কখন বাদল ছোঁওয়া লেগে [ Kokhon Badol Chhoya Lege ] গান – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (প্রকৃতি)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতবিতান’-এর প্রকৃতি পর্যায়ের (বর্ষা উপ-পর্যায়) এক অনুপম সৃষ্টি “কখন বাদল-ছোঁওয়া লেগে”। ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৮ জ্যৈষ্ঠ (১১ জুন ১৯২২) শান্তিনিকেতনে গানটি রচিত হয়। গ্রীষ্মের দাবদাহে তপ্ত ও শুষ্ক ধরণীর বুকে প্রথম বৃষ্টির স্পর্শ লাগার সাথে সাথে যে নবপ্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠে, গানটিতে সেই রোমাঞ্চ ও উচ্ছ্বাস অপূর্ব কাব্যিক চিত্রকল্পে রূপায়িত হয়েছে। দেশ-কেদারা রাগের মিষ্টি পরশ এবং দাদরা তালের দোলায় এটি প্রকৃতি ও মানবপ্রাণের নিবিড় আত্মীয়তার এক অবিস্মরণীয় গান।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
গানের নামকখন বাদল-ছোঁওয়া লেগে
গীতিকার ও সুরকাররবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পর্যায়প্রকৃতি (উপ-পর্যায়: বর্ষা)
রাগদেশ-কেদারা
তালদাদরা
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ)২৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৯
রচনাকাল (খ্রিস্টাব্দ)১১ জুন, ১৯২২
রচনাস্থানশান্তিনিকেতন
স্বরলিপিকারদিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
গ্রন্থ / সংকলনগীতবিতান, স্বরবিতান

কখন   বাদল-ছোঁওয়া লেগে (বাংলা লিরিক)

কখন   বাদল-ছোঁওয়া লেগে

     মাঠে মাঠে ঢাকে মাটি সবুজ মেঘে মেঘে॥

     ওই     ঘাসের ঘনঘোরে

ধরণীতল হল শীতল চিকন আভায় ভ’রে–

ওরা   হঠাৎ-গাওয়া গানের মতো এল প্রাণের বেগে॥

ওরা যে এই প্রাণের রণে মরুজয়ের সেনা,

ওদের সাথে আমার প্রাণের প্রথম যুগের চেনা–

     তাই     এমন গভীর স্বরে

     আমার আঁখি নিল ডাকি ওদের খেলাঘরে–

ওদের   দোল দেখে আজ প্রাণে আমার দোলা ওঠে জেগে॥

Kokhon Badol Chhoya Lege (Romanized )

Kokhon badal-chhowa lege

Math-e mathe dhake mati shobuj megh-e megh-e॥

Oi ghasher ghonoghore

Dharonitol holo shital chikon abhay bh’ore—

Ora hothat-gawa ganer moto el praner bege॥

Ora je ei praner rone morujoyer sena,

Oder sathe amar praner prothom juger chena—

Tai emon gobhir shore

Amar ankhi nil daki oder khelaghore—

Oder dol dekhe aj prane amar dola othe jege॥

গানের মূল ভাব

“কখন বাদল-ছোঁওয়া লেগে” গানটির মূল নির্যাস হলো প্রকৃতির রূপান্তর ও প্রাণের অপ্রতিরোধ্য বিজয়। বর্ষার প্রথম বৃষ্টিভেজা মাটির বুক চিরে যখন কচি ঘাস জেগে ওঠে, রবীন্দ্রনাথ তাকে শুধু ঘাস হিসেবে দেখেন না; তিনি সেটিকে দেখেন পৃথিবীর ‘মরুবিজয়ী সেনা’ হিসেবে। গ্রীষ্মের রুক্ষতা ও শূন্যতাকে জয় করে জীবনের যে সবুজ বিস্তার ঘটে, তা কবিহৃদয়ে এক আদিম স্মৃতির সঞ্চার করে। পৃথিবীর প্রথম সৃষ্টির প্রভাতে প্রাণের যে প্রথম আবির্ভাব ঘটেছিল, এই সবুজ ঘাসের মাঝে কবি সেই আদিম আত্মীয়তাকে প্রত্যক্ষ করেন এবং প্রকৃতির সেই দোলায় নিজের অন্তরাত্মার স্পন্দন অনুভব করেন।

