খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থের কনের পণের আশে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গ ও কৌতুক রসের সংকলন ‘খাপছাড়া’-র একটি সংহত, তীক্ষ্ণ ও ভাগ্যের পরিহাসমূলক ছড়া-কবিতা হলো ‘কনের পণের আশে’। পণপ্রথার সামাজিক ব্যাধি, বরের লোভী মানসিকতা এবং আকস্মিক বিপর্যয়ে বৈষয়িক উচ্চাশা চূর্ণ হয়ে বৈরাগ্যে রূপ নেওয়ার হাস্যকর রূপান্তরটি মাত্র আট চরণে অত্যন্ত সরস ভঙ্গিতে উন্মোচিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামকনের পণের আশে (খাপছাড়া ৯১ সংখ্যক ছড়া)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থখাপছাড়া
প্রকাশের বছর১৯৩৭ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনব্যঙ্গাত্মক ছড়া-কবিতা / সামাজিক শ্লেষ ও কৌতুক (Satirical Limerick / Situational Irony)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘খাপছাড়া’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ অদ্ভুত রস ও বিদ্রূপের মোড়কে সমাজের বহু কুপ্রথা ও নীচ মানসিকতাকে আঘাত করেছেন। তৎকালীন সমাজে যৌতুক বা পণ আদায়কে কেন্দ্র করে একশ্রেণির যুবকের অলসতা ও অর্থলোলুপতা ছিল এক স্পষ্ট ব্যাধি। চরিত্রটি (হীরু) মোটা অঙ্কের পণের লোভে নিজের নিশ্চিত চাকরিটি পর্যন্ত ছেড়ে দেয় এবং আয়নায় মুখ মেজে বরের সাজে প্রস্তুত হতে থাকে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আকস্মিকভাবে হবু শ্বশুরের মৃত্যু ঘটে এবং কনেও বিয়েতে বেঁকে বসে। অর্থ ও পাত্রী দুটোই হারিয়ে হীরুর যাবতীয় সাজসজ্জা মুহূর্তে ব্যর্থ হয়ে যায় এবং সে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ‘দরবেশ’ বা ফকিরের বেশ ধারণ করে।

কনের পণের আশে কবিতার পাঠ

কনের-পণের আশে

   চাকরি সে ত্যেজেছে।

বারবার আয়নাতে

   মুখখানি মেজেছে।

হেনকালে বিনা কোনো কসুরে

যম এসে ঘা দিয়েছে শ্বশুরে,

     কনেও বাঁকালো মুখ–

       বুকে তাই বেজেছে।

          বরবেশ ছেড়ে হীরু

            দরবেশ সেজেছে।

 

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Koner-poner ashe
Chakri she tyejechhe.
Barbar aynate
Mukhkhani mejechhe.
Henokale bina kono koshure
Jom eshe gha diyechhe shwoshure,
Koneo bankalo mukh–
Buke tai bejechhe.
Borobesh chhere Hiru
Dorbêsh shejechhe.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • লোভ ও অলসতার প্রকাশ:
    “কনের-পণের আশে / চাকরি সে ত্যেজেছে। / বারবার আয়নাতে / মুখখানি মেজেছে।”
    — হবু শ্বশুরের অর্থসম্পদের ওপর নির্ভর করে নিজের পরিশ্রমের চাকরি ছেড়ে দেওয়া পরজীবী মানসিকতার চরম নিদর্শন। রূপচর্চা ও আয়নায় মুখ মাজার মাধ্যমে তার অগভীর আত্মতৃপ্তি ও বাহ্যিক অহংকার স্পষ্ট হয়েছে।
  • ভাগ্যের আকস্মিক পরিহাস:
    “হেনকালে বিনা কোনো কসুরে / যম এসে ঘা দিয়েছে শ্বশুরে, / কনেও বাঁকালো মুখ– / বুকে তাই বেজেছে।”
    — কোনো দোষ বা কারণ ছাড়াই অকস্মাৎ শ্বশুরের মৃত্যুতে পণের যাবতীয় সম্ভাবনা নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তার ওপর কনে নিজেও এমন সুবিধাবাদী পাত্রকে বরণ করতে অস্বীকার করায় হীরুর আত্মসম্মানে চরম আঘাত লাগে।
  • চরম রূপান্তর ও শ্লেষাত্মক সমাপ্তি:
    “বরবেশ ছেড়ে হীরু / দরবেশ সেজেছে।”
    — ‘বরবেশ’ থেকে ‘দরবেশ’—এই দুই অন্ত্যমিলের ধ্বনিসাম্য ছড়াটির নাটকীয়তাকে শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। লোভ ও আত্মপ্রবঞ্চনার কারণে সবকিছু হারিয়ে শেষ পর্যন্ত তার এই ভণ্ড বৈরাগ্য গ্রহণ সামাজিক সুবিধাবাদীদের জন্য এক মোক্ষম ব্যঙ্গাত্মক শিক্ষা।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন