বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পলাতকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম স্নিগ্ধ, আনন্দময় ও পারিবারিক সম্পর্কের মধুর রসযুক্ত কবিতা হলো ‘ঠাকুরদাদার ছুটি’। ১৯১৮ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় প্রকৃতির উন্মুক্ত ছুটির সাথে একটি শিশুর দুরন্তপনা এবং এক বৃদ্ধ দাদামশাইয়ের যান্ত্রিক জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে নাতির সাথে একাত্ম হওয়ার এক অপূর্ব আনন্দ রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ঠাকুরদাদার ছুটি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পলাতকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৮ (১৩২৫ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক লিরিক কবিতা (Family-oriented Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯১৮ সালে প্রকাশিত ‘পলাতকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অনন্য সৃষ্টি, যেখানে সাধারণ মানুষের গার্হস্থ্য জীবন, পারিবারিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম অনুভূতি এবং মানবজীবনের বিভিন্ন পর্যায় অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ছন্দে ফুটে উঠেছে। ‘ঠাকুরদাদার ছুটি’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন কীভাবে চারপাশের প্রকৃতিতে অবারিত ছুটি বিরাজ করছে, অথচ চশমাধারী বুড়ো ঠাকুরদাদা বিষয়-কাজের জালে বন্দী। কিন্তু যখনই ছোট্ট শিশুটি এসে গলা জড়িয়ে ধরে বা কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন বৃদ্ধ দাদামশাইয়ের যান্ত্রিক জীবনের সব হিসাব-নিকাশ দূরে সরে গিয়ে এক অসীম মুক্তির আনন্দ জেগে ওঠে।
ঠাকুরদাদার ছুটি – সম্পূর্ণ কবিতা
তোমার ছুটি নীল আকাশে,
তোমার ছুটি মাঠে,
তোমার ছুটি থইহারা ঐ
দিঘির ঘাটে ঘাটে।
তোমার ছুটি তেঁতুলতলায়,
গোলাবাড়ির কোণে,
তোমার ছুটি ঝোপেঝাপে
পারুলডাঙার বনে।
তোমার ছুটির আশা কাঁপে
কাঁচা ধানের খেতে,
তোমার ছুটির খুশি নাচে
নদীর তরঙ্গেতে।
আমি তোমার চশমাপরা
বুড়ো ঠাকুরদাদা,
বিষয়-কাজের মাকড়সাটার
বিষম জালে বাঁধা।
আমার ছুটি সেজে বেড়ায়
তোমার ছুটির সাজে,
তোমার কণ্ঠে আমার ছুটির
মধুর বাঁশি বাজে।
আমার ছুটি তোমারি ঐ
চপল চোখের নাচে,
তোমার ছুটির মাঝখানেতেই
আমার ছুটি আছে।
তোমার ছুটির খেয়া বেয়ে
শরৎ এল মাঝি।
শিউলি-কানন সাজায় তোমার
শুভ্র ছুটির সাজি।
শিশির-হাওয়া শিরশিরিয়ে
কখন রাতারাতি
হিমালয়ের থেকে আসে
তোমার ছুটির সাথি।
আশ্বিনের এই আলো এল
ফুল-ফোটানো ভোরে
তোমার ছুটির রঙে রঙিন
চাদরখানি প’রে।
আমার ঘরে ছুটির বন্যা
তোমার লাফে-ঝাঁপে;
কাজকর্ম হিসাবকিতাব
থরথরিয়ে কাঁপে।
গলা আমার জড়িয়ে ধর,
ঝাঁপিয়ে পড় কোলে,
সেই তো আমার অসীম ছুটি
প্রাণের তুফান তোলে।
তোমার ছুটি কে যে জোগায়
জানে নে তার রীত,
আমার ছুটি জোগাও তুমি,
ঐখানে মোর জিত।
ঠাকুরদাদার ছুটি Romanized Version
Tomar chhuti nil akashe,
Tomar chhuti mathe,
Tomar chhuti thoirhara oi
Dighir ghate ghate.
Tomar chhuti tetultolay,
Golabari-r kone,
Tomar chhuti jhope-zhape
Paruldangar bone.
Tomar chutir asha kape
Kacha dhaner kheete,
Tomar chutir khushi nache
Nodir torongete.
Ami tomar choshmapora
Buro thakurdada,
Bishoy-kajer makrorshtar
Bishom jale bandha.
Amar chhuti seje beray
Tomar chutir saje,
Tomar konthe amar chutir
Modhur bashi baje.
Amar chhuti tomari oi
Chopol chokher nache,
Tomar chutir majhkhane-tei
Amar chhuti ache.
Tomar chutir kheya beye
Shorot elo majhi.
Shiuli-kanon sajay tomar
Shubhro chutir saji.
Shishir-hawa shirshiriye
Kokhon ratarati
Himaloyer theke ashe
Tomar chutir sathi.
Ashwiner ei alo elo
Phul-fotano bhore
Tomar chutir Ronge rongin
Chador-khani pore.
Amar ghore chutir bonna
Tomar lafe-zhape;
Kajkormo hishab-kitab
Thor-thoriye kape.
Gola amar joriye dhor,
Jhapiye poro kole,
Shei to amar oshim chhuti
Praner tufan tole.
Tomar chhuti ke je jogay
Jane ne tar rit,
Amar chhuti jogao tumi,
Oi-khane mor jit.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
প্রকৃতির অবারিত ছুটি:
“তোমার ছুটি নীল আকাশে, / তোমার ছুটি মাঠে, / তোমার ছুটি থইহারা ঐ / দিঘির ঘাটে ঘাটে।”— প্রকৃতির প্রতিটি কোণে—আকাশে, মাঠে, দিঘির ঘাটে, তেঁতুলতলায় কিংবা পারুলডাঙার বনে ছুটির আনন্দ ছড়িয়ে রয়েছে। শরৎকালের শিশির-হাওয়া ও আশ্বিনের আলো সেই ছুটির রূপকে আরও মোহনীয় করে তোলে।
- বিষয়-কাজের বাঁধন ও একাকীত্ব:
“আমি তোমার চশমাপরা / বুড়ো ঠাকুরদাদা, / বিষয়-কাজের মাকড়সাটার / বিষম জালে বাঁধা।”— বৃদ্ধ ঠাকুরদাদা জাগতিক কাজকর্ম ও হিসাব-নিকাশের জালে এমনভাবে জড়িয়ে আছেন যে তাঁর নিজস্ব কোনো স্বস্তি বা ছুটি নেই।
- শিশুর সান্নিধ্যে পরম মুক্তি:
“গলা আমার জড়িয়ে ধর, / ঝাঁপিয়ে পড় কোলে, / সেই তো আমার অসীম ছুটি / প্রাণের তুফান তোলে।”— নাতি-নাতনিদের কোলাহল, তাদের চপল চোখের নাচ এবং গলায় জড়িয়ে ধরার মাঝেই ঠাকুরদাদার জীবনের আসল ছুটি খুঁজে পাওয়া যায়। শিশুর এই ভালোবাসাই তাঁর সমস্ত দায়িত্ব ও হিসাবের ক্লান্তি দূর করে মনে প্রাণের তুফান তোলে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পলাতকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।