আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থের নামজাদা দানুবাবু কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৌতুক ও অদ্ভুত রসের সংকলন ‘খাপছাড়া’-র একটি সমাজ-সচেতন, শ্লেষাত্মক ও বুদ্ধিদীপ্ত ছড়া-কবিতা হলো ‘নামজাদা দানুবাবু’। নিজের শ্রম বা উপার্জনের মাধ্যমে নয়, বরং অন্যের পকেট কেটে চাঁদা তুলে স্বঘোষিত পরোপকারী সাজার যে ভণ্ড সামাজিক প্রবণতা—এ কবিতায় সংহত কৌতুকের আশ্রয়ে তা নিপুণভাবে বিদ্ধ করা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামনামজাদা দানুবাবু
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থখাপছাড়া
প্রকাশের বছর১৯৩৭ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনব্যঙ্গাত্মক ছড়া / সামাজিক শ্লেষ-কবিতা (Satirical Rhyme / Social Commentary)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘খাপছাড়া’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ কেবল খেয়ালখুশির রূপকথাই আঁকেননি, সমাজের বহুবিধ অসঙ্গতিকেও কৌতুক ও শ্লেষের চাবুকে আঘাত করেছেন। বাঙালি সমাজে এমন চরিত্রের অভাব নেই, যারা নিজের ঘরে চরম অভাব বা অলসতা টিকিয়ে রেখেও বাইরে ‘দানবীর’ হিসেবে নাম কামাতে ভালোবাসে। চরিত্রটি নিজের শ্রম দিয়ে এক পয়সাও উপার্জন করে না; রোজগারের কথা শুনলেই আঁতকে উঠে “শ্রীবিষ্ণু” স্মরণ করে। অথচ পরোপকার ও পুণ্য অর্জনের অন্ধ মোহে সে চাঁদার খাতা বগলদাবা করে পাড়ার দ্বারে দ্বারে ঘোরে। অন্যের পরিশ্রমে অর্জিত অর্থে নিজের যশের পাল্লা ভারী করার এই স্ববিরোধী মানসিকতাই কবিতাটির মূল উপজীব্য।

নামজাদা দানুবাবু কবিতা

নামজাদা-দানুবাবু

       রীতিমতো খর্‌চে,

অথচ ভিটেয় তার

       ঘুঘু সদা চরছে।

দানধর্মের ‘পরে

       মন তার নিবিষ্ট,

রোজগার করিবার

       বেলা জপে “শ্রীবিষ্ণু’,

চাঁদার খাতাটা তাই

       দ্বারে দ্বারে ধরছে।

এই ভাবে পুণ্যের

       খাতা তার ভরছে।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Namjada-danubabu
Ritimoto khorche,
Othochho bhitey tar
Ghughu shoda chorchhe.
Dandhormer ‘pore
Mon tar nibishto,
Rojgar koribar
Bela jope “Shribishnu’,
Chandar khatata tai
Dware dware dhorchhe.
Ei bhabe punnyer
Khata tar bhorchhe.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • স্ববিরোধিতা ও অলসতার প্রতীক:
    “নামজাদা-দানুবাবু / রীতিমতো খর্‌চে, / অথচ ভিটেয় তার / ঘুঘু সদা চরছে।”
    — দানুবাবু সমাজে ‘হাতখোলা’ মানুষ হিসেবে পরিচিত, কিন্তু তার নিজের বাস্তুভিটার অবস্থা করুণ—সেখানে দারিদ্র্য ও ধ্বংসের প্রতীক ‘ঘুঘু চরছে’। ঘরের দিকে নজর না দিয়ে বাইরে দানশীলতার মিথ্যা প্রতিপত্তি জাহির করার অসঙ্গতি এখানে দৃশ্যমান।
  • শ্রমবিমুখতা বনাম পরজীবী মানসিকতা:
    “দানধর্মের ‘পরে / মন তার নিবিষ্ট, / রোজগার করিবার / বেলা জপে ‘শ্রীবিষ্ণু’,”
    — দানধর্মের প্রতি তার অনুরাগ প্রবল হলেও নিজের জীবিকা অর্জনের বেলায় সে চরম অলস। পরিশ্রম করে রোজগারের প্রসঙ্গ উঠলেই সে হাত গুটিয়ে নেয় এবং পরম বৈরাগীর মতো ঈশ্বরের নাম জপে দায় এড়াতে চায়।
  • পরের ধনে পুণ্য অর্জনের প্রহসন:
    “চাঁদার খাতাটা তাই / দ্বারে দ্বারে ধরছে। / এই ভাবে পুণ্যের / খাতা তার ভরছে।”
    — নিজের শ্রমবিমুখতাকে ঢাকতে সে চাঁদা সংগ্রহের পথ বেছে নেয়। অন্যের কষ্টে উপার্জিত অর্থ নিজের কৃতিত্বের খাতায় জমা করে সে পরকালে পুণ্যের হিসাব বাড়িয়ে তুলছে। এই নিখুঁত শ্লেষের মাধ্যমে কবি সমাজের ভণ্ড সমাজসেবকদের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় পরিচিত।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প *গল্পগুচ্ছ* এবং ১,৯১৫টি গান *গীতবিতান* সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলি ৩২ খণ্ডে *রবীন্দ্র রচনাবলী* নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর পত্রসাহিত্যও *চিঠিপত্র* নামে ১৯ খণ্ডে এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন; তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে *গীতাঞ্জলি* কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

https://amarrabindranath.com/

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত