Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | অস্থানে |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পুনশ্চ |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধুনিক গদ্যকবিতা ও প্রতীকী প্রকৃতি-চেতনার ট্র্যাজিক লিরিক (Symbolic Prose Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
একই লতাবিতান বেয়ে চামেলি আর মধুমঞ্জরী
দশটি বছর কাটিয়েছে গায়ে গায়ে,
রোজ সকালে সূর্য-আলোর ভোজে
পাতাগুলি মেলে বলেছে
“এই তো এসেছি’।
অধিকারের দ্বন্দ্ব ছিল ডালে ডালে দুই শরিকে,
তবু তাদের প্রাণের আনন্দে
রেষারেষির দাগ পড়ে নি কিছু।
কখন যে কোন্ কুলগ্নে ওই
সংশয়হীন অবোধ চামেলি
কোমল সবুজ ডাল মেলে দিল
বিজ্লিবাতির লোহার তারে তারে,
বুঝতে পারে নি যে ওরা জাত আলাদা।
শ্রাবণ মাসের অবসানে আকাশকোণে
সাদা মেঘের গুচ্ছগুলি
নেমে নেমে পড়েছিল শালের বনে,
সেই সময়ে সোনায় রাঙা স্বচ্ছ সকালে
চামেলি মেতেছিল অজস্র ফুলের গৌরবে।
কোথাও কিছু বিরোধ ছিল না,
মৌমাছিদের আনাগোনায়
উঠত কেঁপে শিউলিতলার ছায়া।
ঘুঘুর ডাকে দুই প্রহরে
বেলা হত আলস্যে শিথিল।
সেই ভরা শরতের দিনে সূর্য-ডোবার সময়
মেঘে মেঘে লাগল যখন নানা রঙের খেয়াল,
সেই বেলাতে কখন এল
বিজ্লিবাতির অনুচরের দল।
চোখ রাঙালো চামেলিটার স্পর্ধা দেখে–
শুষ্ক শূন্য আধুনিকের রূঢ় প্রয়োজনের ‘পরে
নিত্যকালের লীলামধুর নিষ্প্রয়োজন অনধিকার
হাত বাড়ালো কেন।
তীক্ষ্ণ কুটিল আঁক্শি দিয়ে
টেনে টেনে ছিনিয়ে ছিঁড়ে নিল
কচি কচি ডালগুলি সব ফুলে-ভরা।
এত দিনে বুঝল হঠাৎ অবোধ চামেলিটা
মৃত্যু-আঘাত বক্ষে নিয়ে,
বিজ্লিবাতির তারগুলো ওই জাত আলাদা।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Shei bhora Shoroter dine shurjo-dobar shomoy
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- প্রকৃতির সহাবস্থান বনাম যান্ত্রিক বৈরিতা:“অধিকারের দ্বন্দ্ব ছিল ডালে ডালে দুই শরিকে, / তবু তাদের প্রাণের আনন্দে / রেষারেষির দাগ পড়ে নি কিছু। / কখন যে কোন্ কুলগ্নে ওই / সংশয়হীন অবোধ চামেলি / কোমল সবুজ ডাল মেলে দিল / বিজ্লিবাতির লোহার তারে তারে,”— চামেলি ও মধুমঞ্জরীর মধ্যে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভাগাভাগি ছিল, কিন্তু সেখানে কোনো হিংসা ছিল না। বিপদ ঘটে তখনই, যখন অকৃত্রিম চামেলি আধুনিক যন্ত্রের হিংস্র ও প্রাণহীন চরিত্র না বুঝে বিদ্যুৎ-তারকে আশ্রয়ের স্থান মনে করে ডাল মেলে দেয়।
- প্রয়োজন বনাম নিষ্প্রয়োজন রূপের দ্বন্দ্ব:“চোখ রাঙালো চামেলিটার স্পর্ধা দেখে– / শুষ্ক শূন্য আধুনিকের রূঢ় প্রয়োজনের ‘পরে / নিত্যকালের লীলামধুর নিষ্প্রয়োজন অনধিকার / হাত বাড়ালো কেন।”— কবিতার সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ দর্শন লুকিয়ে আছে এই অংশে। আধুনিক সভ্যতার মূল ভিত্তি হলো ‘রূঢ় প্রয়োজন’ ও উপযোগিতা। অন্যদিকে শিল্প, সৌন্দর্য ও প্রকৃতি হলো ‘লীলামধুর নিষ্প্রয়োজন’—যা কোনো হিসাবের ধার ধারে না। শুষ্ক আধুনিকতা এই অহেতুক সৌন্দর্যকে সহ্য করতে পারে না বলেই তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে।
- হিংস্র ধ্বংসলীলা ও চরম মোহভঙ্গ:“তীক্ষ্ণ কুটিল আঁক্শি দিয়ে / টেনে টেনে ছিনিয়ে ছিঁড়ে নিল / কচি কচি ডালগুলি সব ফুলে-ভরা। / এত দিনে বুঝল হঠাৎ অবোধ চামেলিটা / মৃত্যু-আঘাত বক্ষে নিয়ে, / বিজ্লিবাতির তারগুলো ওই জাত আলাদা।”— বিদ্যুৎকর্মীদের লোহার আঁকশি দিয়ে ফুলের ডাল ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্যটি আধুনিক সভ্যতার নির্মম আগ্রাসনের রূপক। নিজের মৃত্যুর চরম আঘাত বুকে নিয়েই চামেলি উপলব্ধি করে—কৃত্রিম যান্ত্রিকতা আর সজীব প্রাণের সত্তা কখনোই এক হতে পারে না; তাদের জাত ও স্বভাব চিরকালের জন্য আলাদা।