রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতবিতান’-এর প্রেম পর্যায়ের (গান নং ৬) অন্তর্ভুক্ত এক পরম আত্মনিবেদনমূলক গান “তোমায় গান শোনাব”। ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৯ ফাল্গুন (১৩ মার্চ ১৯২৩) শান্তিনিকেতনে রচিত এই গানটিতে পরমাত্মা ও পরমেশ্বরের সাথে সাধকের সুগভীর ও সুরময় সম্পর্কের রূপায়ণ ঘটেছে। জীবনের প্রাত্যহিক ব্যস্ততা ও অচেতনের মাঝে ঈশ্বর কীভাবে বিরহ ও বেদনার দোলা দিয়ে মানুষকে জাগিয়ে রাখেন, গানটিতে সেই ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়েছে।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| গানের নাম | তোমায় গান শোনাব |
| গীতিকার / রচয়িতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| সুরকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| পর্যায় | প্রেম (গান নং ৬) |
| মূল উপজীব্য | আধ্যাত্মিক জাগরণ, অনুযোগ ও পরমেশ্বরে সমর্পণ |
| রাগ | পিলু |
| তাল | কাহারবা |
| রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) | ২৯ ফাল্গুন, ১৩২৯ |
| রচনাকাল (খ্রিস্টাব্দ) | ১৩ মার্চ, ১৯২৩ |
| রচনাস্থান | শান্তিনিকেতন |
| গ্রন্থ / সংকলন | গীতবিতান, স্বরবিতান |
তোমায় গান শোনাব গানের লিরিক
তোমায় গান শোনাব:
তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ
ওগো ঘুম-ভাঙানিয়া
বুকে চমক দিয়ে তাই তো ডাক’
ওগো দুখজাগানিয়া ॥
এল আঁধার ঘিরে, পাখি এল নীড়ে,
তরী এল তীরে
শুধু আমার হিয়া বিরাম পায় নাকো
ওগো দুখজাগানিয়া ॥
আমার কাজের মাঝে মাঝে
কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে।
আমার পরশ ক’রে প্রাণ সুধায় ভ’রে
তুমি যাও যে সরে–
বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাক
ওগো দুখজাগানিয়া ॥
Tomay gan shonabo Romanized Lyrics
Tomay gan shonabo tai to amay jagiye rakh
Ogo ghum-bhanganiya
Buke chomok diye tai to dak’
Ogo dukh-jaganiya ॥
El andhar ghire, pakhi el nire,
Tori el tire
Shudhu amar hiya biram pay nako
Ogo dukh-jaganiya ॥
Amar kajer majhe majhe
Kannahasir dola tumi thamte dile na je।
Amar porosh k’ore pran sudhay bh’ore
Tumi jao je sore—
Bujhi amar byathar aralete dariye thak
Ogo dukh-jaganiya ॥
গানের মূল ভাব
“তোমায় গান শোনাব” গানটির মূল নির্যাস হলো অলস ঘুম বা জাগতিক স্থবিরতা ভেঙে আধ্যাত্মিক জাগরণ লাভ করা। প্রাত্যহিক জীবনে মানুষ বৈষয়িক কর্মে ডুবে গিয়ে এক ধরণের আত্মতুষ্টি বা অলস ঘুমে আচ্ছন্ন হয়। কিন্তু পরমেশ্বর সাধককে সেই অলস ঘুমে শান্তিতে থাকতে দেন না। তিনি বেদনার দোলা ও চমক দিয়ে হৃদয়কে জাগিয়ে রাখেন, যাতে ভক্ত সুরের মাধ্যমে তাঁর চরণে নিজেকে নিবেদন করতে পারেন। এখানে ‘দুঃখ’ বা ‘বেদনা’ কোনো নেতিবাচক অনুভূতি নয়, বরং ভক্তের আত্মাকে জাগিয়ে রাখার জন্য ঈশ্বরের কৃপাময় স্পর্শ।
চরণ ও স্তবক বিশ্লেষণ
১. জাগরণ ও দুখজাগানিয়ার আহ্বান
- “তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ / ওগো ঘুম-ভাঙানিয়া”ঈশ্বরকে এখানে ‘ঘুম-ভাঙানিয়া’ ও ‘দুখজাগানিয়া’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। সুখে আচ্ছন্ন মানুষ যখন ঈশ্বরকে ভুলে যায়, তখন দুঃখ ও বিরহ এসে মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করে। কবি উপলব্ধি করেছেন যে, তাঁকে দিয়ে সুরের আরাধনা করিয়ে নেওয়ার জন্যই ঈশ্বর তাঁর হৃদয়ে অনুভূতির ঝড় তোলেন।
২. প্রকৃতির বিশ্রাম ও হৃদয়ের চঞ্চলতা
- “এল আঁধার ঘিরে, পাখি এল নীড়ে, তরী এল তীরে / শুধু আমার হিয়া বিরাম পায় নাকো”সন্ধ্যা নামলে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে পাখিরা নীড়ে ফেরে এবং তরী তীরে ভেড়ে। কিন্তু ঈশ্বরের বিরহবেদনায় ব্যাকুল ভক্তের হৃদয় শান্ত হতে পারে না। এই অদম্য চঞ্চলতাই পরম সত্তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়।
৩. বেদনার আড়ালে পরম উপস্থিতি
- “আমার কাজের মাঝে মাঝে কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে”সংসারের প্রাত্যহিক কাজের মধ্যেও কান্নাহাসির আলো-ছায়া দোলা দেয়। ঈশ্বর করুণার স্পর্শ দিয়ে আপাতদৃষ্টিতে সরে দাঁড়ালেও, কবি অনুধাবন করেন যে ঈশ্বর হারিয়ে যাননি; তিনি আসলে ভক্তের ব্যথার আড়ালেই গোপন নীরবতায় দাঁড়িয়ে আছেন।
গানের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য
- শব্দচয়ন ও রূপক: ‘ঘুম-ভাঙানিয়া’ ও ‘দুখজাগানিয়া’-র মতো সুনিপুণ ও ভাবগম্ভীর শব্দবন্ধ ব্যবহারে ঈশ্বরের প্রতি এক মিষ্টি অনুযোগ প্রকাশ পেয়েছে।
- প্রকৃতির সাথে তুলনা: সন্ধ্যার আঁধারে নীড়ে ফেরা পাখি ও তীরে ভেড়া নৌকার সাথে নিঃসঙ্গ হৃদয়ের তুলনা করে বৈপরীত্যের সুন্দর চিত্রকল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
- কাব্যিক সুষমতা: প্রাত্যহিক কর্মজীবন এবং অন্তরের আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতার দ্বন্দ্ব ও মিলনকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
- রাগ পিলুর প্রয়োগ: গানটি ‘পিলু’ রাগে নিবদ্ধ। পিলু রাগের করুণ, স্নিগ্ধ ও মিষ্টি ভাবগানটি ভক্তের আকুলতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।
- তাল কাহারবা: ৪।৪ ছন্দের দ্রুত প্রবহমান ‘কাহারবা’ তালের চঞ্চল লয় গানের কথার সাথে সামঞ্জস্য রেখে জীবনের গতিশীলতা ও হৃদয়ের স্পন্দনকে নির্দেশ করে।
রচনাপ্রেক্ষিত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৯ ফাল্গুন (১৩ মার্চ ১৯২৩) শান্তিনিকেতনে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানটি রচনা করেন। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে রচিত তাঁর পূজা ও প্রেম পর্যায়ের গানগুলোর মধ্যে আত্মানুসন্ধান ও ভক্তিভাবের এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়। রবীন্দ্রসংগীতের বিশ্বস্ত অনুরাগী ও গায়কদের কাছে এটি সর্বকালের অন্যতম প্রিয় ও গভীর সৃষ্টি হিসেবে সমাদৃত।
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গীতবিতান (প্রেম পর্যায়, গান নং ৬), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী প্রকাশন বিভাগ।
- স্বরবিতান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
- Tagoreweb Digital Archive, প্রামাণ্য রবীন্দ্রসংগীত তথ্যভাণ্ডার।
