কণিকা কাব্যগ্রন্থের প্রশ্নের অতীত কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । কণিকা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর দার্শনিক ও রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘প্রশ্নের অতীত’। মাত্র চার চরণের এই কবিতায় কবি প্রকৃতির দুই বিশাল সত্তা—সমুদ্র ও পর্বতের মাধ্যমে মানবজীবনের চিরন্তন জিজ্ঞাসা ও অনন্ত স্তব্ধতার এক অপূর্ব বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। সমুদ্রের গর্জন ও হিমালয়ের নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা শাশ্বত রহস্যের উন্মোচন ঘটেছে এই ক্ষুদ্রায়তনের কবিতায়।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামপ্রশ্নের অতীত
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকণিকা
প্রকাশের বছর১৮৯৯
কবিতার ধরনদার্শনিক ও রূপক কবিতা (Philosophical and Allegorical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজীবনের এক অনন্য সংযোজন। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো ক্ষুদ্র অবয়বের হলেও এদের অন্তর্নিহিত ভাব অত্যন্ত বিশাল ও শাশ্বত। ‘প্রশ্নের অতীত’ কবিতায় কবি প্রকৃতির দুই চরম শক্তির—সমুদ্রের অস্থিরতা এবং পর্বতের অটল স্থিরতার—মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। মানবমনের চিরন্তন কৌতূহল এবং সৃষ্টির কিছু অমীমাংসিত রহস্যের প্রতি ইঙ্গিত করতেই কবি এই প্রাকৃতিক পটভূমি নির্বাচন করেছেন।

প্রশ্নের অতীত – সম্পূর্ণ কবিতা

হে সমুদ্র, চিরকাল কী তোমার ভাষা
সমুদ্র কহিল, মোর অনন্ত জিজ্ঞাসা।
কিসের স্তব্ধতা তব ওগো গিরিবর?
হিমাদ্রি কহিল, মোর চির-নিরুত্তর।

প্রশ্নের অতীত Romanized Version

He shomudro, chirokal ki tomar bhasha
Shomudro kohilo, mor ononto jiggasha.
Kisher stobdhota tobo ogo giribor?
Himadri kohilo, mor chiro-niruttor.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • প্রকৃতির রূপক ও বৈপরীত্য: কবিতায় সমুদ্র ও পর্বত (হিমাদ্রি) মানব অস্তিত্বের ও মহাবিশ্বের দুটি ভিন্ন দিকের প্রতীক। সমুদ্রের অবিরাম গর্জন ও ঢেউ যেন মানুষের মনের অনন্ত কৌতূহল ও জানার ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে, পর্বতের বিশাল স্থিরতা ও নীরবতা প্রকাশ করে সেইসব শাশ্বত সত্যকে, যা ব্যাখ্যার অতীত।
  • সমুদ্রের অনন্ত জিজ্ঞাসা: কবি যখন সমুদ্রকে তার চিরকালীন ভাষার কথা জিজ্ঞেস করেন, সমুদ্র উত্তর দেয় যে তার ভাষা হলো ‘অনন্ত জিজ্ঞাসা’। অর্থাৎ, সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ ও প্রকৃতি যে অসীম রহস্যের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে, সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ যেন সেই চিরন্তন প্রশ্নেরই অবিরাম প্রতিধ্বনি।
  • হিমালয়ের চির-নিরুত্তর স্তব্ধতা: কবি যখন গিরিবর বা পর্বতকে তার স্তব্ধতার কারণ জিজ্ঞেস করেন, হিমাদ্রি জানায় সে ‘চির-নিরুত্তর’। মহাবিশ্বের এমন কিছু গূঢ় সত্য ও রহস্য রয়েছে যার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই, তা কেবল নীরব অনুভবের বিষয়। পর্বতের এই স্তব্ধতাই হলো সেই প্রশ্নের অতীত চূড়ান্ত সত্যের প্রতীক।
  • “হিমাদ্রি কহিল, মোর চির-নিরুত্তর।”
    — এই চরণের মাধ্যমে কবি বুঝিয়েছেন, জীবনের সকল জিজ্ঞাসার উত্তর হয়তো মেলে না বা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কিছু জিজ্ঞাসা যেমন অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে, তেমনি কিছু সত্যও চিরকাল ভাষাতীত বা নিরুত্তর থেকে যায়।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন