জন্মদিন কবিতা । পরিশেষ । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জন্মদিন’ কবিতাটি তাঁর জীবনের গোধূলি বেলার এক গভীর আত্মোপলব্ধি এবং প্রশান্তির কাব্যিক রূপায়ণ। এই কবিতায় মিশে আছে দীর্ঘ কর্মমুখর জীবনের প্রতি কবির বিদায়ী অভিবাদন এবং প্রকৃতির অনন্ত শান্তির ক্রোড়ে নিজেকে সমর্পণ করার এক তীব্র বাসনা। কবিতাটি পড়তে গেলে আপনি অনুভব করবেন, যেন একজন ক্লান্ত পথিক দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর এমন এক আশ্রয়ের সন্ধান করছেন যেখানে কোনো জাগতিক কোলাহল নেই, আছে কেবল স্নিগ্ধ আতিথ্য আর বিশ্বসত্তার সাথে একাত্ম হওয়ার গভীর সুর। রবীন্দ্রনাথের পরিণত বয়সের এই সৃষ্টিটি আপনাকে জীবনের এক অন্যরকম দর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করাবে, যা একই সাথে বিষণ্ণ ও প্রশান্তিদায়ক।

কবিতার মূল তথ্য

| কবিতার নাম | জন্মদিন |

| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| মূল কাব্যগ্রন্থ | পরিশেষ |

| প্রকাশের বছর | ১৯৩২ |

| কবিতার ধরন | আত্মজৈবনিক ও দার্শনিক |

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের এক অবিসংবাদিত প্রতিভা, যাঁর সৃষ্টিশীলতা কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ থেকে শুরু করে চিত্রকলা পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি শুধু একজন কবিই ছিলেন না, ছিলেন এক মহান দার্শনিক ও দ্রষ্টা। নোবেল পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর লেখনীতে জীবন, প্রকৃতি, ঈশ্বর এবং মানবপ্রেমের যে গভীর ও সূক্ষ্ম অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে, তা আজও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ে চির অম্লান হয়ে আছে।

‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের এক পরিণত পর্যায়ের সৃষ্টি। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে জীবনের সায়াহ্নে এসে কবির আত্মবিশ্লেষণ, অতীত স্মৃতিচারণ এবং মৃত্যুর স্বরূপ সন্ধানের একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘জন্মদিন’ কবিতাটি রচনার সময় কবি জীবনের এক দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছেন। তিনি গভীরভাবে অনুভব করেছেন যে, তাঁর কর্মময় জীবনের আবর্তন ধীরে ধীরে সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই উপলব্ধির জায়গা থেকেই তিনি জাগতিক সব কর্মের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃতির নিভৃত শান্তিতে বিলীন হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যা কবিতাটিকে এক বিশেষ দার্শনিক মাত্রা প্রদান করেছে।

কবিতার সম্পূর্ণ পাঠ

জন্মদিন সম্পূর্ণ কবিতা

রবিপ্রদক্ষিণপথে জন্মদিবসের আবর্তন

হয়ে আসে সমাপন।

আমার রুদ্রের

মালা রুদ্রাক্ষের

অন্তিম গ্রন্থিতে এসে ঠেকে

রৌদ্রদগ্ধ দিনগুলি গেঁথে একে একে।

হে তপস্বী, প্রসারিত করো তব পাণি

লহো মালাখানি।

উগ্র তব তপের আসন,

সেথায় তোমারে সম্ভাষণ

করেছিনু দিনে দিনে কঠিন স্তবনে,

কখনো মধ্যাহ্নরৌদ্রে কখনো-বা ঝঞ্ঝার পবনে।

এবার তপস্যা হতে নেমে এসো তুমি–

দেখা দাও যেথা তব বনভূমি

ছায়াঘন, যেথা তব আকাশ অরুণ

আষাঢ়ের আভাসে করুণ।

অপরাহ্ন যেথা তার ক্লান্ত অবকাশে

মেলে শূন্য আকাশে আকাশে

বিচিত্র বর্ণের মায়া; যেথা সন্ধ্যাতারা

বাক্যহারা

বাণীবহ্নি জ্বালি

নিভৃতে সাজায় ব’সে অনন্তের আরতির ডালি।

শ্যামল দাক্ষিণ্যে ভরা

সহজ আতিথ্যে বসুন্ধরা

যেথা স্নিগ্ধ শান্তিময়,

যেথা তার অফুরান মাধুর্যসঞ্চয়

প্রাণে প্রাণে

বিচিত্র বিলাস আনে রূপে রসে গানে।

বিশ্বের প্রাঙ্গণে আজি ছুটি হোক মোর,

ছিন্ন করে দাও কর্মডোর।

আমি আজ ফিরব কুড়ায়ে

উচ্ছৃঙ্খল সমীরণ যে কুসুম এনেছে উড়ায়ে

সহজে ধুলায়,

পাখির কুলায়

দিনে দিনে ভরি উঠে যে-সহজ গানে,

আলোকের ছোঁওয়া লেগে সবুজের তম্বুরার তানে।

এই বিশ্বসত্তার পরশ,

স্থলে জলে তলে তলে এই গূঢ় প্রাণের হরষ

তুলি লব অন্তরে অন্তরে–

সর্বদেহে, রক্তস্রোতে, চোখের দৃষ্টিতে, কণ্ঠস্বরে,

জাগরণে, ধেয়ানে, তন্দ্রায়,

বিরামসমুদ্রতটে জীবনের পরমসন্ধ্যায়।

এ জন্মের গোধূলির ধূসর প্রহরে

বিশ্বরসসরোবরে

শেষবার ভরিব হৃদয় মন দেহ

দূর করি সব কর্ম, সব তর্ক, সকল সন্দেহ,

সব খ্যাতি, সকল দুরাশা,

বলে যাব, “আমি যাই, রেখে যাই, মোর ভালোবাসা।’

জন্মদিন Romanized Version

Robiprodokkhinpothe jonmodibosher aborton

Hoye ashe somapon.

Amar rudrer

Mala rudrakkher

Ontim gronthite eshe theke

Roudrodogdho dinguli gethe eke eke.

He toposshi, prosharito koro tobo pani

Loho malakhani.

Ugro tobo toper ashon,

Sethay tomare sombhashon

Korechinu dine dine kothin stobone,

Kokhono moddhannoroudre kokhono-ba jhonjhar pobone.

Ebar toposhya hote neme esho tumi–

Dekha dao jetha tobo bonobhumi

Chhayaghono, jetha tobo akash orun

Asharher avashe korun.

Oporanno jetha tar klanto obokashe

Mele shunno akashe akashe

Bichitro borner maya; jetha sondhyatara

Bakkohara

Banibohni jwali

Nivrite sajay bo’she ononter arotir dali.

Shyamol dakhinnye vora

Sohoj atithye boshundhora

Jetha snigdho shantimoy,

Jetha tar ofuran madhurjosonchoy

Prane prane

Bichitro bilash ane rupe roshe gane.

Bishwer prangone aji chuti hok mor,

Chhinno kore dao kormodor.

Ami aj firbo kuraaye

Ucchrinkhol somiron je kushum eneche uraaye

Sohoje dhulay,

Pakhir kulay

Dine dine vori uthe je-sohoj gane,

Aloker chhowa lege sobujer tomburar tane.

Ei bishwosottar porosh,

Sthole jole tole tole ei gurho praner horosh

Tuli lobo ontore ontore–

Sorbodehe, roktosrote, chokher drishtite, konthosware,

Jagorone, dheyane, tondray,

Biramshomudrotote jiboner poromsondhyay.

E jonmer godhulir dhushor prohore

Bishworshosorobore

Sheshbar voribo hridoy mon deho

Dur kori sob kormo, sob torko, sokol shondeho,

Sob khati, sokol durasha,

Bole jabo, “Ami jai, rekhe jai, mor valobasha.’

 

কবিতার মূল ভাব ও চরণ বিশ্লেষণ

কবিতাটির মূল ভাব আবর্তিত হয়েছে জীবনের সায়াহ্নে এসে জাগতিক কর্মযজ্ঞ থেকে চিরস্থায়ী মুক্তি লাভের এক গভীর আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে। কবি তাঁর জন্মদিনের আবর্তনকে জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত হওয়ার একটি প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। দীর্ঘ জীবনজুড়ে তিনি যে নিরলস তপস্যা বা কর্ম করেছেন, এখন তিনি তা থেকে স্বেচ্ছায় নিষ্কৃতি চান। তাঁর কাছে প্রকৃতির শ্যামল ও শান্তিময় পরিবেশ অনেক বেশি কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠেছে। তিনি চান এই পৃথিবীর ধুলো, ফুল, পাখির গান আর প্রকৃতির সহজ আতিথ্যকে আপন করে নিতে। জীবনের শেষ বেলায় এসে তিনি সমস্ত জাগতিক কর্ম, তর্ক, সন্দেহ আর খ্যাতির মোহ ত্যাগ করে কেবল এক বুক বিশুদ্ধ ভালোবাসা রেখে যেতে চান। এটি মূলত এক আত্মত্যাগী ও প্রশান্ত মনের শাশ্বত দার্শনিক উপলব্ধি।

ছন্দ ও শব্দশৈলীর দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতায় এক অপূর্ব নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন। কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দের এক মুক্ত ও প্রবহমান রূপ অনুসরণ করেছে, যা কবির স্বাধীন ও নির্লিপ্ত মনোভাবের সাথে চমৎকারভাবে মানিয়ে গেছে। রুদ্রের মালা রুদ্রাক্ষের, বাণীবহ্নি, বিরামসমুদ্রতটে শব্দগুলো কবিতার গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। উপমা এবং রূপকের সার্থক ব্যবহার যেমন জীবনের পরমসন্ধ্যায় বা বিশ্বরসসরোবরে কবিতাকে এক গভীর দার্শনিক ও চিত্ররূপময় মাত্রা দান করেছে, যা আপনাকে সহজেই মুগ্ধ করবে।

এই কবিতাটি পাঠকের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও বৈরাগ্যের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। জীবনের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় লীন হওয়ার যে আকুতি কবি প্রকাশ করেছেন, তা যে কোনো চিন্তাশীল মানুষের মনকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। বিশেষ করে কবিতার শেষ চরণগুলো— বলে যাব, ‘আমি যাই, রেখে যাই, মোর ভালোবাসা’— পাঠকের চোখে বিষাদের জল এনে দেয়। এটি শুধুমাত্র একজন কবির বিদায়বার্তা নয়, বরং এটি সমগ্র মানবজাতির প্রতি এক শাশ্বত প্রেমের বার্তা। এই চিরন্তন আবেদনের কারণেই কবিতাটি সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য সৃষ্টি হিসেবে আজও সমাদৃত।

উৎস (Sources)

কবিতাটির মূল পাঠ এবং কবি সম্পর্কিত তথ্যাবলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অফিশিয়াল গ্রন্থাবলি রবীন্দ্র রচনাবলী এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য আর্কাইভ থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই করা হয়েছে। পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সংস্করণ ও প্রামাণ্য সাহিত্য কোষগুলোর সাথে মিলিয়ে কবিতাটির বিশুদ্ধতা ও বানানরীতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

Amar Rabindranath Logo

মন্তব্য করুন