রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ কল্পনা (১৯৫২) তাঁর কাব্যসৃষ্টির এক বিশেষ পর্বের প্রতিনিধিত্ব করে। এই গ্রন্থে কল্পনা, স্মৃতি, প্রেম, দ্বিধা ও মানবমনের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন অত্যন্ত নাটকীয় ও গীতল ভঙ্গিতে প্রকাশ পেয়েছে। কল্পনা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “স্পর্ধা” কবিতাটি প্রেমের সাহস, সংকোচ ও আত্মসমর্পণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীমনের সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্বকে রসিকতা ও আবেগের মিশেলে তুলে ধরে। এখানে ‘স্পর্ধা’ অহংকার নয়—এ এক ধরণের প্রেমিকের নির্ভীক অগ্রসরতা, যা প্রত্যাখ্যানের ভাষাকেও অতিক্রম করে যায়।
Table of Contents
স্পর্ধা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সে আসি কহিল, “প্রিয়ে, মুখ তুলি চাও।’
দূষিয়া তাহারে রুষিয়া কহিনু, “যাও!’
সখী ওলো সখী, সত্য করিয়া বলি,
তবু সে গেল না চলি।
দাঁড়ালো সমুখে; কহিনু তাহারে, “সরো!’
ধরিল দু হাত; কহিনু, “আহা কী কর!’
সখী ওলো সখী, মিছে না কহিব তোরে,
তবু ছাড়িল না মোরে।
শ্রুতিমূলে মুখ আনিল সে মিছিমিছি;
নয়ন বাঁকায়ে কহিনু তাহারে, “ছি ছি!’
সখী ওলো সখী, কহিনু শপথ ক’রে
তবু সে গেল না সরে।
অধরে কপোল পরশ করিল তবু;
কাঁপিয়া কহিনু, “এমন দেখি নি কভু!’
সখী ওলো সখী, একি তার বিবেচনা,
তবু মুখ ফিরালো না।
আপন মালাটি আমারে পরায়ে দিল–
কহিনু তাহারে, “মালায় কী কাজ ছিল!’
সখী ওলো সখী, নাহি তার লাজ ভয়,
মিছে তারে অনুনয়।
আমার মালাটি চলিল গলায় লয়ে,
চাহি তার পানে রহিনু অবাক হয়ে।
সখী ওলো সখী, ভাসিতেছি আঁখিনীরে–
কেন সে এল না ফিরে!
কবিতার বিষয়বস্তু : প্রত্যাখ্যানের ভিতর দিয়ে আকর্ষণ
এই কবিতাটি একান্তভাবে কথোপকথনমূলক। বক্তা এক সখীর কাছে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছেন—কীভাবে তিনি বারবার প্রেমিককে প্রত্যাখ্যান করেছেন, রুষ্ট হয়েছেন, লজ্জা প্রকাশ করেছেন, এমনকি স্পষ্টভাবে দূরে যেতে বলেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রেমিক কোনো কথাতেই সরে যায় না।
“যাও”, “সরো”, “ছি ছি”—এই সব শব্দ বাহ্যত বিরক্তি ও অনিচ্ছার প্রকাশ হলেও কবিতার আবেগময় প্রবাহে তা হয়ে ওঠে এক ধরনের দ্বিধামিশ্রিত আকর্ষণ। প্রত্যাখ্যান যতই উচ্চারিত হোক, অন্তরের গভীরে কোথাও যেন সম্মতির নীরব সাড়া বাজতে থাকে।
স্পর্ধার তাৎপর্য : সাহস না অনধিকার?
কবিতার কেন্দ্রে রয়েছে প্রশ্ন—এই ‘স্পর্ধা’ কি অনধিকার, না কি প্রেমের স্বাভাবিক সাহস?
প্রেমিকের আচরণ দৃঢ়, অনমনীয়, কিন্তু সহিংস নয়। সে জোর করে কিছু নেয় না, বরং ধীরে ধীরে নিজের উপস্থিতিকে স্বাভাবিক করে তোলে। মালা পরানোর দৃশ্যটি এখানে প্রতীকী—এ যেন সম্পর্কের এক নীরব স্বীকৃতি, যা ভাষায় নয়, অনুভবে সম্পন্ন হয়।
শেষ পঙ্ক্তিতে বক্তার বিস্ময় ও আক্ষেপ—
“কেন সে এল না ফিরে!”
এই প্রশ্নই প্রমাণ করে, বাহ্যিক প্রত্যাখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর প্রত্যাশা।
নারীমন ও প্রেমের সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব
রবীন্দ্রনাথ এই কবিতায় নারীমনের দ্বৈততা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ধরেছেন—
- লজ্জা আছে, কিন্তু আকর্ষণও আছে
- ভয় আছে, কিন্তু প্রত্যাশাও আছে
- প্রত্যাখ্যান আছে, কিন্তু বিচ্ছেদ কাম্য নয়
এই দ্বন্দ্বই কবিতাটিকে জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
“স্পর্ধা” কবিতাটি কল্পনা কাব্যগ্রন্থের এক আকর্ষণীয় প্রেমকবিতা, যেখানে নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রেমের সাহস ও সংকোচের লুকোচুরি ধরা পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে দেখিয়েছেন—প্রেম সবসময় সরল সম্মতিতে নয়, অনেক সময় দ্বিধা, লজ্জা ও অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষার পথ বেয়েই পরিণতির দিকে এগোয়। এই কবিতা তাই প্রেমের মানবিক জটিলতার এক চিরসবুজ দলিল।
![কল্পনা কাব্যগ্রন্থের স্পর্ধা কবিতা | Spordha Kobita 1 স্পর্ধা spordha [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/স্পর্ধা-spordha-কবিতা-.gif)