বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক কবিতা হলো ‘একই পথ’। মাত্র দুই চরণের এই ক্ষুদ্র কবিতায় কবি ভুল বা অন্ধবিশ্বাসকে (ভ্রম) আটকাতে গিয়ে মানুষের সত্যকে দূরে ঠেলে দেওয়ার এক শাশ্বত দ্বন্দ্ব অত্যন্ত চমৎকার রূপকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। ভুলকে ঠেকাতে গিয়ে সত্যের প্রবেশপথও যে বন্ধ হয়ে যায়, সেই জীবনসত্য এখানে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | একই পথ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | কণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৯ |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও নীতিশিক্ষামূলক কবিতা (Philosophical and Didactic Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গভীর জীবনদর্শন। ‘একই পথ’ কবিতায় কবি মানবমনের এক রক্ষণশীল প্রবণতাকে কটাক্ষ করেছেন। মানুষ অনেক সময় ভুল বা মিথ্যার আশঙ্কায় নিজের মন বা বিচারবুদ্ধির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু কবি মনে করিয়ে দেন যে, যে পথ দিয়ে ভুল বা ভ্রম আসে, ঠিক সেই একই পথ দিয়েই তো সত্যেরও যাতায়াত। সুতরাং সত্যকে গ্রহণ করতে হলে বিচার ও ভুলত্রুটির ঝুঁকি নেওয়ার সাহস থাকতে হবে।
একই পথ – সম্পূর্ণ কবিতা
দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি।
সত্য বলে, আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?
একই পথ Romanized Version
Dwar bondho kore diye bhromtare rukhi.
Sotyo bole, ami tobe kotha diye dhuki?
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- রূপক ও তাৎপর্য: কবিতায় ‘ভ্রম’ বা ভুল ধারণা এবং ‘সত্য’ উভয়ই একই গতির বা পথের প্রতীক।
- ভ্রমকে রোধ করার চেষ্টা: মানুষ যখন নানা আশঙ্কা বা কুসংস্কারে জর্জরিত হয়ে নিজের মন বা চেতনার দরজা বন্ধ করে দেয়, তখন সে ভাবে যে সে বুঝি সব ভুল বা ভ্রম থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারল।
- সত্যের মৌলিক প্রশ্ন: কিন্তু সত্য এসে তখন এক মোক্ষম প্রশ্ন তোলে। সত্য ও ভ্রমের প্রবেশদ্বার তো আলাদা নয়; মনের দুয়ার পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে সত্য নিজেই বা প্রবেশ করবে কোথায়?
- “সত্য বলে, আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?”— এই চরণের মাধ্যমে কবি এক পরম দার্শনিক শিক্ষা দিয়েছেন। ভুল বা ত্রুটির মধ্য দিয়েই মানুষ অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং সত্যে পৌঁছায়। সবকিছু অন্ধভাবে বর্জন করতে গেলে বা বিচারবুদ্ধির দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিলে সত্যের আলোও মানুষের অন্তরে প্রবেশ করতে পারে না।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।