“দোলা” কবিতাটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। ছবি ও গান গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের কাব্যসৃষ্টির এমন এক পর্যায়ের প্রতিনিধি, যেখানে দৃশ্যকল্প, সংগীতধর্মী ছন্দ ও চিত্রময় ভাষা মিলিত হয়ে কবিতাকে প্রায় চিত্রকলার স্তরে উন্নীত করেছে। এই গ্রন্থের কবিতাগুলিতে প্রকৃতি, আলো-ছায়া, গতি ও অনুভূতির দোলাচল অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পেয়েছে। “দোলা” কবিতায় নদী, গাছের ছায়া, আলো, সন্ধ্যার রং এবং যুগল-চেতনার আবেশ একত্রে মিশে এক স্বপ্নিল, নীরব ও অন্তরঙ্গ জগত নির্মাণ করেছে। কবিতাটি কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্যবর্ণনা নয়—এ এক ধ্যানমগ্ন মুহূর্ত, যেখানে সময় থেমে যায়, শব্দ লুপ্ত হয়, আর ভালোবাসা ও প্রকৃতি একই দোলনায় দুলতে থাকে।
দোলা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঝিকিমিকি বেলা;
গাছের ছায়া কাঁপে জলে,
সোনার কিরণ করে খেলা।
দুটিতে দো’লার ‘পরে দোলে রে,
দেখে রবির আঁখি ভোলে রে।
গাছের ছায়া চারি দিকে আঁধার করে রেখেছে,
লতাগুলি আঁচল দিয়ে ঢেকেছে।
ফুল ধীরে ধীরে মাথায় পড়ে,
পায়ে পড়ে, গায়ে পড়ে,
থেকে থেকে বাতাসেতে ঝুরু ঝুরু পাতা নড়ে।
নিরালা সকল ঠাঁই,
কোথাও সাড়া নাই,
শুধু নদীটি বহে যায় বনের ছায়া দিয়ে,
বাতাস ছুঁয়ে যায় লতারে শিহরিয়ে।
দুটিতে বসে বসে দোলে,
বেলা কোথায় গেল চলে।
হেরো, সুধামুখী মেয়ে
কী চাওয়া আছে চেয়ে
মুখানি থুয়ে তার বুকে।
কী মায়া মাখা চাঁদমুখে।হাতে তার কাঁকন দুগাছি,
কানেতে দুলিছে তার দুল,
হাসি-হাসি মুখখানি তার
ফুটেছে সাঁঝের জুঁই ফুল।
গলেতে বাহু বেঁধে
দুজনে কাছাকাছি–
দুলিছে এলো চুল,
দুলিছে মালাগাছি।
আঁধার ঘনাইল,
পাখিরা ঘুমাইল,
সোনার রবি-আলো আকাশে মিলাইল।
মেঘেরা কোথা গেল চলে,
দুজনে বসে বসে দোলে।
ঘেঁষে আসে বুকে বুকে,
মিলায়ে মুখে মুখে
বাহুতে বাঁধি বাহুপাশ,
সুধীরে বহিতেছে শ্বাস।
মাঝে মাঝে থেকে থেকে
আকাশেতে চেয়ে দেখে,
গাছের আড়ালে দুটি তারা।
প্রাণ কোথা উড়ে যায়,
সেই তারাপানে ধায়,
আকাশের মাঝে হয় হারা।
পৃথিবী ছাড়িয়া যেন তা’রা
দুটিতে হয়েছে দুটি তারা।
![ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের দোলা কবিতা - [ Dolaa Kobita ] 1 দোলা dolaa [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/দোলা-dolaa-কবিতা-.gif)