“আহা, আজি এ বসন্তে” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুল পরিচিত একটি গান, যা তাঁর গীতিনাট্য ‘মায়ার খেলা’-র সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। গানটির পটভূমিতে একদিকে বসন্তের উচ্ছ্বাস—ফুল, বাঁশি, পাখির গান; অন্যদিকে রয়েছে এক নারীর অন্তর্গত বেদনা ও উপেক্ষার অনুভূতি। ফলে প্রকৃতির আনন্দময় পরিবেশ এবং ব্যক্তিমানুষের দুঃখ এখানে পাশাপাশি অবস্থান করেছে।
গানটির শুরুতেই বসন্তের বহির্জগতের সৌন্দর্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেই উঠে আসে প্রশ্ন—“সখীর হৃদয় কুসুম-কোমল / কার অনাদরে আজি ঝরে যায়।” বসন্ত যেন চারদিকে প্রেম ও সৌন্দর্যের আহ্বান জানালেও একজন নারীর হৃদয়ে তার বিপরীত অভিজ্ঞতা চলছে।
“আহা, আজি এ বসন্তে” ১২৯৫ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে, অর্থাৎ ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত। গানটির রাগ বিলাতি ভাঙা এবং তাল ত্রিতাল। রচনাস্থান হিসেবে কলকাতা ও দার্জিলিং উল্লেখ করা হয়েছে এবং স্বরলিপিকার হিসেবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ইন্দিরা দেবী-র নাম পাওয়া যায়।
গীতবিতানের সূচিতে গানটি ‘গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য’ অংশের ‘মায়ার খেলা’-র অন্তর্ভুক্ত।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্য | বিবরণ |
|---|---|
| গানের নাম | আহা, আজি এ বসন্তে |
| Romanized Title | Aha, Aji E Basante |
| রচয়িতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| সুরকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| গীতিনাট্য | মায়ার খেলা |
| অংশ/দৃশ্য | মায়ার খেলা |
| মূল উপজীব্য | বসন্তের আনন্দের বিপরীতে প্রেমবঞ্চিত নারীর বেদনা |
| রাগ | বিলাতি ভাঙা |
| তাল | ত্রিতাল |
| রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) | অগ্রহায়ণ, ১২৯৫ |
| রচনাকাল (খ্রিস্টাব্দ) | ১৮৮৮ |
| রচনাস্থান | কলকাতা, দার্জিলিং |
| স্বরলিপিকার | জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইন্দিরা দেবী |
| সংকলন | গীতবিতান |
| গীতবিতানের বিভাগ | গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য — মায়ার খেলা |
উপরের রাগ, তাল, রচনাকাল, রচনাস্থান ও স্বরলিপিকার-সংক্রান্ত তথ্য Tagoreweb-এর গান-তথ্যের সঙ্গে মেলে।
বাংলা লিরিক
আহা আজি এই বসন্তে:
আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,
এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়,
সখীর হৃদয় কুসুম-কোমল–
কার অনাদরে আজি ঝরে যায়।
কেন কাছে আস, কেন মিছে হাস,
কাছে যে আসিত সে তো আসিতে না চায়।
সুখে আছে যারা, সুখে থাক্ তারা,
সুখের বসন্ত সুখে হোক সারা,
দুখিনী নারীর নয়নের নীর
সুখী জনে যেন দেখিতে না পায়।
তারা দেখেও দেখে না, তারা বুঝেও বোঝে না,
তারা ফিরেও না চায়।
গানটির পাঠ Tagoreweb এবং অন্যান্য গানসংকলনভিত্তিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
Romanized Lyrics
Aha, Aji E Basante
Aha, aji e basante eto phul phute,
Eto banshi baje, eto pakhi gay,
Sokhir hridoy kusum-komol–
Kar onadore aji jhore jay.
Keno kache as, keno miche has,
Kache je asito se to asite na chay.
Sukhe ache jara, sukhe thak tara,
Sukher bosonto sukhe hok sara,
Dukhini narir noyoner nir
Sukhi jone jeno dekhite na pay.
Tara dekheo dekhe na, tara bujheo bojhe na,
Tara fireo na chay.
গানের মূল ভাব
“আহা, আজি এ বসন্তে” গানটির মূল ভাব গড়ে উঠেছে বসন্তের বাহ্যিক আনন্দ এবং ব্যক্তিমানুষের অন্তর্গত বিষাদের বৈপরীত্যের ওপর।
বসন্ত এসেছে। চারদিকে ফুল ফুটেছে, বাঁশি বাজছে, পাখি গান গাইছে। প্রকৃতি যেন আনন্দের এক পূর্ণ আয়োজন করেছে। কিন্তু এই আনন্দ সবার হৃদয়ে সমানভাবে পৌঁছায় না। একজন নারীর কোমল হৃদয় প্রিয়জনের অনাদরে শুকিয়ে যাচ্ছে।
এখানেই গানটির আবেগগত দ্বন্দ্ব। প্রকৃতির কাছে বসন্ত আনন্দের ঋতু হলেও প্রেমে বঞ্চিত মানুষের কাছে সেই একই বসন্ত হয়ে উঠতে পারে বেদনার স্মারক।
গানের বক্তা তাই সুখী মানুষদের সুখে থাকার জন্য বাধা দেন না। বরং বলেন, যারা সুখে আছে তারা সুখেই থাকুক; তাদের বসন্ত পূর্ণ হোক। কিন্তু সেই সুখী মানুষদের যেন কোনোভাবেই দুঃখিনী নারীর চোখের জল দেখতে না হয়।
এই বক্তব্যের মধ্যে এক ধরনের আত্মসংযমও রয়েছে। নিজের দুঃখের কথা জানানো হলেও বক্তা অন্যের সুখ নষ্ট করতে চান না। ফলে ব্যক্তিগত বেদনা একসময় এক ধরনের নীরব, আত্মমর্যাদাপূর্ণ বিষাদে পরিণত হয়।
চরণ ও স্তবক বিশ্লেষণ
“আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে”
প্রথম চরণেই বসন্তের দৃশ্যমান সৌন্দর্য সামনে আসে। “এত ফুল ফুটে”, “এত বাঁশি বাজে”, “এত পাখি গায়”—পরপর তিনটি চিত্রের মাধ্যমে প্রকৃতির পূর্ণতা তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু এই আনন্দময় সূচনার পরেই গানটি হঠাৎ ব্যক্তিগত বেদনার দিকে মোড় নেয়। ফলে শ্রোতা শুরু থেকেই বুঝতে পারেন যে গানটির বসন্ত কেবল প্রকৃতির বসন্ত নয়; এটি মানুষের হৃদয়ের অবস্থারও একটি প্রতীকী পটভূমি।
“সখীর হৃদয় কুসুম-কোমল / কার অনাদরে আজি ঝরে যায়”
এখানে “কুসুম-কোমল” শব্দবন্ধটি নারীর হৃদয়ের কোমলতা ও সংবেদনশীলতার পরিচয় দেয়। ফুলের সঙ্গে হৃদয়ের তুলনা করার ফলে প্রথম স্তবকের বসন্ত-চিত্রের সঙ্গেও এর একটি অন্তর্নিহিত সম্পর্ক তৈরি হয়।
বাইরে ফুল ফুটছে, অথচ একটি কোমল হৃদয়ের ফুল অনাদরে ঝরে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্যই গানটির অন্যতম প্রধান কাব্যিক শক্তি।
“কেন কাছে আস, কেন মিছে হাস”
এই চরণে প্রত্যাশা ও সংশয়ের মিশ্র অনুভূতি রয়েছে। প্রিয়জনের কাছাকাছি আসা এবং তার হাসি—দুটিই যেন বক্তার কাছে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
“মিছে হাস” কথাটির মধ্যে এমন এক অভিজ্ঞতা আছে, যেখানে বাহ্যিক আচরণ এবং অন্তরের সত্যের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
“কাছে যে আসিত সে তো আসিতে না চায়”
এই চরণ আগের প্রশ্নের উত্তরকে আরও স্পষ্ট করে। যার কাছে আসার কথা, সে-ই আসতে চায় না। ফলে গানটির বেদনার মূল কারণটি ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়—প্রত্যাশিত প্রেমের অনুপস্থিতি।
এখানে কোনো সরাসরি অভিযোগের বিস্তার নেই; বরং অনুপস্থিতির কথাটিই বেদনার প্রধান ভাষা হয়ে উঠেছে।
“সুখে আছে যারা, সুখে থাক্ তারা”
গানটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই চরণ। বক্তা নিজের দুঃখের কারণে অন্যের সুখকে অস্বীকার করছেন না।
বরং তিনি মেনে নিচ্ছেন যে পৃথিবীতে অন্যরা সুখে থাকতে পারে। তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখ অন্যের আনন্দের বিরুদ্ধে কোনো দাবি তৈরি করে না।
এই সংযত মনোভাব গানটির আবেগকে আরও গভীর করে।
“সুখের বসন্ত সুখে হোক সারা”
এখানে বসন্ত শুধু ঋতু নয়, সুখের একটি প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। বক্তা সুখীদের জন্য তাদের সুখের বসন্ত পূর্ণ হওয়ার কামনা করছেন।
কিন্তু এর পরেই আসে “দুখিনী নারীর নয়নের নীর”—যার ফলে সুখ ও দুঃখের দুই বিপরীত জগৎ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যায়।
“দুখিনী নারীর নয়নের নীর / সুখী জনে যেন দেখিতে না পায়”
“নয়নের নীর” বা চোখের জল এখানে ব্যক্তিগত বেদনার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রকাশ।
বক্তা চান না সুখী মানুষ তার চোখের জল দেখুক। এর মধ্যে লজ্জা, আত্মমর্যাদা, সংযম এবং অন্যের সুখের প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি—সবকিছুই একসঙ্গে কাজ করে।
এই অংশটি গানটির আবেগকে কেবল বিরহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; এটি মানুষের অনুভূতি ও আত্মসংযমের একটি সূক্ষ্ম চিত্রও তৈরি করে।
“তারা দেখেও দেখে না, তারা বুঝেও বোঝে না”
শেষাংশে অভিযোগ আরও সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে। সুখী মানুষেরা হয়তো দুঃখের চিহ্ন দেখেও তার গভীরতা উপলব্ধি করে না।
“দেখেও দেখে না” এবং “বুঝেও বোঝে না”—এই পুনরুক্তির মাধ্যমে অনুভূতিহীনতা বা অন্যের অন্তর্দুঃখ উপলব্ধি করতে না পারার বিষয়টি জোরালো হয়েছে।
“তারা ফিরেও না চায়”
শেষ চরণে একটি প্রত্যাখ্যাত বা উপেক্ষিত অনুভূতির স্থায়িত্ব ফুটে ওঠে। অন্যরা ফিরে তাকায় না; বক্তার দুঃখ তাদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে না।
গানটির সমাপ্তি তাই কোনো মিলন বা সমাধানের মাধ্যমে নয়। বরং নীরব বেদনা এবং অন্যের সুখের বাইরে নিজের অবস্থান মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে গানটি শেষ হয়।
গানের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য
গানটির প্রধান কাব্যিক বৈশিষ্ট্য হলো বসন্তের সৌন্দর্য ও মানবিক বেদনার পাশাপাশি অবস্থান।
“ফুল”, “বাঁশি”, “পাখি”—এই তিনটি চিত্র বসন্তের স্বাভাবিক আনন্দকে প্রকাশ করে। এর বিপরীতে “কুসুম-কোমল হৃদয়”, “অনাদর”, “নয়নের নীর”—এসব শব্দ ব্যক্তিগত দুঃখের জগৎ তৈরি করে।
ফুলের সঙ্গে হৃদয়ের তুলনাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। বসন্তে যখন প্রকৃতির ফুল ফুটছে, তখন অনাদরে একটি হৃদয়ের “ফুল” ঝরে যাচ্ছে। ফলে প্রকৃতি ও মানুষের অনুভূতি একই কাব্যিক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত হয়েছে।
