একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ । পূজা (৫৩৯) । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । Eki Labonno Purno Pran – Puja (539) – Rabindranath Tagore

বাংলা আধ্যাত্মিক ও ভক্তিমূলক সংগীতের জগতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’ একটি পরম শান্তিময় ও ভাবগম্ভীর সৃষ্টি। এটি গীতবিতানের ‘পূজা’ পর্যায়ের অন্তর্গত ৫৩৯ নম্বর গান। পরমেশ্বরের স্পর্শে ভক্তের অন্তরাত্মা ও পুরো প্রকৃতি কীভাবে স্বর্গীয় লাবণ্য এবং আধ্যাত্মিক বসন্তের সজীবতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, তারই এক অপূর্ব কাব্যিক ও সুরময় নিবেদন এই গানটি।

গানের মূল তথ্য

| গানের নাম | একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ |

| শিল্পী | রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীগণ |

| গীতিকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| সুরকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| পর্যায়/নম্বর | পূজা পর্যায় (৫Myc) |

| রাগ ও তাল | পূর্ণ ষড়জ রাগিণী ও একতাল |

| স্বরলিপিকার | সরলা দেবী |

| রচনার বছর | ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ (১২৯৯ বঙ্গাব্দ) |

গানের পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

এই কালজয়ী গানটি ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে (১২৯৯ বঙ্গাব্দে) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক রচিত হয়। গানটির প্রথম স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন কবির ভাগ্নী সরলা দেবী, যা পরবর্তীতে বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ প্রকাশিত ‘গীতবিতান’ গ্রন্থের পূজা পর্বে সংকলিত হয়। গানটি সৃষ্টির প্রেক্ষাপট মূলত উপনিষদের ব্রহ্মচেতনা এবং গভীর আধ্যাত্মিক ভাবনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বসন্তের আগমনে বাহ্যিক প্রকৃতি যেভাবে জেগে ওঠে, ঠিক তেমনি অন্তরের গভীরে স্রষ্টার আবাহনে মানুষের আত্মিক জাগরণকে এই গানে মেলালেন কবি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনের শান্তিনিকেতন পর্বে এবং জমিদারি পরিদর্শনের সময় পূর্ববঙ্গের শিলাইদহে থাকার দিনগুলোতে এমন বহু গভীর ভাবাত্মক গান রচনা করেছিলেন। এই গানে ‘প্রাণেশ’ অর্থাৎ প্রাণের ঈশ্বরকে সম্বোধন করে হৃদয়ের প্রীতি ও আনন্দকে নিবেদন করা হয়েছে। সাধারণ রবীন্দ্রসংগীতের চেয়েও এই গানের বাণী ও সুরের গভীরতা শ্রোতা ও গায়ককে এক অন্য ধরণের ধ্যানমগ্নতায় নিয়ে যায়।

গানের সঠিক লিরিক ও কথা

একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ লিরিক্স বাংলা সংস্করণ

একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে,

আনন্দবসন্তসমাগমে।

বিকশিত প্রীতিকুসুম হে

পুলকিত চিতকাননে।

জীবনলতা অবনতা তব চরণে।

হরষগীত উচ্ছ্বসিত হে

কিরণমগন গগনে।

Eki Labonno Purno Pran Romanized Version

Eki labonno purno pran, pranesh he,

Anondobosontosomagome.

Bikoshito pritikushum he

Polokito chitokanone.

Jibonlota obonota tobo chorone.

Horoshogito ucchosito he

Kironmogon gogone.

গানের সুর ও ভাবার্থ বিশ্লেষণ

গানটির সুরের মূল ভিত্তি হলো হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের ‘পূর্ণ ষড়জ’ রাগিণী এবং ধ্রুপদ অঙ্গের মিশ্রণ। সুরটিকে ‘একতাল’-এর মাধ্যমে একটি শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত গতিতে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রসংগীতের ধ্রুপদী ধারার গান হওয়ার কারণে এর সুরের চড়াই-উতরাইতে এক ধরণের রাজকীয় গাম্ভীর্য ও আর্তি প্রকাশ পায়, যা মানুষের চিত্তকে খুব সহজে শান্ত ও সমাহিত করে তোলে।

গানের মূল ভাবটি আবর্তিত হয়েছে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করে ভক্তের মনের পরম আনন্দ ও আত্মসমর্পণকে কেন্দ্র করে। ‘আনন্দ বসন্ত সমাগমে’ বলতে কবি এখানে কোনো ঋতুর কথা বলছেন না, বরং মনের ভেতরের আধ্যাত্মিক বসন্তের কথা বলেছেন, যার ছোঁয়ায় মনেরূপ বাগানে (চিতকাননে) ভালোবাসার ফুল ফুটে ওঠে। নিজের জীবনকে একটি লতার সাথে তুলনা করে স্রষ্টার চরণে নুইয়ে দেওয়া এবং চারপাশের আলোয় ভরা আকাশকে ঈশ্বরেরই আনন্দের গান হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে এই ভক্তিমূলক গীতিতে।

এই গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী শব্দচয়ন এবং রাগাশ্রয়ী সুরের গাম্ভীর্য। খুব বেশি বাদ্যযন্ত্রের বাহুল্য ছাড়াই কেবল তানপুরা, এসরাজ কিংবা হালকা হারমোনিয়ামের মৃদু রেশ এই গানের মূল আবেদনকে শতভাগ ফুটিয়ে তুলতে পারে। সুরের মাঝে থাকা ধীরস্থির ভাবটি শ্রোতাকে জাগতিক কোলাহল থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে পরম এক প্রশান্তির অতল গভীরে নিমজ্জিত করে।

উৎস (Sources)

এই নিবন্ধের ঐতিহাসিক ও স্বরলিপি সংক্রান্ত তথ্যসমূহ রবীন্দ্র-রচনাবলী (গীতবিতান, পূজা পর্যায়), বিশ্বভারতী সংগীত বোর্ড প্রকাশিত স্বরলিপি গ্রন্থমালা, রবীন্দ্রগীতি-হৈমন্তী গবেষণাপত্র এবং শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র আর্কাইভের প্রামাণ্য নথিপত্র থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।

 

 

মন্তব্য করুন