কল্পনা কাব্যগ্রন্থের ভারতলক্ষ্মী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম দেশাত্মবোধক, বন্দনাগীত ও মহিমান্বিত কবিতা হলো ‘ভারতলক্ষ্মী’। ১৯০০ সালে (বঙ্গাব্দ ১৩০৭) রচিত এবং পরবর্তী সময়ে সংকলিত এই কবিতায় কবি ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, জ্ঞান-ধর্মের প্রসার এবং বিশ্বজনীন মাতৃত্বের রূপ অত্যন্ত সুরময় ছন্দে ফুটিয়ে তুলেছেন।
(নোট: ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থটি মূলত ১৩০৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯০০ সালে প্রকাশিত হয়)

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামভারতলক্ষ্মী
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকল্পনা
প্রকাশের বছর১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদেশাত্মবোধক ও বন্দনাগীত লিরিক কবিতা (Patriotic and Hymnal Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থটি ঐতিহাসিক স্মৃতি, কল্পনা এবং দেশপ্রেমের এক অপূর্ব সমন্বয়। ‘ভারতলক্ষ্মী’ কবিতায় ভারতকে কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড হিসেবে দেখা হয়নি, বরং তাকে সমগ্র পৃথিবীর ‘জনকজননী-জননী’ বা বিশ্বমাতা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। ভারতের দক্ষিণ চরণে নীল সমুদ্রের জল, কপালে তুষারমুকুট হিমাচল এবং তপোবনে প্রথম জ্ঞান-ধর্ম ও কাব্যের উন্মেষ—এই সমস্তকিছুর মধ্য দিয়ে ভারতের শাশ্বত ও গৌরবময় রূপ এখানে প্রকাশিত হয়েছে।

ভারতলক্ষ্মী – সম্পূর্ণ কবিতা

ভৈরবী
অয়ি ভুবনমনমোহিনী,
অয়ি নির্মলসূর্যকরোজ্জ্বল ধরণী,
জনকজননী-জননী!
নীলসিন্ধুজল-ধৌত চরণতল,
অনিলবিকম্পিত শ্যামল অঞ্চল,
অম্বরচুম্বিত ভাল হিমাচল,
শুভ্রতুষারকিরীীটিনী!
প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে,
প্রথম সামরব তব তপোবনে,
প্রথম প্রচারিত তব বনভবনে
জ্ঞানধর্ম কত কাব্যকাহিনী!
চিরকল্যাণময়ী তুমি ধন্য,
দেশ বিদেশে বিতরিছ অন্ন,
জাহ্নবীযমুনা বিগলিত করুণা
পুণ্যপীযূষস্তন্যবাহিনী!

ভারতলক্ষ্মী Romanized Version

Bhoirobi
Oyi bhubon-monmohini,
Oyi nirmol-shurjo-korozzhol dhoroni,
Jonokjononi-jononi!
Nil-sindhu-jol-dhout choron-tolo,
Onil-bikompowto shyamol onchol,
Ombor-chummarginBottom-chummito bhalo himachol,
Shubhro-tushar-kirithini!
Prothom probhat uday tobo gogone,
Prothom shamorob tobo topobone,
Prothom prachirito tobo bonobhone
Gyan-dhormo koto kabbyo-kahini!
Chiro-kollanmoyee tumi dhonno,
Deshe bideshe bitoricho onno,
Jahnabi-jomuna bigolito koruna
Punyo-piyush-stonyo-bahini!

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • ভারতবর্ষের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য:
“নীলসিন্ধুজল-ধৌত চরণতল, / অনিলবিকম্পিত শ্যামল অঞ্চল, / অম্বরচুম্বিত ভাল হিমাচল, / শুভ্রতুষারকিরীটিনী!”
— ভারতের পায়ের কাছে নীল সমুদ্রের জল ধুয়ে দিচ্ছে, বাতাসে শ্যামল অঞ্চল কেঁপে উঠছে এবং আকাশছোঁয়া হিমাচল যেন মাথায় শুভ্র তুষারের মুকুট পরে রয়েছে—প্রকৃতির এমন মহিমাম্বিত রূপ আর কোথাও নেই।
  • জ্ঞান ও সভ্যতার সূতিকাগার:
“প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে, / প্রথম সামরব তব তপোবনে, / প্রথম প্রচারিত তব বনভবনে / জ্ঞানধর্ম কত কাব্যকাহিনী!”
— পৃথিবীর বুকে মানবসভ্যতার প্রথম আলোর উদয়, বেদের সামগান এবং জ্ঞান-ধর্ম ও কাব্যের প্রথম প্রচার ঘটেছিল এই ভারতের মাটিতেই।
  • বিশ্বমাতারূপী অন্নপূর্ণা:
“চিরকল্যাণময়ী তুমি ধন্য, / দেশ বিদেশে বিতরিছ অন্ন, / জাহ্নবীযমুনা বিগলিত করুণা / পুণ্যপীযূষস্তন্যবাহিনী!”
— ভারত কেবল নিজের দেশের নয়, গঙ্গা-যমুনার করুণাধারা ও মাতৃস্নেহের মতো সমগ্র বিশ্বজুড়ে অন্ন ও প্রাণের সুধা বিতরণ করে চলেছে। তিনি বিশ্বের সমস্ত জননীর জননী।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কল্পনা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন