বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক, পৌরাণিক অনুষঙ্গনির্ভর ও নিসর্গভাবনাযুক্ত সৃষ্টি হলো ‘আজি হেরিতেছি আমি’। এই কবিতায় হিমালয় পর্বতমালাকে একজন অচল ও ধ্যানমগ্ন পাঠকের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যিনি সনাতন পুঁথি খুলে পৃথিবীর ইতিহাস ও মহাদেব শিব ও পার্বতীর প্রেমের রহস্য পাঠ করে চলেছেন।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | আজি হেরিতেছি আমি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | উৎসর্গ |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক, পৌরাণিক ও নিসর্গভিত্তিক লিরিক কবিতা (Philosophical, Mythological and Nature-based Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থটি তাঁর কাব্যজীবনের এক মননশীল ও আত্মজিজ্ঞাসামূলক সৃষ্টি। এসময়ের কবিতায় বিশ্বপ্রকৃতির শাশ্বত রূপ, মানবজীবনের অতীত-বর্তমান এবং পৌরাণিক ভাবনার সাথে আধ্যাত্মিক চেতনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। ‘আজি হেরিতেছি আমি’ কবিতায় কবি হিমালয়কে এক মহাপ্রাচীন ও নিরবচ্ছিন্ন পাঠকের আসনে বসিয়েছেন, যুগের পর যুগ পরিবর্তন হলেও যার পড়া শেষ হয় না; আর সেই পাহাড়ের প্রতি শিলার গায়ে লেখা রয়েছে ভবসংসারের প্রেম ও ত্যাগের শাশ্বত গাথা।
আজি হেরিতেছি আমি – সম্পূর্ণ কবিতা
আজি হেরিতেছি আমি, হে হিমাদ্রি, গভীর নির্জনে
পাঠকের মতো তুমি বসে আছ অচল আসনে,
সনাতন পুঁথিখানি তুলিয়া লয়েছ অঙ্ক’পরে।
পাষাণের পত্রগুলি খুলিয়া গিয়াছে থরে থরে,
পড়িতেছ একমনে। ভাঙিল গড়িল কত দেশ,
গেল এল কত যুগ– পড়া তব হইল না শেষ।
আলোকের দৃষ্টিপথে এই-যে সহস্র খোলা পাতা
ইহাতে কি লেখা আছে ভব-ভবানীর প্রেম-গাথা–
নিরাসক্ত নিরাকাঙক্ষ ধ্যানাতীত মহাযোগীশ্বর
কেমনে দিলেন ধরা সুকোমল দুর্বল সুন্দর
বাহুর করুণ আকর্ষণে – কিছু নাহি চাহি যাঁর
তিনি কেন চাহিলেন– ভালোবাসিলেন নির্বিকার–
পরিলেন পরিণয়পাশ। এই-যে প্রেমের লীলা
ইহারই কাহিনী বহে হে শৈল, তোমার যত শিলা।
Romanized Version
Aaji heritechhi ami, he himadri, gobhir nirjone
Pathoker moto tumi bose achho ochol asone,
Shonaton puthikhani tuliya loyechho onko’pore.
Pashaner potroguli khuliya giyache thore thore,
Poritechho ekmone. Bhangilo gorilo koto desh,
Gelo elo koto yug– pora tobo hoilo na shesh.
Aloker drishtipothe ei-je shohostro khola pata
Ihate ki lekha achhe vobo-bhavanir prem-gatha–
Nirasokto nirakankkho dhyanatito mohayogishwor
Kemone dilen dhora sukomol durbol shundor
Bahur koron akarshone – kichhu nahi chahi jar
Tini keno chahilen– bhalobasilen nirbikar–
Porilen porinoypash. Ei-je premer lila
Iharai kahini bohe he shoilo, tomar joto shila.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- হিমালয় as a Reader (নিঃসঙ্গ পাঠক):
“আজি হেরিতেছি আমি, হে হিমাদ্রি, গভীর নির্জনে / পাঠকের মতো তুমি বসে আছ অচল আসনে, / সনাতন পুঁথিখানি তুলিয়া লয়েছ অঙ্ক’পরে।”— হিমালয় পর্বতমালাকে কবি এমন এক অচল ও ধীর পাঠকের রূপে কল্পনা করেছেন, যিনি প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাসে যুগের পর যুগ ধরে পৃথিবীর ইতিহাস ও সৃষ্টির রহস্য পাঠ করে চলেছেন।
- শিব-পার্বতীর প্রেম ও যোগীর সমর্পণ:
“নিরাসক্ত নিরাকাঙক্ষ ধ্যানাতীত মহাযোগীশ্বর / কেমনে দিলেন ধরা সুকোমল দুর্বল সুন্দর / বাহুর করুণ আকর্ষণে…”— ধ্যানাতীত, নিরাসক্ত মহাযোগীশ্বর শিব কীভাবে এক সুকোমল নারীর করুণ আকর্ষণে ধরা দিলেন এবং প্রেমের পরিণয়পাশে বাঁধা পড়লেন—সেই গভীর পৌরাণিক রহস্যই কবিতার মূল দর্শন।
- শিলায় শিলায় প্রেমের কাহিনী:
“এই-যে প্রেমের লীলা / ইহারই কাহিনী বহে হে শৈল, তোমার যত শিলা।”— পৃথিবীর এই পরিবর্তনশীলতা এবং প্রেমের শাশ্বত লীলা হিমালয়ের প্রতিটি পাথরে ও শিলাতেও যেন মূর্ত হয়ে রয়েছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।