বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তিম ও পরিণতির প্রতীক একটি পরম শান্ত, নিবিড় ও সমর্পণধর্মী লিরিক কবিতা হলো ‘সমাপ্তি’। জীবনের দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও বহু মানুষের সঙ্গ পেছনে ফেলে দিনশেষে পরম প্রিয়তমের নিভৃত বাসরকক্ষে উপনীত হয়ে সমস্ত কোলাহলের অবসানে অনন্ত শান্তির সুর এ কবিতায় অপূর্ব ছন্দে রূপায়িত হয়েছে।
Table of Contents
সমাপ্তি কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | সমাপ্তি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ক্ষণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক ও আধ্যাত্মিক সমাপ্তিমূলক লিরিক (Closing Lyric / Spiritual Ode) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯০০ সালে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের নামলিপি অনুযায়ী কবিতাগুলো ক্ষণিক অনুভূতির লঘু চালে রচিত হলেও এর সমাপনী কবিতা ‘সমাপ্তি’-তে এসে কবি এক অতল প্রশান্তি ও পূর্ণতার সন্ধান পান। দীর্ঘ পথচলায় কত ঋতুর আবর্তন, কত আনন্দ-বেদনা ও মানুষের সাহচর্য ছিল; কিন্তু জীবনের বেলাশেষে যখন সেই পথ ফুরিয়ে আসে, তখন সংসারের সমস্ত ভিড় সরে গিয়ে থাকে কেবল এক পরম সত্তা বা অনন্ত প্রিয়তমের একান্ত সান্নিধ্য। বহির্জগতের পথপরিক্রমা শেষে অন্তরের নিভৃত মন্দিরে প্রবেশের এই অনুভূতিকেই রবীন্দ্রনাথ এখানে সমাপ্তির রূপকে বেঁধেছেন।
সমাপ্তি সম্পূর্ণ কবিতা:
পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা।
সব শেষ হল যেখানে সেথায় তুমি আর আমি একা।
নানা বসন্তে নানা বরষায়
অনেক দিবসে অনেক নিশায়
দেখেছি অনেক, সহেছি অনেক, লিখেছি অনেক লেখা–
পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা।
কখন যে পথ আপনি ফুরালো, সন্ধ্যা হল যে কবে!
পিছনে চাহিয়া দেখিনু কখন চলিয়া গিয়াছে সবে।
তোমার নীরব নিভৃত ভবনে
জানি না কখন পশিনু কেমনে।
অবাক রহিনু আপন প্রাণের নূতন গানের রবে।
কখন যে পথ আপনি ফুরালো, সন্ধ্যা হল যে কবে!
চিহ্ন কি আছে শ্রান্ত নয়নে অশ্রুজলের রেখা?
বিপুল পথের বিবিধ কাহিনী আছে কি ললাটে লেখা?
রুধিয়া দিয়েছ তব বাতায়ন,
বিছানো রয়েছে শীতল শয়ন,
তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপ-আলোকে তুমি আর আমি একা।
নয়নে আমার অশ্রুজলের চিহ্ন কি যায় দেখা!

সমাপ্তি সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Pothe jotodin chhinu totodin oneker shone dekha.
Shob shesh holo jekhane shethay tumi ar ami eka.
Nana boshonte nana boroshay
Onek diboshe onek nishay
Dekhechhi onek, shohechhi onek, likhechhi onek lekha–
Pothe jotodin chhinu totodin oneker shone dekha.
Kokhon je poth aponi phuralo, shondhya holo je kobe!
Pichhone chahiya dekhinu kokhon choliya giyachhe shobe.
Tomar nirob nibhrito bhobone
Jani na kokhon poshinu kemone.
Obak rohinu apon praner nuton ganer robe.
Kokhon je poth aponi phuralo, shondhya holo je kobe!
Chinho ki achhe shranto noyone oshrujoler rekha?
Bipul pother bibidho kahini achhe ki lolaye lekha?
Rudhiya diyechho tobo batayon,
Bichhano royechhe shitol shoyon,
Tomar shondhyaprodip-aloke tumi ar ami eka.
Noyone amar oshrujoler chinho ki jay dekha!
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- বহু থেকে একে উত্তরণ:“পথে যতদিন ছিনু ততদিন অনেকের সনে দেখা। / সব শেষ হল যেখানে সেথায় তুমি আর আমি একা।”— জীবনের চলার পথে বিচিত্র মানুষের সাথে সম্পর্ক ও দেখা-সাক্ষাৎ ঘটে। কিন্তু সব পথ যেখানে শেষ হয়, সেখানে কোনো ভিড় থাকে না; সেখানে শুধু সাধক ও তার আরাধ্য, কিংবা প্রেমিক ও তার পরম প্রিয়তমের অখণ্ড নির্জন মিলন রচিত হয়।
- পথের অবসান ও নিভৃত আলয়:“তোমার নীরব নিভৃত ভবনে / জানি না কখন পশিনু কেমনে। / অবাক রহিনু আপন প্রাণের নূতন গানের রবে।”— সংসারের বহু বিচিত্র বসন্ত-বর্ষা পেরিয়ে কখন যে পথের ক্লান্তি নিঃশব্দে ফুরিয়ে গেছে এবং প্রিয়তমের নিভৃত ঘরে প্রবেশ ঘটেছে, তা সাধকের নিজের কাছেও এক মধুর বিস্ময়। সেখানে পৌঁছে প্রাণের ভেতর বেজে ওঠে সম্পূর্ণ এক নতুন সুর।
- বেদনার উপশম ও পরম বিশ্রাম:“রুধিয়া দিয়েছ তব বাতায়ন, / বিছানো রয়েছে শীতল শয়ন, / তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপ-আলোকে তুমি আর আমি একা। / নয়নে আমার অশ্রুজলের চিহ্ন কি যায় দেখা!”— বাইরের ঝড়-ঝঞ্ঝার পথ বন্ধ করে বাতায়ন রুদ্ধ হয়েছে, প্রস্তুত রয়েছে শীতল শয়ন। সন্ধ্যাপ্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় অতীতের সমস্ত দুঃখ, দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ও চোখের অশ্রুরেখা মুছে গিয়ে এক শাশ্বত ও গভীর প্রশান্তি নেমে আসে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।