গানটিতে বৈপরীত্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বসন্ত বনাম বিষাদ, সুখ বনাম দুঃখ, দেখা বনাম না-দেখা এবং বোঝা বনাম না-বোঝা—এই দ্বৈততার ওপর গানের আবেগ নির্মিত।
শেষের “দেখেও দেখে না, বুঝেও বোঝে না”—ধরনের পুনরুক্তি গানের বক্তব্যকে আরও তীক্ষ্ণ করেছে।
মায়ার খেলা গীতিনাট্যে গানটির অবস্থান
“আহা, আজি এ বসন্তে” রবীন্দ্রনাথের ‘মায়ার খেলা’ গীতিনাট্যের গান। গীতবিতানের সূচিপত্রেও গানটি ‘গীতিমালা’ এবং ‘মায়ার খেলা’-র সঙ্গে চিহ্নিত হয়েছে।
‘মায়ার খেলা’-র নাট্যপরিসরে গানটির অবস্থান বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধু স্বতন্ত্র বসন্তের গান হিসেবে রচিত নয়। নাটকের চরিত্র ও পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে এর বেদনা ও বসন্তচিত্র একটি বৃহত্তর নাট্য-অনুভূতির অংশ হয়ে ওঠে।
উপলব্ধ গীতিনাট্যের পাঠে ‘মায়ার খেলা’-র বিভিন্ন দৃশ্যে শান্তা, প্রমদা, অমরসহ অন্যান্য চরিত্রের মাধ্যমে প্রেম, আকর্ষণ, দ্বিধা ও মায়ার নানা স্তর প্রকাশ পেয়েছে।
রাগ ও তাল
গানটির রাগ বিলাতি ভাঙা এবং তাল ত্রিতাল। এই তথ্য Tagoreweb-এর গান-নথিতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
রাগের নাম ও তালের তথ্য গানটির পরিবেশনাগত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে একই গানের বাণী বোঝার পাশাপাশি তার সুর ও তাল-পরিচয়ও গানটির পূর্ণাঙ্গ সংগীতগত পরিচয় নির্মাণ করে।
তবে কেবল রাগ ও তাল জানা থাকলেই কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশনার সমস্ত সুরগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা যায় না। শিল্পী ও পরিবেশনাভেদে গায়কী, গতি, অলংকার ও আবেগপ্রকাশে পার্থক্য থাকতে পারে।
রচনাকাল ও রচনাস্থান
গানটির রচনাকাল অগ্রহায়ণ ১২৯৫ বঙ্গাব্দ, যা ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। রচনাস্থান হিসেবে কলকাতা ও দার্জিলিং উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সময় রবীন্দ্রনাথের নাট্যগীতি ও গীতিনাট্য-রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব চলছিল। ‘মায়ার খেলা’-র সঙ্গে গানটির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক সেই সময়কার তাঁর সংগীত-নাট্যচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
স্বরলিপিকার
গানটির স্বরলিপিকার হিসেবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ইন্দিরা দেবী-র নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের সংরক্ষণ ও পরিবেশন-ঐতিহ্যে স্বরলিপির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই গানের স্বরলিপিকারদের তথ্য শুধু আনুষঙ্গিক পরিচয় নয়; গানটির সংগীত-ঐতিহ্য বোঝার ক্ষেত্রেও এটি প্রাসঙ্গিক।
গানের উৎস ও সুরের প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথের কিছু গানে ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সুরের প্রভাব বা সুরাশ্রয় দেখা যায়। “আহা, আজি এ বসন্তে” গানটির ক্ষেত্রেও পাশ্চাত্য সুরের উৎস নিয়ে গবেষণামূলক আলোচনা রয়েছে। কিছু সূত্রে গানটির সুরের সঙ্গে আইরিশ গান “Go Where Glory Waits Thee”-এর সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে; অন্য একটি গবেষণামূলক আলোচনায় “Maid of the Valley”-এর সুরের ভিত্তির কথাও উল্লেখ আছে।
এই কারণে উৎসের পার্থক্য বিবেচনা করে বিষয়টিকে সরলভাবে “অমুক গান থেকেই সরাসরি নেওয়া” বলে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন না করাই বেশি সতর্ক পদ্ধতি। তবে রবীন্দ্রনাথের সুরসৃষ্টিতে পাশ্চাত্য সুরের সঙ্গে সংলাপের যে প্রবণতা ছিল, গানটি সেই বৃহত্তর সংগীতচর্চার একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।
বসন্ত ও বিষাদের বৈপরীত্য
গানটির সবচেয়ে স্মরণীয় বৈশিষ্ট্য হলো বসন্তকে নিছক আনন্দের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার না করা।
বসন্ত সাধারণত ফুল, পাখি, গান, নবজাগরণ ও প্রেমের ঋতু। কিন্তু এখানে সেই একই বসন্ত একজন প্রেমবঞ্চিত নারীর কাছে তার একাকিত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
চারপাশে যখন “এত ফুল” ফুটছে, তখন তার হৃদয়ের ফুল ঝরে যাচ্ছে। চারপাশে যখন বাঁশি বাজছে ও পাখি গান গাইছে, তখন তার নিজের জীবনে কাঙ্ক্ষিত মানুষটি কাছে আসতে চাইছে না।
এই বৈপরীত্যের কারণেই গানটির বসন্তচিত্র কেবল প্রকৃতিবর্ণনা হয়ে থাকে না; এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থার প্রতিফলনে পরিণত হয়।
গানের সামগ্রিক তাৎপর্য
“আহা, আজি এ বসন্তে” মূলত এমন এক অনুভূতির গান যেখানে প্রকৃতির আনন্দ এবং ব্যক্তিগত দুঃখ একই সময়ে সত্য হয়ে থাকে।
গানটির বক্তা নিজের দুঃখকে অন্যের সুখের বিরুদ্ধে দাঁড় করান না। বরং সুখীরা সুখে থাকুক—এই মেনে নেওয়ার মধ্যেও তার নিজের বেদনা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বসন্তের সৌন্দর্য এখানে তাই দ্বিমুখী। কারও কাছে এটি আনন্দের, কারও কাছে এটি অনুপস্থিত প্রেমের আরও তীব্র স্মারক।
এই কারণেই গানটি কেবল বসন্তের গান নয়; এটি প্রেম, অনাদর, একাকিত্ব, আত্মসংযম এবং অন্যের সুখের প্রতি নীরব সম্মানের গান হিসেবেও পাঠ করা যায়।
উৎস ও তথ্যসূত্র
- Tagoreweb — “আহা, আজি এ বসন্তে”: গানের পাঠ, রাগ, তাল, রচনাকাল, রচনাস্থান ও স্বরলিপিকার-সংক্রান্ত তথ্য।
- গীতবিতান — গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য / মায়ার খেলা: গানটির ‘মায়ার খেলা’ অংশের সঙ্গে সম্পর্ক ও গীতবিতানে এর অবস্থান।
- Bichitra: Online Tagore Variorum, Jadavpur University: ‘মায়ার খেলা’-র পাণ্ডুলিপি ও পাঠ-সংক্রান্ত গবেষণামূলক উপাদান।
- NLTR — রবীন্দ্র রচনাবলী: ‘মায়ার খেলা’-র মূল পাঠ ও নাট্যপ্রেক্ষিত।
- গানটির পাশ্চাত্য সুরের উৎস নিয়ে আলোচনার জন্য বিভিন্ন গবেষণামূলক উৎসে “Go Where Glory Waits Thee” এবং “Maid of the Valley”-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