চরণ ও স্তবক বিশ্লেষণ

১. মেঘের স্পর্শে সবুজ বিপ্লব

  • “কখন বাদল-ছোঁওয়া লেগে / মাঠে মাঠে ঢাকে মাটি সবুজ মেঘে মেঘে॥”
    আকাশের কালো মেঘ যখন বৃষ্টির রূপ নিয়ে মাটিতে নামে, মাটি তখন সেই আশীর্বাদ গ্রহণ করে কচি ঘাসের চাদরে ঢেকে যায়। মাটিজুড়ে বিস্তৃত এই ঘন ঘাসকে কবি চমৎকার এক উপমায় ‘সবুজ মেঘ’ বলে অভিহিত করেছেন।

২. মরুজয়ের সেনা ও আদিম পরিচয়

  • “ওরা যে এই প্রাণের রণে মরুজয়ের সেনা / ওদের সাথে আমার প্রাণের প্রথম যুগের চেনা–“
    শুকনো ও রিক্ত পৃথিবীকে কবি তুলনা করেছেন এক যুদ্ধক্ষেত্রের সাথে, যেখানে শুষ্কতা বা মরুভূমি হলো প্রাণের শত্রু। আর বর্ষার পর জেগে ওঠা ঘাসগুলো হলো সেই মরুকে পরাজিত করার সাহসী সৈন্যদল। জীবজগতের বিবর্তনের শুরুতে উদ্ভিদের যে প্রথম জন্ম হয়েছিল, মানুষের প্রাণও যেন সেই প্রাচীন আদিম যুগ থেকেই এই সবুজের সাথে এক গভীর বন্ধনে আবদ্ধ।

৩. অন্তরের সংযোগ ও প্রাণের দোলা

  • “ওদের দোল দেখে আজ প্রাণে আমার দোলা ওঠে জেগে॥”
    বাতাসে ঘাসের ডগার আন্দোলন বা দোল শুধু প্রকৃতির দৃশ্য নয়, তা কবির নিজস্ব অনুভূতির ভেতরেও এক অদৃশ্য তরঙ্গ তৈরি করে। বাহ্যিক প্রকৃতি ও মানবচেতনা এখানে একাকার হয়ে প্রাণের সার্বজনীন নৃত্যে রূপ নেয়।

গানের সাহিত্যিক ও সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

  • চিত্রকল্প ও রূপক: ‘সবুজ মেঘ’ এবং ‘মরুজয়ের সেনা’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে দৃশ্যমান প্রকৃতির মাঝে লড়াই ও বিজয়ের এক গতিশীল চিত্রকল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
  • রাগ দেশ-কেদারা: গানটিতে বর্ষার গভীরতা ও মেঘমেদুর আবহ তৈরি করতে ‘দেশ’ ও ‘কেদারা’ রাগের সুষম মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। দেশ রাগের সজল কোমলতা এবং কেদারা রাগের ভাবগম্ভীর বিস্তার গানের সুরকে অনন্য মাধুর্য দিয়েছে।
  • দাদরা তালের ছন্দ: ৩/৩ মাত্রার প্রবহমান দাদরা তালের ছন্দে ঘাসের ডগায় বাতাসের দোল খাওয়ার ভঙ্গিটি সুরে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. গীতবিতান (প্রকৃতি পর্যায় – বর্ষা), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী প্রকাশন বিভাগ।
  2. স্বরবিতান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর), বিশ্বভারতী প্রকাশন।
  3. Tagoreweb Digital Archive, প্রামাণ্য রবীন্দ্রসংগীত তথ্যভাণ্ডার।

মন্তব্য করুন