বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অদ্ভুত ও শ্লেষাত্মক ছড়ার সংকলন ‘খাপছাড়া’-র একটি সংহত, ব্ল্যাক হিউমার (Black Humor) বা কালো কৌতুকপ্রধান ক্ষুদ্র কবিতা হলো ‘আপিস থেকে ঘরে এসে’। মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র নির্ভরতা, আত্মীয়ের মৃত্যুতে শোকের বদলে নিজের সুখহানির আক্ষেপ এবং তৎকালীন কবিরাজি চিকিৎসার প্রতি সূক্ষ্ম কটাক্ষ এ কবিতায় চটুল ছন্দে ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | আপিস থেকে ঘরে এসে (খাপছাড়া ৪৪ সংখ্যক ছড়া) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | খাপছাড়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৭ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | সংহত ব্যঙ্গাত্মক ছড়া ও কালো কৌতুক (Satirical Limerick / Dark Humor) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘খাপছাড়া’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ প্রাত্যহিক জীবনের বহু বাস্তব অথচ অপ্রিয় সত্যকে অতি সংক্ষেপে হাসির মোড়কে উপস্থাপন করেছেন। সংসারে আশ্রয় পাওয়া নিঃস্ব বিধবা পিসিরা কীভাবে পরিবারের সব কাজ ও রান্নাবান্না সামলে সবার সেবা করতেন, অথচ তাদের মৃত্যুতে পরিবারে মানুষ হারানোর শোকের চেয়ে নিজের তৈরি-করা গরম খাবার না পাওয়ার অসুবিধাটাই মুখ্য হয়ে উঠত—কবিতাটিতে সেই চরম স্বার্থপর মানসিকতা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে রোগীর প্রাণ বাঁচানোর বদলে বৈদ্য বা কবিরাজের ভুল চিকিৎসা কীভাবে মৃত্যুকেই ত্বরান্বিত করেছে, সেদিকেও এক নির্মম রসিকতার ইঙ্গিত করা হয়েছে।
আপিস থেকে ঘরে এসে – কবিতার পাঠ
আপিস-থেকে ঘরে এসে
মিলত গরম আহার্য,
আজকে থেকে রইবে না আর
তাহার জো।
বিধবা সেই পিসি ম’রে
গিয়েছে ঘর খালি করে,
বদ্দি স্বয়ং করেছে তার
সাহায্য।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Apis-theke ghore eshe
Milto gorom aharjo,
Ajke theke roibe na ar
Tahar jo.
Bidhoba shei pisi mo’re
Giyechhe ghor khali kore,
Boddi swoyong korechhe tar
Shahajjo.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিকতা ও শোকের অভাব:“আপিস-থেকে ঘরে এসে / মিলত গরম আহার্য, / আজকে থেকে রইবে না আর / তাহার জো।”— একজন স্বজনের মৃত্যুর পর গৃহকর্তার প্রথম চিন্তা কোনো বিচ্ছেদবেদনা নয়, বরং অফিস থেকে ফিরে প্রস্তুত গরম খাবার না পাওয়ার দুর্ভাবনা। আধুনিক মধ্যবিত্ত জীবনের অনুভূতির দীনতা ও স্থূল স্বার্থপরতা এখানে স্পষ্ট।
- অবহেলিত বিধবার অবস্থান:“বিধবা সেই পিসি ম’রে / গিয়েছে ঘর খালি করে,”— তৎকালীন যৌথ পরিবারে বিধবা আত্মীয়দের উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য সেবাদাসী হিসেবে। তাঁদের বেঁচে থাকা মূল্যায়িত হতো কেবল গৃহকর্মে উপযোগিতার ভিত্তিতে, যা ছড়ার আপাত লঘু চরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক করুণ বাস্তবতা।
- চিকিৎসার প্রহসন ও শ্লেষ:“বদ্দি স্বয়ং করেছে তার / সাহায্য।”— শেষ চরণে চরম উইট বা চমক তৈরি হয়েছে। বৈদ্য বা চিকিৎসক এসেছিলেন রোগ সারাতে, কিন্তু তাঁর অপচিকিৎসা কার্যত পিসিমাকে দ্রুত পরপারে পাঠাতেই ‘সাহায্য’ করেছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার অসঙ্গতিকে বিদ্রূপ করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত এটি।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।
