রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ কড়ি ও কোমল বাংলা কবিতায় কল্পনা ও রূপকের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এই কাব্যগ্রন্থে কবি কখনো শিশুসুলভ কোমলতায়, কখনো পৌরাণিক বিস্তারে, আবার কখনো গভীর দার্শনিক ইঙ্গিতে প্রকৃতি ও সময়কে রূপ দিয়েছেন। কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “রাʼত্রি” কবিতাটি তার এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত—যেখানে রাত্রিকে তিনি কেবল সময়ের এক পর্ব হিসেবে নয়, বরং এক পৌরাণিক নাগিনীর রূপে কল্পনা করেছেন। এই কবিতায় নিদ্রা, জাগরণ ও মহাবিশ্বের ছন্দ এক অলৌকিক কাব্যভাষায় মিলিত হয়েছে।
Table of Contents
রাত্রি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জগতেরে জড়াইয়া শত পাকে যামিনীনাগিনী
আকাশ-পাতাল জুড়ি ছিল পড়ে নিদ্রায় মগনা,
আপনার হিম দেহে আপনি বিলীনা একাকিনী।
মিটি মিটি তারকায় জলে তার অন্ধকার ফণা।
উষা আসি মন্ত্র পড়ি বাজাইল ললিত রাগিণী।
রাঙা আঁখি পাকালিয়া সাপিনী উঠিল তাই জাগি–
একে একে খুলে পাক, আঁকি বাঁকি কোথা যায় ভাগি।
পশ্চিমসাগরতলে আছে বুঝি বিরাট গহ্বর,
সেথায় ঘুমাবে বলে ডুবিতেছে বাসুকি-ভগিনী
মাথায় বহিয়া তার শত লক্ষ রতনের কণা।
শিয়রেতে সারা দিন জেগে রবে বিপুল সাগর–
নিভৃতে স্তিমিত দীপে চুপি চুপি কহিয়া কাহিনী
মিলি কত নাগবালা স্বপ্নমালা করিবে রচনা।
রাত্রির রূপকল্প : যামিনীনাগিনী
এই কবিতায় রাত্রি হয়ে উঠেছে “যামিনীনাগিনী”—যে শত পাকে জড়িয়ে আকাশ ও পাতালকে আবৃত করে নিদ্রায় মগ্ন। কবির কল্পনায় রাত্রি কোনো নিস্তেজ অন্ধকার নয়; সে এক জীবন্ত সত্তা, নিজের শীতল দেহে নিজেই বিলীন, একাকিনী ও গভীর। মিটি মিটি তারকার আলোকে তার অন্ধকার ফণা জ্বলজ্বল করে—এ যেন নিদ্রার মধ্যেও এক গোপন জাগরণ।
এই রূপকল্পে রাত্রির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পৌরাণিক আবহ। “বাসুকি-ভগিনী” শব্দে নাগলোকের ইঙ্গিত এসে যায়, যা রাত্রিকে মহাজাগতিক শক্তির প্রতীক করে তোলে।
উষার আগমন ও জাগরণের মুহূর্ত
যখন উষা এসে “মন্ত্র পড়ে ললিত রাগিণী” বাজায়, তখন রাত্রির নিদ্রাভঙ্গ ঘটে। নাগিনী জেগে উঠে তার পাক খুলতে থাকে—একটি একটি করে। এই দৃশ্য আসলে রাতের অবসান ও দিনের আগমনের কাব্যিক চিত্র। অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে গিয়ে আলোর পথে পলায়ন করে।
রাত্রি যেন পশ্চিম সাগরের গভীর গহ্বরে ডুবে যেতে চায়—যেখানে সে আবার ঘুমাবে। এই বিদায় মুহূর্তে আকাশে ও সমুদ্রে এক বিষণ্ন সৌন্দর্যের আবেশ তৈরি হয়।
নিদ্রা, স্বপ্ন ও নীরব সাগর
কবিতার শেষাংশে রাত্রির শিয়রে জেগে থাকে “বিপুল সাগর”—দিনভর যে সজাগ, কিন্তু রাত্রিতে নীরব দীপের আলোয় গল্প বলে। সেই নীরবতায় জন্ম নেয় “নাগবালা স্বপ্নমালা”—অর্থাৎ অসংখ্য স্বপ্ন, কল্পনা ও অবচেতন ভাবনার জাল।
এখানে রাত্রি কেবল অন্ধকার নয়; সে স্বপ্নের নির্মাতা, কাহিনির রচয়িতা। মানুষের অবচেতন মন, স্বপ্ন ও কল্পনার সঙ্গে রাত্রির গভীর সম্পর্ক এই কবিতায় অনন্যভাবে ফুটে উঠেছে।
“রাʼত্রি” কবিতাটি কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের এক অনুপম রূপককবিতা। এতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৌরাণিক কল্পনা, প্রকৃতি ও সময়কে একসূত্রে গেঁথে রাত্রিকে দিয়েছেন জীবন্ত, রহস্যময় ও মহাজাগতিক রূপ। এই কবিতা আমাদের শেখায়—রাত্রি শুধু দিনের অনুপস্থিতি নয়; সে নিজস্ব সৌন্দর্য, নিদ্রা ও স্বপ্নের এক গভীর সাম্রাজ্য।
![কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের রাত্রি কবিতা | Ratri Kobita 1 রাত্রি ratri [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/রাত্রি-ratri-কবিতা-1-1.gif)