বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্রা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর, মনস্তাত্ত্বিক ও বিষাদমাখা লিরিক্যাল কবিতা হলো ‘দুঃসময়’। ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত ‘চিত্রা’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতায় কবি মানবজীবনের নিঃসঙ্গতা, বিলম্বে উপলব্ধ হওয়া অনুশোচনা এবং আনন্দমুখর পৃথিবীর মাঝে উপেক্ষিত দুঃখ বা দুর্ভাগ্যের এক মর্মান্তিক রূপক ফুটিয়ে তুলেছেন। যখন চারদিক উৎসবের আনন্দে মত্ত এবং দরজা বন্ধ, তখন হঠাৎ গভীর রাতে ফিরে আসা দুঃখের আগমন কেউ আর গ্রহণ করতে চায় না।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | দুঃসময় |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | চিত্রা |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৬ |
| কবিতার ধরন | মনস্তাত্ত্বিক ও বিষাদমূলক抒情 কবিতা (Psychological and Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৯৬ সালে প্রকাশিত ‘চিত্রা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যযাত্রার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রোমান্টিক পর্যায়। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতায় মানবাত্মার সুগভীর আকুতি, প্রেম, সৌন্দর্য এবং জীবনের দার্শনিক সত্য নানা রঙে ফুটে উঠেছে। ‘দুঃসময়’ কবিতায় কবি এমন এক সময়কে চিত্রিত করেছেন যখন মানুষ জীবনের ভুলগুলো বুঝতে পেরে যখন ফিরে আসে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। চারপাশের আনন্দমুখর সমাজ বা মানুষেরা তখন সেই পুরোনো দুঃখ বা অনুশোচনাকে আর আপন করে নিতে চায় না; চারদিকের দরজা তখন রুদ্ধ এবং প্রকৃতিও প্রতিকূল ঝড়ে উত্তাল হয়ে ওঠে।
দুঃসময় – সম্পূর্ণ কবিতা
বিলম্বে এসেছছ, রুদ্ধ এবে দ্বার,
জনশূন্য পথ, রাত্রি অন্ধকার,
গৃহহারা বায়ু করি হাহাকার
ফিরিয়া মরে।
তোমারে আজিকে ভুলিয়াছে সবে,
শুধাইলে কেহ কথা নাহি কবে,
এহেন নিশীথে আসিয়াছ তবে
কী মনে করে।
এ দুয়ারে মিছে হানিতেছ কর,
ঝটিকার মাঝে ডুবে যায় স্বর,
ক্ষীণ আশাখানি ত্রাসে থরথর্
কাঁপিছে বুকে।
যেথা একদিন ছিল তোর গেহ
ভিখারির মতো আসে সেথা কেহ?
কার লাগি জাগে উপবাসী স্নেহ
ব্যাকুল মুখে।
ঘুমায়েছে যারা তাহারা ঘুমাক,
দুয়ারে দাঁড়ায়ে কেন দাও ডাক,
তোমারে হেরিলে হইবে অবাক
সহসা রাতে।
যাহারা জাগিছে নবীন উৎসবে
রুদ্ধ করি দ্বার মত্ত কলরবে,
কী তোমার যোগ আজি এই ভবে
তাদের সাথে।
দ্বারছিদ্র দিয়ে কী দেখিছ আলো,
বাহির হইতে ফিরে যাওয়া ভালো,
তিমির ক্রমশ হতেছে ঘোরালো
নিবিড় মেঘে।
বিলম্বে এসেছ– রুদ্ধ এবে দ্বার,
তোমার লাগিয়া খুলিবে না আর,
গৃহহারা ঝড় করি হাহাকার
বহিছে বেগে।
দুঃসময় Romanized Version
Bilombe esecho, ruddho ebe dwar,
Jonoshunyo poth, ratri ondhokar,
Grihohara bayu kori hahakar
Firiya more.
Tomare ajike bhuliyache shobe,
Shudhaile keho kotha nahi kobe,
Ehen nishite ashiyacho tabe
Ki mone kore.
E duare mishe hanitecho kor,
Jhotikar majhe dube jay shor,
Khin ashakhani trase thorthor
Kapiche buke.
Jetha ekdin chhilo tor geho
Bhikharir মতো ase setha keho?
Kar lagi jage upobasi sneho
Byakul mukhe.
Ghumayeche jara tahara ghumak,
Duare daraye keno dao dak,
Tomare herile hoibe obak
Shohosa rate.
Jahara jagiçe nobin utshobe
Ruddho kori dwar motto kolrobe,
Ki tomar jog aji ei bobe
Tader sathe.
Dwarchhidro diye ki dekhiço alo,
Bahir hoite fire jawa bhalo,
Timir kromosho hoteche ghoralo
Nibir meghe.
Bilombe eseche– ruddho ebe dwar,
Tomar lagiya khulibe na ar,
Grihohara jhor kori hahakar
Bohiche bege.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- বিলম্বিত আগমন ও রুদ্ধদ্বার: জীবন যখন গড়িয়ে যায় এবং ভুল বুঝতে পেরে কেউ ফিরে আসে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। চারপাশ তখন জনশূন্য, অন্ধকার এবং দরজা চিরতরে বন্ধ।
- উৎসবমুখর সমাজ ও উপেক্ষিত দুঃখ: সমাজের মানুষেরা যখন নবীন উৎসবে মত্ত এবং আনন্দ-উল্লাসে ব্যস্ত, তখন তাদের সাথে কোনো দুঃখ বা অতীতের কান্নার মিল থাকে না। তারা এই নিশীথে কোনো বেদনাকে জায়গা দিতে নারাজ।
- অতীতের আশ্রয় ও বর্তমানের ভিখারি রূপ: যে ঘর একদিন নিজের আপন ছিল, আজ দীর্ঘকাল পর সেখানে ফিরলে নিজের পরিচয় হারিয়ে ভিখারির মতো দাঁড়াতে হয়, যার জন্য আর কারও মনে কোনো অপেক্ষা বা স্নেহ জেগে থাকে না।
- “বাহির হইতে ফিরে যাওয়া ভালো”— এই চরণের মাধ্যমে কবি এক চরম নিঃসঙ্গতা ও নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। জীবনের কোনো কোনো অধ্যায় এমনভাবে শেষ হয়ে যায় যে সেখানে আর ফেরার উপায় থাকে না। বাইরের প্রবল ঝড়ের মাঝে অন্ধকারের ভেতর নিঃশব্দে ফিরে যাওয়াই তখন একমাত্র পরিণতি হয়ে দাঁড়ায়।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (চিত্রা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
