ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের ভীরুতা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক, চটুল ও আত্মরক্ষণশীল প্রেমের কবিতা হলো ‘ভীরুতা’। অন্তরের গভীরতম প্রেম ও বেদনার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত কিংবা উপহাসিত হওয়ার আশঙ্কায় মানুষ কীভাবে ঠাট্টা, উল্টো কথা, কৃত্রিম কাঠিন্য ও বাচালের মতো কথা বলে নিজের সত্য অনুভূতিকে আড়াল করে রাখে—এ কবিতায় তা লঘু ছন্দের আবরণে অথচ নিবিড় মমতায় উন্মোচিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামভীরুতা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থক্ষণিকা
প্রকাশের বছর১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনমনস্তাত্ত্বিক রোমান্টিক লিরিক ও কৌতুকমিশ্রিত অন্তর্মুখী প্রেমের কবিতা (Psychological Romantic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯০০ সালে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ বাংলা কাব্যসাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করে। রবীন্দ্রনাথ এই কাব্যে প্রথম প্রাত্যহিক কথ্যভাষার ছন্দ ও লঘু চালকে গভীর রোমান্টিক ভাবপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রেমের ক্ষেত্রে মানবমনের এক চিরন্তন দুর্বলতা হলো উপহাসের ভয়। ভালোবাসার মানুষটি যদি অন্তরের আকুলতাকে হালকাভাবে নেয়, তবে যে মর্মান্তিক আত্মসম্মানের হানি ঘটে, সেই ভয়ে প্রেমিক নিজেই আগেভাগে নিজের অনুভূতিকে কৌতুকচ্ছলে উড়িয়ে দেয়। নীরব থাকলে পাছে মনের গোপন সত্যটি প্রকাশ পেয়ে যায়, তাই সে অবিরাম কথার জাল বোনে; দূরে সরে গেলে পাছে তার দুর্বলতা ধরা পড়ে, তাই সে কৃত্রিম স্পর্ধা দেখিয়ে রোজ দেখা দিতে আসে। এই মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষার দোলাচলই কবিতাটির প্রাণ।

সম্পূর্ণ কবিতা:

গভীর সুরে গভীর কথা

     শুনিয়ে দিতে তোরে

            সাহস নাহি পাই।

মনে মনে হাসবি কিনা

     বুঝব কেমন করে?

            আপনি হেসে তাই

            শুনিয়ে দিয়ে যাই–

ঠাট্টা করে ওড়াই সখী,

            নিজের কথাটাই।

হাল্কা তুমি কর পাছে

            হাল্কা করি ভাই,

            আপন ব্যথাটাই।

সত্য কথা সরলভাবে

     শুনিয়ে দিতে তোরে

            সাহস নাহি পাই।

অবিশ্বাসে হাসবি কিনা

     বুঝব কেমন করে?

            মিথ্যা ছলে তাই

            শুনিয়ে দিয়ে যাই,

উল্টা করে বলি আমি

            সহজ কথাটাই।

ব্যর্থ তুমি কর পাছে

            ব্যর্থ করি ভাই,

            আপন ব্যথাটাই।

সোহাগ-ভরা প্রাণের কথা

     শুনিয়ে দিতে তোরে

            সাহস নাহি পাই।

সোহাগ ফিরে পাব কিনা

     বুঝব কেমন করে?

            কঠিন কথা তাই

            শুনিয়ে দিয়ে যাই,

গর্বছলে দীর্ঘ করি

            নিজের কথাটাই।

ব্যথা পাছে না পাও তুমি

            লুকিয়ে রাখি তাই

            নিজের ব্যথাটাই।

ইচ্ছা করে নীরব হয়ে

     রহিব তোর কাছে,

            সাহস নাহি পাই।

মুখের ‘পরে বুকের কথা

     উথ্‌লে ওঠে পাছে

            অনেক কথা তাই

            শুনিয়ে দিয়ে যাই,

কথার আড়ে আড়াল থাকে

           মনের কথাটাই।

তোমায় ব্যথা লাগিয়ে শুধু

            জাগিয়ে তুলি ভাই

            আপন ব্যথাটাই।

ইচ্ছা করি সুদূরে যাই,

     না আসি তোর কাছে।

            সাহস নাহি পাই।

তোমার কাছে ভীরুতা মোর

     প্রকাশ হয় রে পাছে

            কেবল এসে তাই

            দেখা দিয়েই যাই,

স্পর্ধাতলে গোপন করি

            মনের কথাটাই।

নিত্য তব নেত্রপাতে

            জ্বালিয়ে রাখি ভাই,

            আপন ব্যথাটাই।

 

Amar Rabindranath Logo

 

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Gombhir shure gombhir kotha
Shuniye dite tore
Shahosh nahi pai.
Mone mone hashbi kina
Bujhbo kemon kore?
Aponi heshe tai
Shuniye diye jai–
Thatta kore orai shokhi,
Nijer kothatai.
Halka tumi koro pachhe
Halka kori bhai,
Apon byathatai.
Shotto kotha shorolbhabe
Shuniye dite tore
Shahosh nahi pai.
Obisshashe hashbi kina
Bujhbo kemon kore?
Mithya chhole tai
Shuniye diye jai,
Ulta kore boli ami
Shohoj kothatai.
Byartho tumi koro pachhe
Byartho kori bhai,
Apon byathatai.
Shohag-bhora praner kotha
Shuniye dite tore
Shahosh nahi pai.
Shohag phire pabo kina
Bujhbo kemon kore?
Kothin kotha tai
Shuniye diye jai,
Gorbachhole dirgho kori
Nijer kothatai.
Byatha pachhe na pao tumi
Lukiye rakhi tai
Nijer byathatai.
Ichchha kore nirob hoye
Rohibo tor kachhe,
Shahosh nahi pai.
Mukher ‘pore buker kotha
Uthle othe pachhe
Onek kotha tai
Shuniye diye jai,
Kothar are aral thake
Moner kothatai.
Tomay byatha lagiye shudhu
Jagiye tuli bhai
Apon byathatai.
Ichchha kori shudure jai,
Na ashi tor kachhe.
Shahosh nahi pai.
Tomar kachhe bhiruta mor
Prokash hoy re pachhe
Kebol eshe tai
Dekha diyei jai,
Spordhatole gopon kori
Moner kothatai.
Nitto tobo netropate
Jwaliye rakhi bhai,
Apon byathatai.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • উপহাসের ভয় ও আত্মরক্ষণ:
    “হাল্কা তুমি কর পাছে / হাল্কা করি ভাই, / আপন ব্যথাটাই।”
    — অন্তরের পবিত্রতম অনুভূতি যদি প্রিয় মানুষের কাছে হাস্যাস্পদ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা সহ্য করা অসম্ভব। তাই নিজেকে সেই আঘাত থেকে রক্ষা করতে প্রেমিক নিজেই নিজের অনুভূতিকে লঘু করে ঠাট্টার ছলে উপস্থাপন করে।
  • কথার আড়ালে সত্য গোপন:
    “মুখের ‘পরে বুকের কথা / উথ্‌লে ওঠে পাছে / অনেক কথা তাই / শুনিয়ে দিয়ে যাই, / কথার আড়ে আড়াল থাকে / মনের কথাটাই।”
    — প্রেমিকের নীরবতা সত্যকে ফাঁস করে দিতে পারে—এই আশঙ্কায় সে অপ্রয়োজনীয় বহু কথা বলে যায়। এই বাহ্যিক বাচালতা আসলে নীরবতার চেয়েও বড় এক প্রতিরক্ষাব্যূহ, যার আড়ালে আসল মনের আর্তিটি নিরাপদে সুরক্ষিত থাকে।
  • স্পর্ধার আবরণে দুর্বলতার আড়াল:
    “তোমার কাছে ভীরুতা মোর / প্রকাশ হয় রে পাছে / কেবল এসে তাই / দেখা দিয়েই যাই, / স্পর্ধাতলে গোপন করি / মনের কথাটাই।”
    — দূরে সরে গেলে যদি প্রিয়া বুঝে ফেলে যে প্রেমিক তাকে এড়িয়ে চলছে তার দুর্বলতার কারণে, সেই আত্মসম্মানবোধের চাপে সে বারবার সামনে এসে দাঁড়ায়। এই ঔদ্ধত্য বা অবহেলার ভান আসলে মনের তীব্র ভীরুতা ও সংবেদনশীলতাকে ঢেকে রাখারই একটি নিষ্ফল প্রয়াস।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন