কণিকা কাব্যগ্রন্থের নতিস্বীকার কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । কণিকা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত বিনম্র, মার্জিত ও তাৎপর্যপূর্ণ কবিতা হলো ‘নতিস্বীকার’। মাত্র চার চরণের এই কবিতায় কবি নবীন ও প্রবীণের পারস্পরিক স্বীকৃতি, অহংকারহীন আত্মসমর্পণ এবং মহত্ত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের এক অপূর্ব রূপক তুলে ধরেছেন। উদিত সূর্যের সামনে প্রভাতের চাঁদের আপন মহিমা ম্লান হওয়া সত্ত্বেও তাকে সসম্মানে প্রণাম জানিয়ে বিদায় নেওয়ার এই চিত্রটি জীবনবোধের এক গভীর শিক্ষা দেয়।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামনতিস্বীকার
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকণিকা
প্রকাশের বছর১৮৯৯
কবিতার ধরনরূপক ও নীতিশিক্ষামূলক কবিতা (Allegorical and Didactic Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গভীর জীবনদর্শন। ‘নতিস্বীকার’ কবিতায় কবি প্রকৃতির দুই ভিন্ন সময়ের রূপ—সূর্য এবং চাঁদের—মাধ্যমে মানবজীবনের এক শাশ্বত সত্যকে প্রকাশ করেছেন। নতুন বা উদীয়মান শক্তির আগমন ঘটলে পুরাতন বা নিজস্ব দীপ্তির যে অবসান ঘটে, তা জেনেই কোনো হীনম্মন্যতা বা ক্ষোভ ছাড়াই সেই নতুনকে সম্মান জানানোটাই প্রকৃত মহত্ত্ব। প্রভাতের চাঁদের শান্ত মুখের মধ্য দিয়ে কবি এই উদার মানসিকতার কথাই ফুটিয়ে তুলেছেন।

নতিস্বীকার – সম্পূর্ণ কবিতা

তপন-উদয়ে হবে মহিমার ক্ষয়
তবু প্রভাতের চাঁদ শান্তমুখে কয়,
অপেক্ষা করিয়া আছি অস্তসিন্ধুতীরে
প্রণাম করিয়া যাব উদিত রবিরে।

নতিস্বীকার Romanized Version

Tapon-udoye hobe mohimar khoy
Tobu probhater chad shantomukhe koy,
Opekkha koriya achi ostoshindhutire
Pronam koriya jabo udito robire.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • রূপক ও প্রাকৃতিক প্রতীক: কবিতায় ‘তপন’ বা উদিত সূর্য হলো নতুন শক্তির, তারুণ্যের ও প্রবল আলোর প্রতীক। অন্যদিকে ‘প্রভাতের চাঁদ’ হলো বিদায়ী প্রবীণ, ম্লান দীপ্তি বা বিগতকালের প্রতীকের প্রতীক।
  • অহংকারহীন বাস্তবতা: নতুন সূর্যের উদয় হলে আকাশের চাঁদ যে ফিকে হয়ে যায় এবং তার নিজস্ব রাতজাগা মহিমা বা সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন হয়, তা চাঁদ খুব ভালোভাবেই জানে। কিন্তু এতে তার মধ্যে কোনো অহংকার, হিংসা বা হীনম্মন্যতা কাজ করে না।
  • মহত্ত্ব ও বিনম্র অভিবাদন: চাঁদ কোনো আক্ষেপ না করে অত্যন্ত শান্তমুখে অপেক্ষা করে থাকে। সে নিজের মহিমা ক্ষুণ্ন হওয়ার কথা জেনেই অস্তসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে নতুন সূর্যকে সসম্মান প্রণাম জানিয়ে তবেই বিদায় নিতে চায়। এটি পুরনো শক্তির পক্ষ থেকে নতুন শক্তির প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা ও নতি স্বীকারের প্রতীক।
  • “প্রণাম করিয়া যাব উদিত রবিরে।”
    — এই চরণের মাধ্যমে কবি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, পরিবর্তনই প্রকৃতির নিয়ম। সময়ের ধারায় পুরনোকে পথ ছেড়ে দিতে হয় নতুনের জন্য। আর এই পরিবর্তনকে বা নতুন শক্তিকে হিংসা না করে বরং তাকে সম্মান জানাতে পারাই হলো প্রকৃত মহত্ত্ব ও বিনয়ের চরম নিদর্শন।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন