Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | ভীরুতা |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ক্ষণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | মনস্তাত্ত্বিক রোমান্টিক লিরিক ও কৌতুকমিশ্রিত অন্তর্মুখী প্রেমের কবিতা (Psychological Romantic Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
গভীর সুরে গভীর কথা
শুনিয়ে দিতে তোরে
সাহস নাহি পাই।
মনে মনে হাসবি কিনা
বুঝব কেমন করে?
আপনি হেসে তাই
শুনিয়ে দিয়ে যাই–
ঠাট্টা করে ওড়াই সখী,
নিজের কথাটাই।
হাল্কা তুমি কর পাছে
হাল্কা করি ভাই,
আপন ব্যথাটাই।
সত্য কথা সরলভাবে
শুনিয়ে দিতে তোরে
সাহস নাহি পাই।
অবিশ্বাসে হাসবি কিনা
বুঝব কেমন করে?
মিথ্যা ছলে তাই
শুনিয়ে দিয়ে যাই,
উল্টা করে বলি আমি
সহজ কথাটাই।
ব্যর্থ তুমি কর পাছে
ব্যর্থ করি ভাই,
আপন ব্যথাটাই।
সোহাগ-ভরা প্রাণের কথা
শুনিয়ে দিতে তোরে
সাহস নাহি পাই।
সোহাগ ফিরে পাব কিনা
বুঝব কেমন করে?
কঠিন কথা তাই
শুনিয়ে দিয়ে যাই,
গর্বছলে দীর্ঘ করি
নিজের কথাটাই।
ব্যথা পাছে না পাও তুমি
লুকিয়ে রাখি তাই
নিজের ব্যথাটাই।
ইচ্ছা করে নীরব হয়ে
রহিব তোর কাছে,
সাহস নাহি পাই।
মুখের ‘পরে বুকের কথা
উথ্লে ওঠে পাছে
অনেক কথা তাই
শুনিয়ে দিয়ে যাই,
কথার আড়ে আড়াল থাকে
মনের কথাটাই।
তোমায় ব্যথা লাগিয়ে শুধু
জাগিয়ে তুলি ভাই
আপন ব্যথাটাই।
ইচ্ছা করি সুদূরে যাই,
না আসি তোর কাছে।
সাহস নাহি পাই।
তোমার কাছে ভীরুতা মোর
প্রকাশ হয় রে পাছে
কেবল এসে তাই
দেখা দিয়েই যাই,
স্পর্ধাতলে গোপন করি
মনের কথাটাই।
নিত্য তব নেত্রপাতে
জ্বালিয়ে রাখি ভাই,
আপন ব্যথাটাই।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- উপহাসের ভয় ও আত্মরক্ষণ:“হাল্কা তুমি কর পাছে / হাল্কা করি ভাই, / আপন ব্যথাটাই।”— অন্তরের পবিত্রতম অনুভূতি যদি প্রিয় মানুষের কাছে হাস্যাস্পদ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা সহ্য করা অসম্ভব। তাই নিজেকে সেই আঘাত থেকে রক্ষা করতে প্রেমিক নিজেই নিজের অনুভূতিকে লঘু করে ঠাট্টার ছলে উপস্থাপন করে।
- কথার আড়ালে সত্য গোপন:“মুখের ‘পরে বুকের কথা / উথ্লে ওঠে পাছে / অনেক কথা তাই / শুনিয়ে দিয়ে যাই, / কথার আড়ে আড়াল থাকে / মনের কথাটাই।”— প্রেমিকের নীরবতা সত্যকে ফাঁস করে দিতে পারে—এই আশঙ্কায় সে অপ্রয়োজনীয় বহু কথা বলে যায়। এই বাহ্যিক বাচালতা আসলে নীরবতার চেয়েও বড় এক প্রতিরক্ষাব্যূহ, যার আড়ালে আসল মনের আর্তিটি নিরাপদে সুরক্ষিত থাকে।
- স্পর্ধার আবরণে দুর্বলতার আড়াল:“তোমার কাছে ভীরুতা মোর / প্রকাশ হয় রে পাছে / কেবল এসে তাই / দেখা দিয়েই যাই, / স্পর্ধাতলে গোপন করি / মনের কথাটাই।”— দূরে সরে গেলে যদি প্রিয়া বুঝে ফেলে যে প্রেমিক তাকে এড়িয়ে চলছে তার দুর্বলতার কারণে, সেই আত্মসম্মানবোধের চাপে সে বারবার সামনে এসে দাঁড়ায়। এই ঔদ্ধত্য বা অবহেলার ভান আসলে মনের তীব্র ভীরুতা ও সংবেদনশীলতাকে ঢেকে রাখারই একটি নিষ্ফল প্রয়াস।