রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘চিত্রা’ কাব্যগ্রন্থের দারুণ একটি কবিতা হলো এই ‘দুরাকাঙ্ক্ষা’। মাত্র কয়েকটি লাইনের এই ছোট কবিতাটির আড়ালে কবিগুরু আমাদের জীবনের মস্ত বড় একটা সত্যি কথা খুব সহজ করে মনে করিয়ে দিয়েছেন।
আমাদের জীবনে এমন অনেক কিছু থাকে, যাকে আমরা বড্ড বেশি ভালোবেসে ফেলি। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন হারানোর ভয়ে সেই প্রিয় জিনিসটাকে আমরা একদম শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে যাই। আমাদের সেই অতিরিক্ত মাখামাখি আর জোর করে ধরে রাখার স্বভাবের কারণেই একসময় প্রিয় জিনিসটা আমাদের হাত থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়।
এই সত্যটাই কবি এখানে চারটি খুব চেনা উদাহরণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। বাতি যেন না নেভে, তাই অতিরিক্ত যত্ন নিয়ে ঢাকতে গিয়ে বাতিটি নিজেই নিভে গেল। ঝরে যাওয়ার ভয়ে ফুলটিকে বুকে শক্ত করে চেপে ধরা হলো, আর সেই চাপেই নরম ফুলটি ঝরে গেল। নদীকে সারাজীবন নিজের কাছে আটকে রাখার জন্য বাঁধ দেওয়া হলো, আর তাতেই নদীর স্রোতটা মরে গেল। ঠিক তেমনি, সেতারে খুব বেশি আবেগ দিয়ে জোরে আঘাত করতেই তারটি ছিঁড়ে গেল।
রবীন্দ্রনাথের এই ‘দুরাকাঙ্ক্ষা’ কবিতাটি আমাদের খুব সহজ একটা জীবনবোধ শেখায়। তা হলো—কাউকে ভালোবাসা বা কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছা থাকা ভালো, কিন্তু তা যখন জোরজুলুম বা অন্ধ মোহ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে। জীবন আর চারপাশের সুন্দর জিনিসগুলোকে জোর করে খাঁচায় বন্দি না করে, তাদের নিজের গতিতে ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃত ভালোবাসার লক্ষণ।
দুরাকাঙ্ক্ষা কবিতা (Durakhankka Kobita) – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । চিত্রা কাব্যগ্রন্থ (১৮৯৬)
কেন নিবে গেল বাতি?
আমি অধিক যতনে ঢেকেছিনু তারে
জাগিয়া বাসররাতি,
তাই নিবে গেল বাতি।
কেন ঝরে গেল ফুল?
আমি বক্ষে চাপিয়া ধরেছিনু তারে
চিন্তিত ভয়াকুল,
তাই ঝরে গেল ফুল।
কেন মরে গেল নদী?
আমি বাঁধ বাঁধি তারে চাহি ধরিবারে
পাইবারে নিরবধি-
তাই মরে গেল নদী।
কেন ছিঁড়ে গেল তার?
আমি অধিক আবেগে প্রাণপণ বলে
দিয়েছিনু ঝঙ্কার-
তাই ছিঁড়ে গেল তার।
আরও দেখুন:
