বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম লঘু, রসিকতাভরা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেমের কবিতা হলো ‘তথাপি’। ১৯০০ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি ভালোবাসার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, অহংকারহীন আত্মসমর্পণ এবং জীবনের বাস্তবসম্মত রসবোধ অত্যন্ত চতুর ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | তথাপি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ক্ষণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ |
| কবিতার ধরন | লঘু ও রোমান্টিক লিরিক কবিতা (Light and Romantic Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক বিশেষ চঞ্চল ও রসিকতাপূর্ণ পর্বের সৃষ্টি। এই গ্রন্থের কবিতায় জীবনের গুরুগম্ভীর তত্ত্বের চেয়ে দৈনন্দিন আনন্দ, প্রাত্যহিক প্রেম ও কৌতুকপূর্ণ মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে। ‘তথাপি’ কবিতায় কবি ভালোবাসার এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব তুলে ধরেছেন—প্রিয়া ভালোবাসুক বা না বাসুক, বা অবহেলা করুক না কেন, কবি তাকেই বাস্তবে কাছে পেতে চান। স্মৃতির চেয়ে আসল মানুষটিকে পাওয়ার আকুলতা এবং সম্পর্কের নানা চড়াই-উতরাই নিয়ে এই কবিতায় এক হালকা মেজাজের রোমান্স ও বাস্তববোধ প্রকাশ পেয়েছে।
তথাপি – সম্পূর্ণ কবিতা
তুমি যদি আমায় ভালো না বাস
রাগ করি যে এমন আমার সাধ্য নাই–
এমন কথার দেব নাকো আভাসও,
আমারো মন তোমার পায়ে বাধ্য নাই।
নাইকো আমার কোনো গরব-গরিমা–
যেমন করেই কর আমায় বঞ্চিত
তুমি না রও তোমার সোনার প্রতিমা
রবে আমার মনের মধ্যে সঞ্চিত।
কিন্তু তবু তুমিই থাকো, সমস্যা যাক ঘুচি।
স্মৃতির চেয়ে আসলটিতেই আমার অভিরুচি।
দৈবে স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া শক্ত নয়
সেটা কিন্তু বলে রাখাই সংগত।
তাহা ছাড়া যারা তোমার ভক্ত নয়
নিন্দা তারা করতে পারে অন্তত।
তাহা ছাড়া চিরদিন কি কষ্টে যায়?
আমারো এই অশ্রু হবে মার্জনা।
ভাগ্যে যদি একটি কেহ নষ্টে যায়
সান্ত্বনার্থে হয়তো পাব চার জনা।
কিন্তু তবু তুমিই থাকো, সমস্যা যাক ঘুচি।
চারের চেয়ে একের ‘পরেই আমার অভিরুচি।
তথাপি Romanized Version
Tumi jodi amay bhalo na bash
Rag kori je amon amar sadhyo nai–
Emon kothar debo nako abhasho,
Amaro mon tomar paye badhyo nai.
Naiko amar kono gorob-gorima–
Jemon korei koro amay bonchito
Tumi na roo tomar shonar protima
Robe amar moner modhye shonchito.
Kintu tobu tumi-i thako, shomosya jak ghuchi.
Smritir cheye asholtitei amar oviruchi.
Doibe smriti hariye jawa shokto noy
Seta kintu bole rakhai shongoto.
Taha chhara jara tomar bhokto noy
Ninda tara korte pare ontoto.
Taha chhara chirodin ki koshte jay?
Amaro ei oshru hobe morjona.
Bhagye jodi ekti keho noshte jay
Shantunarthe hoyto pabo char jona.
Kintu tobu tumi-i thako, shomosya jak ghuchi.
Charer cheye eker ‘porei amar oviruchi.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- ভালোবাসার দাবিহীন আত্মসমর্পণ: প্রিয়া ভালো না বাসলেও কবি রাগ করবেন না বা বড়াই করবেন না—এই সহজ ও অহংকারহীন স্বীকারোক্তি দিয়ে কবিতার শুরু।
- স্মৃতির চেয়ে আসল প্রিয়া:
“কিন্তু তবু তুমিই থাকো, সমস্যা যাক ঘুচি। / স্মৃতির চেয়ে আসলটিতেই আমার অভিরুচি।”— স্মৃতির প্রতিমার চেয়ে রক্তমাংসের আসল মানুষটিকে কাছে পাওয়ার তীব্র আকুলতাই এখানে প্রধান হয়ে উঠেছে।
- রসিকতা ও বাস্তবতাবোধ:
“ভাগ্যে যদি একটি কেহ নষ্টে যায় / সান্ত্বনার্থে হয়তো পাব চার জনা। / কিন্তু তবু তুমিই থাকো, সমস্যা যাক ঘুচি। / চারের চেয়ে একের ‘পরেই আমার অভিরুচি।”— শেষের এই পঙ্ক্তিগুলোতে কবির অনন্য রসবোধ ও কৌতুক ফুটে উঠেছে। একাধিক বিকল্প বা সান্ত্বনা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও কবি অন্য চারজনের চেয়ে সেই একজনকেই (আসল প্রিয়াকে) পাওয়ার জন্য ব্যাকুল।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।