আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থের বহু কোটি-যুগ পরে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৌতুক ও অদ্ভুত রসের অনবদ্য ছড়া-সংকলন ‘খাপছাড়া’-র একটি অত্যন্ত আমোদজনক, চিত্রধর্মী ও কল্পনাপ্রধান রচনা হলো ‘বহু কোটি-যুগ পরে’। সমুদ্রের বোবা জলচর প্রাণীরা যদি সহসা বাকশক্তি লাভ করে, তবে অতল সাগরের বুকে কীরূপ এক বিচিত্র ও তুমুল হুল্লোড় শুরু হতে পারে—এ কবিতায় তা অনুপম হাস্যকৌতুকে রূপায়িত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামবহু কোটি-যুগ পরে
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থখাপছাড়া
প্রকাশের বছর১৯৩৭ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনকৌতুকরসাত্মক ছড়া-কবিতা / ননসেন্স পদ্য (Nonsense Verse / Humorous Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

জীবনের শেষ পর্বে (১৯৩৭ সালে) রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত কৌতুক পদ্যের সংকলন ‘খাপছাড়া’। নিজের আঁকা বিচিত্র সব কার্টুন ও স্কেচের পাশে তিনি ছন্দ মিলিয়ে রচনা করেছিলেন এই অদ্ভুত ও খেয়ালখুশির পদ্যগুলো। ‘বহু কোটি-যুগ পরে’ কবিতাটিতে কবি এক অসম্ভব কল্পনার অবতারণা করেছেন। সৃষ্টির আদিকাল থেকে সমুদ্রের নীরব তলদেশে বাস করা প্রাণীরা যদি হঠাৎ করে সরস্বতীর বরে কণ্ঠস্বর ও সুরের অধিকার পেয়ে যায়, তবে শান্ত সাগর মুহূর্তে এক অদ্ভুত অর্কেস্ট্রায় রূপ নেয়। তিমির ডাক থেকে শুরু করে ইলিশের শাস্ত্রীয় রাগ ভাঁজা এবং শুশুকদের কুচকাওয়াজ—সব মিলিয়ে এক নির্মল আনন্দলোক সৃষ্টি করাই কবির উদ্দেশ্য।

বহু কোটি-যুগ পরে (সম্পূর্ণ কবিতা):

বহু কোটি-যুগ পরে

সহসা বাণীর বরে

জলচর প্রাণীদের

       কণ্ঠটা পাওয়া যেই

সাগর জাগর হল

       কতমতো আওয়াজেই।

তিমি ওঠে গাঁ গাঁ করে;

        চিঁ চিঁ করে চিংড়ি;

ইলিস বেহাগ ভাঁজে

       যেন মধু নিংড়ি;

শাঁখগুলো বাজে, বহে

       দক্ষিণে হাওয়া যেই;

গান গেয়ে শুশুকেরা

       লাগে কুচ-কাওয়াজেই।

বহু কোটি যুগ পরে কবিতা | Bohu koti juger pore kobita | খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Bohu koti-jug pore
Shohosa banir bore
Jolochor pranider
Konthota pawa jei
Shagor jagor holo
Kotomoto awajei.
Timi othe gan gan kore;
Chin chin kore chingri;
Ilish Behag bhanje
Jeno modhu ningri;
Shankhgulo baje, bohe
Dokkhine hawa jei;
Gan geye shushukera
Lage kuch-kawajei.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • অসম্ভব কল্পনা ও বাকশক্তির বর:
    “বহু কোটি-যুগ পরে / সহসা বাণীর বরে / জলচর প্রাণীদের / কণ্ঠটা পাওয়া যেই / সাগর জাগর হল / কতমতো আওয়াজেই।”
    — অনন্তকাল ধরে নিঃশব্দে থাকা সমুদ্রের জীবদের দেবী সরস্বতীর কৃপায় হঠাৎ কথা ফুটে ওঠার এই রূপকথাধর্মী সূচনাটি কবিতার মূল কৌতুকরসকে উসকে দেয়। স্তব্ধ সাগরে মুহূর্তেই শুরু হয় শব্দের তুমুল কোলাহল।
  • প্রাণিজগতের বিচিত্র অর্কেস্ট্রা:
    “তিমি ওঠে গাঁ গাঁ করে; / চিঁ চিঁ করে চিংড়ি; / ইলিশ বেহাগ ভাঁজে / যেন মধু নিংড়ি;”
    — বিভিন্ন জলচর প্রাণীর দেহের আকৃতি ও স্বভাবের সাথে কবি মিলিয়ে দিয়েছেন অদ্ভুত সব সুর ও স্বরভঙ্গি। বিশালদেহী তিমির গম্ভীর গর্জন, অতিক্ষুদ্র চিংড়ির তীক্ষ্ণ স্বর, আর ইলিশ মাছের কণ্ঠে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সুমধুর ‘বেহাগ’ রাগের বিস্তার—এই বৈপরীত্য পাঠকের মনে অনাবিল হাস্যরসের উদ্রেক করে।
  • উৎসবমুখর জলজগৎ ও সামরিক ছন্দ:
    “শাঁখগুলো বাজে, বহে / দক্ষিণে হাওয়া যেই; / গান গেয়ে শুশুকেরা / লাগে কুচ-কাওয়াজেই।”
    — মলয় বাতাসের ছোঁয়ায় শাঁখগুলো যখন বাদ্যযন্ত্রের মতো বাজতে শুরু করে, তখন শুশুক বা ডলফিনেরা গান গাইতে গাইতে সুশৃঙ্খল সৈন্যদের মতো কুচকাওয়াজে মেতে ওঠে। সাগরের তলদেশের এই মহোৎসব রবীন্দ্রনাথের শিশুসুলভ কল্পনা ও ছন্দকুশলতার এক অনন্য নিদর্শন।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি (প্রমিত ‘ইলিশ’ রূপসহ) ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় পরিচিত।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প *গল্পগুচ্ছ* এবং ১,৯১৫টি গান *গীতবিতান* সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলি ৩২ খণ্ডে *রবীন্দ্র রচনাবলী* নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর পত্রসাহিত্যও *চিঠিপত্র* নামে ১৯ খণ্ডে এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন; তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে *গীতাঞ্জলি* কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

https://amarrabindranath.com/

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত