বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর সমাজসচেতন ও রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘পর-বিচারে গৃহভেদ’। মাত্র চার চরণের এই কবিতায় কবি মানুষের কৃত্রিম বিচারবুদ্ধি, পছন্দ এবং তার কারণে সমাজে ও প্রকৃতিতে তৈরি হওয়া ভেদাভেদের কথা অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। বনের আদি সাম্য ও মানুষের সৃষ্টি করা বৈষম্যের এই রূপকটি মানবসমাজের শ্রেণিবিন্যাস ও সংকীর্ণতাকে খুব সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | পর-বিচারে গৃহভেদ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | কণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৯ |
| কবিতার ধরন | রূপক ও সমাজসচেতনতামূলক কবিতা (Allegorical and Societal Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গভীর জীবনদর্শন ও সমাজবাস্তবতা। ‘পর-বিচারে গৃহভেদ’ কবিতায় কবি আমগাছ এবং মাকাল ফলের উদাহরণ দিয়ে মানবসমাজের এক চিরন্তন প্রবণতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রকৃতিতে সবকিছুই সমানভাবে এবং আপন স্বকীয়তায় সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু মানুষ নিজের বিচারবুদ্ধি, রুচি এবং লাভের হিসেব দিয়ে তাদের মধ্যে ভালো-মন্দ বা উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ তৈরি করেছে।
পর-বিচারে গৃহভেদ – সম্পূর্ণ কবিতা
আম্র কহে, এক দিন, হে মাকাল ভাই,
আছিনু বনের মধ্যে সমান সবাই–
মানুষ লইয়া এল আপনার রুচি,
মূল্যভেদ শুরু হল, সাম্য গেল ঘুচি।
পর-বিচারে গৃহভেদ Romanized Version
Amro kohe, ek din, he makal bhai,
Achhinu boner modhye shoman shobai–
Manush loiya elo apnar ruchi,
Mulyobhed shuru holo, shamyo gelo ghuchi.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- প্রকৃতির সাম্য ও সমতা: কবিতার শুরুতে আম গাছ মাকাল ফলকে উদ্দেশ করে বলছে যে একসময়ে তারা বনের মধ্যে সম্পূর্ণ সমান ছিল। প্রকৃতির দৃষ্টিতে বা সৃষ্টির আদি পর্যায়ে কোনো ভেদাভেদ বা বৈষম্য ছিল না; সবাই স্বাধীন ও সমান মর্যাদায় প্রকৃতির কোলে টিকে ছিল।
- মানুষের হস্তক্ষেপ ও রুচির বৈচিত্র্য: মানুষ যখন বনে প্রবেশ করল, তখন সে নিজের পছন্দ, রুচি এবং প্রয়োজনের মাপকাঠিতে সবকিছু বিচার করতে শুরু করল। মানুষ নিজের স্বার্থ বা সৌন্দর্যের ধারণার ওপর ভিত্তি করে বস্তুর বা উদ্ভিদের ভালো-মন্দের হিসাব কষল।
- মূল্যভেদ ও সাম্যের পতন: মানুষের এই বিচারবুদ্ধির ফলে সমাজে বা প্রকৃতির মাঝে ভেদাভেদ শুরু হলো। একটিকে ভালো বা দামি এবং অন্যটিকে খারাপ বা অবহেলিত হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। এর ফলে আদি প্রকৃতির যে ‘সাম্য’ বা সমতার সৌন্দর্য ছিল, তা চিরতরে মুছে গেল।
- “মূল্যভেদ শুরু হল, সাম্য গেল ঘুচি।”— এই চরণের মাধ্যমে কবি মানবসমাজের কৃত্রিম বৈষম্যকে তীব্রভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। মানুষ নিজের সংকীর্ণ বিচারবুদ্ধি দিয়ে প্রকৃতির সহজ সমান অবস্থাকে নষ্ট করে ভেদাভেদ ও শ্রেণিবিভাগ তৈরি করে, যা মূলত সাম্যের বিনাশ ঘটায়।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।