রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতবিতান’-এর পূজা পর্যায়ের (গান নং ৫৫৩) অন্তর্ভুক্ত এক প্রাণবন্ত ও জীবনমুখী গান “তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে”। ১৩২১ বঙ্গাব্দের ১৭ ভাদ্র (৩ সেপ্টেম্বর ১৯১৪) শান্তিনিকেতনে গানটি রচিত হয় এবং পরবর্তীতে কবির ‘গীতালি’ কাব্যগ্রন্থে স্থান পায়। সাধারণ শান্ত ভক্তিগীতির আবহ ছাড়িয়ে এই গানে এক দূরন্ত স্পর্ধা, বাঁধন ভাঙার আনন্দ এবং পরম সত্তার প্রেমে নিঃশেষে ভেসে যাওয়ার অদম্য আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। বাংলার লোকসংগীতের বিশেষ অঙ্গ ‘সারিগান’ এবং ‘বাউল’ সুরের চালে নিবদ্ধ এই গানটি জড়তা ও সংকীর্ণতা মুছে ফেলে জীবনের মহাতরঙ্গে ঝাঁপ দেওয়ার এক অনন্য আহ্বান।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| গানের নাম | তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে |
| গীতিকার / রচয়িতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| সুরকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| পর্যায় | পূজা (গান নং ৫৫৩) |
| উপ-পর্যায় / অঙ্গ | বাউল / সারিগান |
| তাল | কাহারবা (৪/৪ ছন্দ) |
| রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) | ১৭ ভাদ্র, ১৩২১ (বিকাল) |
| রচনাকাল (খ্রিস্টাব্দ) | ৩ সেপ্টেম্বর, ১৯১৪ |
| রচনাস্থান | শান্তিনিকেতন |
| স্বরলিপিকার | সুধীরচন্দ্র কর |
| গ্রন্থ / সংকলন | গীতালি, স্বরবিতান ৪৩ |
সম্পূর্ণ বাংলা লিরিক
তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে টুকরো করে কাছি
আমি ডুবতে রাজি আছি আমি ডুবতে রাজি আছি ॥
সকাল আমার গেল মিছে, বিকেল যে যায় তারি পিছে গো–
রেখো না আর, বেঁধো না আর কূলের কাছাকাছি ॥
মাঝির লাগি আছি জাগি সকল রাত্রিবেলা,
ঢেউগুলো যে আমায় নিয়ে করে কেবল খেলা।
ঝড়কে আমি করব মিতে, ডরব না তার ভ্রূকুটিতে–
দাও ছেড়ে দাও, ওগো, আমি তুফান পেলে বাঁচি ॥
Romanized Bengali Lyrics
Tomar khola hawa lagiye pale tukro kore kachi
Ami dubte raji achi ami dubte raji achi.
Shokal amar gelo miche, bikel je jay tari piche go–
Rekho na ar, bedho na ar kuler kachakachi.
Majhir lagi achi jagi shokol ratribela,
Dheugulo je amay niye kore kebol khela.
Jhor-ke ami korbo mite, dorbo na tar bhrukutite–
Dao chere dao, ogo, ami tufan pele bachi.
গানের মূল ভাব
“তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে” গানটি মূলত জীবন-নৌকাকে ঈশ্বরের অপার করুণার হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়ার এক অভয় বাণী। জাগতিক জীবনের নিরাপদ কূল, ছোটখাটো সামাজিক ছক এবং সংকীর্ণতার বাঁধনকে কবি ‘কাছি’ (নৌকার দড়ি) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মানুষের জীবনের সিংহভাগ সময় কেটে যায় কূলের কাছাকাছি নিরাপদে থাকার ব্যর্থ চেষ্টায়। কিন্তু আত্মিক মুক্তি বা ঈশ্বরের সান্নিধ্য পেতে হলে নিরাপদ তীরের মায়া ত্যাগ করে ঝোড়ো সাগরে পাড়ি দিতে হয়।
গানের মূল বার্তা হলো—ঈশ্বরের প্রেমানন্দে বিলীন হওয়ার ঝুঁকি নিতে না পারলে জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানে ‘ডুবে যাওয়া’ কোনো ধ্বংসের প্রতীক নয়, বরং জাগতিক অহংকার মুছে ফেলে পরমেশ্বরের মাঝে নিজের সত্তাকে বিলীন করে দেওয়ার এক আনন্দময় রূপক। প্রতিকূলতা বা ‘ঝড়’-কে ভয় না পেয়ে তাকে মিত্র করে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে আত্মার পরম মুক্তি।
চরণ ও স্তবক বিশ্লেষণ
১. বাঁধন ছেঁড়া ও সর্বস্ব সমর্পণ
- “তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে টুকরো করে কাছি / আমি ডুবতে রাজি আছি আমি ডুবতে রাজি আছি ॥”‘খোলা হাওয়া’ হলো ঐশ্বরিক স্বাধীনতা ও কৃপার প্রতীক, আর ‘কাছি’ হলো জাগতিক মোহ ও নিরাপত্তার বন্ধন। পালে যখন বিশ্বাসের বাতাস লাগে, তখন কূলের সাথে বেঁধে রাখা কাছি কেটে ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না। ঈশ্বরের গভীর প্রেমে নিজেকে সঁপে দেওয়ার জন্য ডুবতে রাজি থাকার এই জোরালো পুনরাবৃত্তি ভক্তের পরম সাহসের পরিচয় দেয়।
২. অপচয়িত সময়ের অনুশোচনা ও কূলত্যাগের আকুতি
- “সকাল আমার গেল মিছে, বিকেল যে যায় তারি পিছে গো– / রেখো না আর, বেঁধো না আর কূলের কাছাকাছি ॥”মানুষের জীবনের শৈশব ও যৌবন (‘সকাল’) পার হয়ে যখন প্রৌঢ়ত্ব বা জীবনের শেষভাগ (‘বিকেল’) ঘনিয়ে আসে, তখন মানুষ উপলব্ধি করে যে এতদিন নিরাপদ তীরের মায়ায় থেকে আসল জীবনটাই যাপন করা হয়নি। তাই জীবনের অবশিষ্ট সময়ে আর নিরাপদ কূলের কাছাকাছি থমকে না থেকে অসীমের উদ্দেশ্যে ভেসে যাওয়ার জন্য হৃদয় আকুল হয়ে ওঠে।
৩. মাঝির অপেক্ষা ও তরঙ্গের খেলা
- “মাঝির লাগি আছি জাগি সকল রাত্রিবেলা / ঢেউগুলো যে আমায় নিয়ে করে কেবল খেলা।”এখানে ‘মাঝি’ হলেন পরমেশ্বর বা গুরু। ভবের সাগরে একাকী তরণী ভাসিয়ে পুরো ‘রাত্রিবেলা’ (অজ্ঞতার কাল বা সারাজীবন) ভক্ত পথপ্রদর্শকের আশায় জেগে থাকেন। নদীর ঢেউগুলো যেমন নৌকাকে দোলা দেয়, জীবনের সুখ-দুঃখের রূপক তরঙ্গগুলোও মানুষকে নিয়ে কেবল খেলা করে।
৪. ঝড়ের সাথে বন্ধুত্ব ও তুফানের আহ্বান
- “ঝড়কে আমি করব মিতে, ডরব না তার ভ্রূকুটিতে– / দাও ছেড়ে দাও, ওগো, আমি তুফান পেলে বাঁচি ॥”পার্থিব সংকট বা বিপর্যয়কে এখানে ‘ঝড়’ ও ‘তুফান’ বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষ ঝড়কে ভয় পায়, কিন্তু আধ্যাত্মিক অভিযাত্রী সেই ঝড়কেই বন্ধু (‘মিতে’) করে নেন। ঝড়ের ভ্রূকুটি বা তর্জন-গর্জন আত্মাকে দমাতে পারে না। স্থবির ও অলস জীবনের চেয়ে ঝোড়ো হাওয়ার প্রচ্ছায়ায় বেঁচে থাকার মাঝেই তিনি জীবনের পরম স্পন্দন খুঁজে পান।
গানের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য
- নৌকা ও নদীর রূপক: গানটিতে রূপক অলংকারের চমৎকার ব্যবহার রয়েছে। ‘পাল’, ‘কাছি’, ‘কূল’, ‘মাঝি’, ‘ঢেউ’ এবং ‘তুফান’—প্রতিটি শব্দই মানবজীবন এবং আধ্যাত্মিক যাত্রার একেকটি ভিন্ন মাত্রাকে নির্দেশ করে।
- শব্দচয়ন ও ব্যঞ্জনা: ‘টুকরো করে কাছি’, ‘ভ্রূকুটি’, এবং ‘মিতে’-র মতো শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে চরণের ভেতরে গতিশীলতা ও নাটకీయতা তৈরি করা হয়েছে।
- ছন্দ ও বৈপরীত্য: গানে স্পষ্ট একটি বৈপরীত্য রয়েছে—একদিকে কূলের নিরাপত্তা ও স্থবিরতা, অন্যদিকে তুফানের অনিশ্চয়তা ও জীবনসংগ্রাম। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে অনিশ্চয়তা ও অসীমকেই বরণ করে নেওয়া হয়েছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
- অঙ্গ ও সুরের ধরন: গানটি বাংলার লোকসংগীতের বিশেষ ধারা ‘সারিগান’ এবং ‘বাউল’ অঙ্গের সুরের সমন্বয়ে রচিত। মাঝিদের নদী পারাপারের নৌকা বাওয়ার ছন্দ ও প্রবহমানতা গানের সুর কাঠামোতে স্পষ্ট।
- তাল: ৪।৪ মাত্রার চঞ্চল ‘কাহারবা’ তালে গানটি নিবদ্ধ। দ্রুত ও সাবলীল লয় থাকার কারণে গানটির মধ্যে এক ধরণের দোলা এবং বাঁধনভাঙা উদ্দীপনা অনুভূত হয়।
- স্বরলিপি: গানটির স্বরলিপিকার সুধীরচন্দ্র কর। বিশ্বভারতী প্রকাশিত ‘স্বরবিতান’-এর ৪৩তম খণ্ডে গানটির প্রামাণ্য স্বরলিপি সংরক্ষিত রয়েছে।
রচনাপ্রেক্ষিত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
১৩২১ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে শান্তিনিকেতনে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ গানটি রচনা করেন। এই সময়কালে লেখা গানগুলো তাঁর ‘গীতালি’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা এবং তৎকালীন বৈশ্বিক উত্তাল পরিস্থিতির নিরিখে এই গানে যে ভয়হীনতা ও ঝড়ের মুখোমুখি হওয়ার বাণী ফুটে উঠেছে, তা কেবল ব্যক্তিগত ভক্তির প্রকাশ নয়, বরং সার্বজনীন মানবীয় সাহসেরও প্রতীক। আধুনিক যুগে বাংলা রবীন্দ্রসংগীতের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ও উদ্দীপনামূলক গান হিসেবে এটি পরিবেশিত হয়ে আসছে।
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গীতবিতান (পূজা পর্যায়, গান নং ৫৫৩), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী প্রকাশন বিভাগ।
- গীতালি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (রচনাকাল: ১৭ ভাদ্র, ১৩২১, শান্তিনিকেতন)।
- স্বরবিতান (খণ্ড ৪৩), স্বরলিপিকার: সুধীরচন্দ্র কর, বিশ্বভারতী প্রকাশন।
- Tagoreweb Digital Archive, প্রামাণ্য রবীন্দ্রসংগীত তথ্যভাণ্ডার।
