কণিকা কাব্যগ্রন্থের মৃত্যু কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম ক্ষুদ্র, গভীর ও দার্শনিক ভাবসমৃদ্ধ কবিতা হলো ‘মৃত্যু’। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি মৃত্যুকে কোনো ভয়ংকর শূন্যতা বা ধ্বংস হিসেবে না দেখে, তাকে সৃষ্টির পূর্ণতা এবং এক পরম শান্তির আশ্রয় হিসেবে অত্যন্ত সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামমৃত্যু
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকণিকা
প্রকাশের বছর১৮৯৯ (১৩৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক ও নীতিমূলক ক্ষুদ্র কবিতা (Epigrammatic and Philosophical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক বিশেষ ধারার সৃষ্টি, যেখানে মূলত ছোট ছোট পঙ্‌ক্তির মাধ্যমে জীবনের গভীর সত্য, দর্শন ও নৈতিক শিক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। ‘মৃত্যু’ কবিতায় কবি প্রচলিত মৃত্যুভীতিকে এক অনন্য দার্শনিক দৃষ্টিতে খণ্ডন করেছেন। মানুষের সাধারণ ধারণায় মৃত্যু হলো সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার বা মহাশূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার নাম। কিন্তু কবি দেখিয়েছেন যে মৃত্যু যদি কেবলই শূন্যতা হতো, তবে এই সৃষ্টি জগতের অস্তিত্ব এক মুহূর্তের জন্যও রক্ষা পেত না। মৃত্যু আসলে কোনো শূন্যতা নয়, বরং তা এক পরিপূর্ণ রূপ যার কোলে এই জগৎ চিরকাল সুরক্ষিত।

মৃত্যু – সম্পূর্ণ কবিতা

ওগো মৃত্যু, তুমি যদি হতে শূন্যময়
মুহূর্তে নিখিল তবে হয়ে যেত লয়।
তুমি পরিপূর্ণ রূপ, তব বক্ষে কোলে
জগৎ শিশুর মতো নিত্যকাল দোলে।

মৃত্যু Romanized Version

Ogo mrittu, tumi jodi hote shunnyomoy
Muhurte nikhil tobe hoye jeto loy.
Tumi poripunno rup, tobo bokshe kole
Jogot shishur moto nittokal dole.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • মৃত্যু কোনো শূন্যতা বা লয় নয়:
“ওগো মৃত্যু, তুমি যদি হতে শূন্যময় / মুহূর্তে নিখিল তবে হয়ে যেত লয়।”
— সাধারণ মানুষ মৃত্যুকে শূন্যতা ও বিনাশ বলে ভয় পায়। কিন্তু কবি বলছেন, মৃত্যু যদি সত্যিই শূন্য বা অস্তিত্বহীনতা হতো, তবে এই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেত।
  • মৃত্যুর মাতৃরূপ ও পরম শান্তি:
“তুমি পরিপূর্ণ রূপ, তব বক্ষে কোলে / জগৎ শিশুর মতো নিত্যকাল দোলে।”
— মৃত্যু কোনো ভয়ঙ্কর অপশক্তি নয়; বরং তা এক পরিপূর্ণ রূপ। মায়ের কোল যেমন শিশুকে নিরাপদে আগলে রাখে, তেমনি মৃত্যুর বক্ষেই এই সমগ্র জগৎ বা সৃষ্টি চিরকালের মতো শান্তিতে দোল খায়। এটি জীবন ও মৃত্যুর এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক মেলবন্ধন।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন