বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক ভাবনাসমৃদ্ধ কবিতা হলো ‘যাত্রী’। ১৮৯৬ সালে (আশ্বিন ১৩০৩ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতায় কবি মানবজীবনের চিরন্তন একাকী যাত্রা, পার্থিব মোহ ও তুচ্ছ দুঃখ-বেদনার নশ্বরতা এবং মহাবিশ্বের অনন্ত পথের দিকে মানুষের অন্তাত্মার এগিয়ে যাওয়ার এক অনবদ্য রূপক ফুটিয়ে তুলেছেন।

Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | যাত্রী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | চৈতালী |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৬ (আশ্বিন, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক কবিতা (Philosophical and Spiritual Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৯৬ সালে প্রকাশিত ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের “চিত্রা-চৈতালি পর্ব”-এর অন্তর্গত একটি অত্যন্ত সুকুমার ও গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো প্রধানত প্রকৃতি ও মানবজীবনের ছোট ছোট সৌন্দর্য, মুহূর্ত এবং গভীর জীবনের সত্যের নিখুঁত লিরিক্যাল চিত্রায়ন। ‘যাত্রী’ কবিতায় কবি মানুষকে তার জীবনের প্রকৃত গন্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। পার্থিব দুঃখ-কষ্ট, মানুষের তুচ্ছ সমালোচনা বা অন্তহীন সংসারের কোলাহল একসময় হারিয়ে যায়, আর মানুষ চিরকালের মতো অসীম মহাবিশ্বের পথে একা এগিয়ে চলে।
যাত্রী – সম্পূর্ণ কবিতা
ওরে যা-ত্রী, যেতে হবে বহুদূরদেশে।
কিসের করিস চিন্তা বসি পথশেষে?
কোন্ দুঃখে কাঁদে প্রাণ? কার পানে চাহি
বসে বসে দিন কাটে শুধু গান গাহি
শুধু মুগ্ধনেত্র মেলি? কার কথা শুনে
মরিস জ্বলিয়া মিছে মনের আগুনে?
কোথায় রহিবে পড়ি এ তোর সংসার!
কোথায় পশিবে সেথা কলরব তার!
মিলাইবে যুগ যুগ স্বপনের মতো,
কোথা রবে আজিকার কুশাঙ্কুরক্ষত!
নীরবে জ্বলিবে তব পথের দু ধারে
গ্রহতারকার দীপ কাতারে কাতারে।
তখনো চলেছ একা অনন্ত ভুবনে–
কোথা হতে কোথা গেছ না রহিবে মনে।
যাত্রী Romanized Version
Ore ja-tri, jete hobe bohudurdeshe.
Kiser koris chinta bosi pothsheshe?
Kon duhkhe kande pran? Kar pane chahi
Bose bose din kate shudhu gan gahi
Shudhu mugdhonetro meli? Kar kotha shune
Moris joliya miche moner agune?
Kothay rohibe pori e tor shongshar!
Kothay poshibe setha kolrobo tar!
Milayibe yug yug shoponer moto,
Kotha robe ajikar kushankur-kshoto!
Nirobe jolibe tobo pother du dhare
Groho-tarokar dip katare katare.
Tokhono cholecho eka ononto bhubone–
Kotha hote kotha gecho na rohibe mone.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- পার্থিব মোহ ও দুঃখের অসারতা: মানুষ তুচ্ছ বিষয় নিয়ে, অন্যের কথা ভেবে বা মিথ্যা অভিমানে জীবন অপচয় করে। অথচ এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার দুঃখ বা কষ্ট চিরস্থায়ী নয়।
- সংসারের কোলাহলের বিলীনতা: মানুষের গড়া এই সংসার, তার চিৎকার ও কলরব একদিন স্বপ্নের মতো মিলিয়ে যাবে। আজকের পায়ে ফুটি ফোটার মতো ছোটোখাটো আঘাত বা যন্ত্রণা (কুশাঙ্কুরক্ষত) কাল আর থাকবে না।
- মহাজাগতিক একাকী যাত্রা:
“তখনো চলেছ একা অনন্ত ভুবনে– / কোথা হতে কোথা গেছ না রহিবে মনে।”— এই চরণের মাধ্যমে কবিতার মূল দার্শনিক সত্য প্রকাশিত হয়েছে। পার্থিব সমস্ত সম্পর্ক ও কোলাহল পেছনে ফেলে মানুষকে শেষ পর্যন্ত অনন্ত ভুবনের পথে একাই যাত্র করতে হয়, যেখানে মহাবিশ্বের নক্ষত্ররা কেবল নীরবে আলো জ্বালায়।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (চৈতালী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
