন’ রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি ‘দাদরা’ তালের চটুল ছন্দে গীত হয়। রাগ ইমনের শান্ত, গম্ভীর অথচ প্রসন্ন রূপ এই গানের আনন্দময় কথাগুলোর সাথে মিশে এক অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। দাদরা তালের দোলায়িত গতির কারণে গানটি গাওয়ার সময় এক ধরণের উৎসবমুখর ও উচ্ছল আবহ তৈরি হয়, যা শ্রোতাকে সহজেই প্রকৃতির নাচের ছন্দে দুলিয়ে দেয়।

গানের মূল ভাবটি আবর্তিত হয়েছে আলোর বন্দনা এবং প্রকৃতির মাঝে প্রাণের স্পন্দনকে কেন্দ্র করে। কবি এখানে আলোকে এমন এক ঐশ্বরিক সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছেন, যা কেবল চোখকে আলোকিত করে না, বরং হৃদয়কেও হরণ করে নেয়। আলোর স্রোতে প্রজাপতির উড়ে বেড়ানো, মল্লিকা-মালতী ফুলের নেচে ওঠা কিংবা মেঘে মেঘে সোনার আভা—প্রকৃতির এই প্রতিটি রূপকের মধ্য দিয়ে কবি মূলত জীবনের উচ্ছ্বাস এবং স্রষ্টার অসীম দয়াকে উদ্‌যাপন করেছেন।

এই গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর দৃশ্যপট ও শব্দের জাদুকরী বুনন। ‘নাচে আলো’, ‘বাজে আলো’—এমন শব্দবন্ধের মাধ্যমে কবি আলোকে কেবল দেখার বিষয় নয়, বরং অনুভব করার এবং শোনার বিষয়ে পরিণত করেছেন। সুরনদীর কূল ছাপিয়ে যাওয়া সুধার ঝরনা মূলত মানবাত্মার সেই পরম আনন্দেরই প্রকাশ, যা জাগতিক সব মলিনতা ধুয়ে দিয়ে মনকে এক স্বর্গীয় আনন্দে পূর্ণ করে তোলে।

উৎস (Sources)

এই নিবন্ধের ঐতিহাসিক, স্বরলিপি এবং ভাবার্থ সংক্রান্ত তথ্যসমূহ রবীন্দ্র-রচনাবলী (গীতবিতান, প্রকৃতি পর্যায়), বিশ্বভারতী সংগীত বোর্ড প্রকাশিত প্রামাণ্য স্বরলিপি গ্রন্থমালা এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।

 

 

 

Share

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় পরিচিত।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প *গল্পগুচ্ছ* এবং ১,৯১৫টি গান *গীতবিতান* সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলি ৩২ খণ্ডে *রবীন্দ্র রচনাবলী* নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর পত্রসাহিত্যও *চিঠিপত্র* নামে ১৯ খণ্ডে এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন; তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে *গীতাঞ্জলি* কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

https://amarrabindranath.com/

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত