বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ (১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম সুরময়, চিত্ররূপময় ও প্রলয়ধর্মী গীতি-কবিতা হলো ‘নদীপথে’। এই কবিতায় বর্ষার এক ভয়ংকর ঝোড়ো রাতে নদীর বুকে নৌকার যাত্রা, প্রকৃতির তান্ডব এবং ঘরের কোণে একা জেগে থাকা এক প্রিয়মুখের (প্রিয়াসীর) উৎকণ্ঠার এক অপূর্ব ও জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | নদীপথে |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সোনার তরী |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৪ (১২০১ বঙ্গাব্দ) / মানসী-সোনার তরী পর্ব |
| কবিতার ধরন | প্রকৃতি-নির্ভর ও বিরহ-চেতনামূলক গীতি-কবিতা (Nature-conscious and Romantic Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থে প্রকৃতির ভয়াল রূপ এবং মানবহৃদয়ের সূক্ষ্ম অনুভূতির এক অনন্য মিশ্রণ ঘটেছে। ‘নদীপথে’ কবিতায় এক ঝোড়ো বৃষ্টির রাতে নদীর ধারে তরী বেঁধে একা বসে থাকার দৃশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। বাইরে যখন মেঘের গর্জন, তীব্র বাতাস এবং বিদ্যুতের চমক সমগ্র আকাশকে তছনছ করে দিচ্ছে, ঠিক তখন কবির মনে পড়ে ঘরে একা জেগে থাকা সেই প্রিয় মুখটির কথা—যে ঝড়ের ভয় থরথর করে কাঁপছে এবং প্রদীপের আলোয় জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রকৃতি ও মানবমনের এই নিবিড় সংযোগ কবিতাকে এক দারুণ নাটকীয়তা দান করেছে।
নদীপথে কবিতা (সম্পূর্ণ)
নদীপথে
গগন ঢাকা ঘন মেঘে,
পবন বহে খর বেগে।
অশনি ঝনঝন
ধ্বনিছে ঘন ঘন,
নদীতে ঢেউ উঠে জেগে।
পবন বহে খর বেগে।
তীরেতে তরুরাজি দোলে
আকুল মর্মর-রোলে।
চিকুর চিকিমিকে
চকিয়া দিকে দিকে
তিমির চিরি যায় চলে।
তীরেতে তরুরাজি দোলে।
ঝরিছে বাদলের ধারা
বিরাম-বিশ্রামহারা।
বারেক থেমে আসে,
দ্বিগুণ উচ্ছ্বাসে
আবার পাগলের পারা
ঝরিছে বাদলের ধারা।
মেঘেতে পথরেখা লীন,
প্রহর তাই গতিহীন।
গগন-পানে চাই,
জানিতে নাহি পাই
গেছে কি নাহি গেছে দিন;
প্রহর তাই গতিহীন।
তীরেতে বাঁধিয়াছি তরী,
রয়েছি সারা দিন ধরি।
এখনো পথ নাকি
অনেক আছে বাকি,
আসিছে ঘোর বিভাবরী।
তীরেতে বাঁধিয়াছি তরী।
বসিয়া তরণীর কোণে
একেলা ভাবি মনে মনে–
মেঝেতে শেজ পাতি
সে আজি জাগে রাতি,
নিদ্রা নাহি দুনয়নে।
বসিয়া ভাবি মনে মনে।
মেঘের ডাক শুনে কাঁপে,
হৃদয় দুই হাতে চাপে।
আকাশ-পানে চায়,
ভরসা নাহি পায়,
তরাসে সারা নিশি যাপে,
মেঘের ডাক শুনে কাঁপে।
কভু বা বায়ুবেগভরে
দুয়ার ঝনঝনি পড়ে।
প্রদীপ নিবে আসে,
ছায়াটি কাঁপে ত্রাসে,
নয়নে আঁখিজল ঝরে,
বক্ষ কাঁপে থরথরে।
চকিত আঁখি দুটি তার
মনে আসিছে বার বার।
বাহিরে মহা ঝড়,
বজ্র কড়মড়,
আকাশ করে হাহাকার।
মনে পড়িছে আঁখি তার।
গগন ঢাকা ঘন মেঘে,
পবন বহে খর বেগে।
অশনি ঝনঝন
ধ্বনিছে ঘন ঘন,
নদীতে ঢেউ উঠে জেগে।
পবন বহে আজি বেগে।
নদীপথে কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
প্রকৃতির তান্ডব ও নদীপথের নির্জনতা:
“গগন ঢাকা ঘন মেঘে, / পবন বহে খর বেগে। / অশনি ঝনঝন / ধ্বনিছে ঘন ঘন, / নদীতে ঢেউ উঠে জেগে।”
— আকাশ মেঘে ঢাকা, তীব্র বাতাসে নদী উত্তাল এবং ঘন ঘন বজ্রপাতের শব্দে চারপাশের প্রকৃতি এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।
দিনের দীর্ঘতা ও তরী বাঁধার ক্লান্তি:
“মেঘেতে পথরেখা লীন, / প্রহর তাই গতিহীন। /… তীরেতে বাঁধিয়াছি তরী, / রয়েছি সারা দিন ধরি।”
— বৃষ্টির ধারা আর মেঘের অন্ধকারে দিন-রাতের ঠিকানাও যেন হারিয়ে গেছে। নদীর তীরে তরী বেঁধে সারা দিন ধরে অপেক্ষার প্রহর কাটছে।
ঘরে একা জেগে থাকা প্রিয়মুখের উৎকণ্ঠা:
“বসিয়া তরণীর কোণে / একেলা ভাবি মনে মনে– / মেঝেতে শেজ পাতি / সে আজি জাগে রাতি, / নিদ্রা নাহি দুনয়নে।”
— নদীর বুকে একা বসে কবির মনে পড়ছে ঘরের কথা। বাইরে যখন মহা ঝড় ও বজ্রপাতের হাহাকার, তখন ঘরে একা শুয়ে থাকা প্রিয়তমা ভয় ও আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। প্রদীপের আলো কাঁপছে, আর তার চোখের জল ও বক্ষ থরথর করে কাঁপছে—এই ছবি কবির মনকে ব্যাকুল করে তোলে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।










