কণিকা কাব্যগ্রন্থের শক্তির শক্তি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষণীয় ও নীতিগর্ভ ক্ষুদ্র কবিতার সংকলন ‘কণিকা’-র একটি চমৎকার রূপকপ্রধান, আত্মানুসন্ধানী ও দার্শনিক চার চরণের কবিতা হলো ‘শক্তির শক্তি’। মানুষের ক্ষমতার অহংকার যে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং এক বৃহত্তর শক্তির প্রসাদের ওপর নির্ভরশীল—দিনের আলো ও চোখের দৃষ্টিশক্তির রূপকে এ কবিতায় তা সংক্ষেপে অথচ তীব্রভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামশক্তির শক্তি (বা শক্তির-শক্তি)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকণিকা
প্রকাশের বছর১৮৯৯ (১৩০৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরূপকধর্মী নীতি-কবিতা / নীতিগর্ভ চতুর্দশী রূপকল্প (Epigrammatic Philosophical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ দুই থেকে চার চরণের সংহত রূপকল্পে গভীর জীবনদর্শন ও নীতিশিক্ষা প্রকাশ করেছেন। মানুষ অনুকূল পরিবেশে যখন সাফল্য লাভ করে, তখন সে ভ্রান্ত অহমিকায় নিজের ব্যক্তিগত সামর্থ্যকেই একমাত্র কারণ মনে করে। কিন্তু প্রতিকূল সময় উপস্থিত হলেই তার সেই মিথ্যা দম্ভ চূর্ণ হয়ে যায়। চোখের নিজস্ব ক্ষমতা যতই থাকুক না কেন, আলোর উপস্থিতি ছাড়া সে সম্পূর্ণ অন্ধ। সৃষ্টির অন্তরালে যে পরমসত্তা বা প্রকৃতির অপার অবদান রয়েছে, তার কৃপাদৃষ্টিতেই আমাদের ক্ষুদ্র শক্তির বিকাশ—এই চরম সত্যটিই কবিতার মূল কথা।

সম্পূর্ণ কবিতা:

দিবসে চক্ষুর দম্ভ দৃষ্টিশক্তি লয়ে,

রাত্রি যেই হল সেই অশ্রু যায় বয়ে!

আলোরে কহিল–আজ বুঝিয়াছি ঠেকি

তোমারি প্রসাদবলে তোমারেই দেখি।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Diboshe chokkhur dombho drishtishokti loye,
Ratri jei holo shei oshru jay boye!
Alore kohilo– aj bujhiyachhi theki
Tomari proshadbole tomarei dekhi.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • মিথ্যা অহংকার ও চরম অসহায়তা:
    “দিবসে চক্ষুর দম্ভ দৃষ্টিশক্তি লয়ে, / রাত্রি যেই হল সেই অশ্রু যায় বয়ে!”
    — দিনের বেলায় চোখ দম্ভভরে ভাবে যে সবকিছু সে নিজের ক্ষমতায় দেখছে। কিন্তু সূর্য অস্ত গেলে রাতের অন্ধকারে তার দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে এবং দম্ভের বদলে কেবল অসহায় অশ্রু ঝরে।
  • ঠেকার শিক্ষা ও পরম উপলব্ধি:
    “আলোরে কহিল– আজ বুঝিয়াছি ঠেকি / তোমারি প্রসাদবলে তোমারেই দেখি।”
    — সংকটে না পড়লে মানুষের ভ্রম ভাঙে না। অন্ধকার যখন চোখকে অন্ধ করে দেয়, তখনই সে উপলব্ধি করে যে দেখার ক্ষমতাটি আসলে আলোরই দান। আলো দয়া করে ফুটে ওঠে বলেই চোখ দেখতে পায়, এমনকি সেই আলোকেও দেখার জন্য আলোর অনুগ্রহ প্রয়োজন। একইভাবে, মানবসত্তার যা-কিছু শক্তি ও সামর্থ্য, তা সবই বিশ্বনিয়ন্তার করুণার দান—এই আত্মোপলব্ধিতেই অহংকার দূর হয়ে বিনয়ের জন্ম হয়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন