রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “খেলা” কবিতাটি তাঁর কাব্যগ্রন্থ ছবি ও গান-এর অন্তর্গত একটি অনবদ্য রচনা। ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থে কবি শব্দকে চিত্রের মতো ব্যবহার করেছেন এবং ছন্দে এনেছেন গানের সুরেলা প্রবাহ। এই গ্রন্থের কবিতাগুলিতে প্রকৃতি, আলো-আঁধার, সময়ের গতি এবং মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভব একসঙ্গে মিশে এক বিশেষ কাব্যিক আবহ সৃষ্টি করেছে।
“খেলা” কবিতায় কবি সাঁঝবেলার গ্রামীণ প্রকৃতির পটভূমিতে শিশুদের খেলাধুলার দৃশ্য এঁকেছেন। এখানে শিশুদের হাসি, দৌড়ঝাঁপ ও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে নেমে আসা সন্ধ্যার নীরবতা, আলো-আঁধারের রং, আকাশে মেঘ ও তারার উপস্থিতি এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে। কবিতাটি শুধু শিশুদের খেলাই নয়, বরং জীবনের ক্ষণিক আনন্দ, নির্ভার শৈশব এবং দিনের শেষে ঘরে ফেরার আবেগময় মুহূর্তকেও স্পর্শ করে।
খেলা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছেলেতে মেয়েতে করে খে’লা
ঘাসের ‘পরে সাঁঝের বেলা।
ঘোর ঘোর গাছের তলে তলে,
ফাঁকায় পড়েছে মলিন আলো,
কোথাও যেন সোনার ছায়া ছায়া
কোথাও যেন আঁধার কালো কালো।
আকাশের ধারে ধারে ঘিরে,
বসেছে রাঙা মেঘের মেলা-
শ্যামল ঘাসের ‘পরে, সাঁঝে
আলো-আঁধারের মাঝে মাঝে,
ছেলেতে মেয়েতে করে খে’লা।
ওরা যে কেন হেসে সারা,
কেন যে করে অমনধারা,
কেন যে লুটোপুটি,
কেন যে ছুটোছুটি,
কেন যে আহ্লাদে কুটিকুটি।
কেহ বা ঘাসে গড়ায়,
কেহ বা নেচে বেড়ায়,
সাঁঝের সোনা-আকাশে
হাসির সোনা ছড়ায়।
আঁখি দুটি নৃত্য করে,
নাচে চুল পিঠের ‘পরে,
হাসিগুলি চোখে মুখে লুকোচুরি খে’লা করে।
যেন মেঘের কাছে ছুটি পেয়ে
বিদ্যুতেরা এল ধেয়ে,
আনন্দে হল রে আপন-হারা।
ওদের হাসি দেখে খেলা দেখে
আকাশের এক ধারে থেকে
মৃদু মৃদু হাসছে একটি তারা।
ঝাউগাছে পাতাটি নড়ে না,
কামিনীর পাপড়িটি পড়ে না।
আঁধার কাকের দল
সাঙ্গ করি কোলাহল
কালো কালো গাছের ছায়,
কে কোথায় মিশায়ে যায়–
আকাশেতে পাখিটি ওড়ে না।
সাড়াশব্দ কোথায় গেল,
নিঝুম হয়ে এল এল
গাছপালা বন গ্রামের আশেপাশে।
শুধু খেলার কোলাহল,
শিশুকন্ঠের কলকল,
হাসির ধ্বনি উঠেছে আকাশে।
কত আর খেলবি ও রে,
নেচে নেচে হাতে ধ’রে
যে যায় ঘরে চলে আয় ঝাট্,
আঁধার হয়ে এল পথঘাট।
সন্ধ্যাদীপ জ্বলল ঘরে,
চেয়ে আছে তোদের তরে-
তোদের না হেরিলে মার কোলে
ঘরের প্রাণ কাঁদে সন্ধে হলে।
![ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের খেলা কবিতা | Khelaa Kobita 1 খেলা khelaa [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/খেলা-khelaa-কবিতা-.gif)