Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | একজন লোক |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পুনশ্চ |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধুনিক গদ্যকবিতা ও অস্তিত্ববাদী মনস্তাত্ত্বিক লিরিক (Existential / Realist Prose Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
আধবুড়ো হিন্দুস্থানি,
রোগা লম্বা মানুষ–
পাকা গোঁফ, দাড়ি-কামানো মুখ
শুকিয়ে-আসা ফলের মতো।
ছিটের মের্জাই গায়ে, মালকোঁচা ধুতি,
বাঁ কাঁধে ছাতি, ডান হাতে খাটো লাঠি,
পায়ে নাগরা– চলেছে শহরের দিকে।
ভাদ্রমাসের সকালবেলা,
পাতলা মেঘের ঝাপসা রোদ্দুর;
কাল গিয়েছে কম্বল-চাপা হাঁপিয়ে-ওঠা রাত,
আজ সকালে কুয়াশা-ভিজে হাওয়া
দোমনা ক’রে বইছে আমলকীর কচি ডালে।
পথিকটিকে দেখা গেল
আমার বিশ্বের শেষরেখাতে
যেখানে বস্তুহারা ছায়াছবির চলাচল।
ওকে শুধু জানলুম একজন-লোক।
ওর নাম নেই, সংজ্ঞা নেই, বেদনা নেই,
কিছুতে নেই কোনো দরকার–
কেবল হাটে-চলার পথে
ভাদ্রমাসের সকালবেলায়
একজন-লোক।
সেও আমায় গেছে দেখে
তার জগতের পোড়ো জমির শেষ সীমানায়,
যেখানকার নীল কুয়াশার মাঝে
কারো সঙ্গে সম্বন্ধ নেই কারো,
যেখানে আমি– একজন-লোক।
তার ঘরে তার বাছুর আছে,
ময়না আছে খাঁচায়;
স্ত্রী আছে তার, জাঁতায় আটা ভাঙে,
পিতলের মোটা কাঁকন হাতে;
আছে তার ধোবা প্রতিবেশী,
আছে মুদি দোকানদার
দেনা আছে কাবুলিদের কাছে;
কোনোখানেই নেই
আমি– একজন-লোক।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
She-o amay gechhe dekhe
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- বাস্তবানুগ চিত্রকল্প ও অনাত্মীয়তার রেখা:“ছিটের মের্জাই গায়ে, মালকোঁচা ধুতি, / বাঁ কাঁধে ছাতি, ডান হাতে খাটো লাঠি, / পায়ে নাগরা– চলেছে শহরের দিকে। / … পথিকটিকে দেখা গেল / আমার বিশ্বের শেষরেখাতে / যেখানে বস্তুহারা ছায়াছবির চলাচল।”— ভাদ্রমাসের সকালে মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়া অচেনা পথিকের শরীরী অবয়বটি কবি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু বাহ্যিক পরিচয়টুকু বাদ দিলে কবির মানসিক জগতের কাছে সে কেবল প্রান্তবর্তী এক নিরাকার ছায়া—যার সুখ, দুঃখ বা বেদনার সাথে কবির কোনো আত্মিক যোগ নেই।
- পারস্পরিক দূরত্বের দার্শনিক বোধ:“সেও আমায় গেছে দেখে / তার জগতের পোড়ো জমির শেষ সীমানায়, / যেখানকার নীল কুয়াশার মাঝে / কারো সঙ্গে সম্বন্ধ নেই কারো, / যেখানে আমি– একজন-লোক।”— আত্মকেন্দ্রিক অহংবোধ থেকে সরে এসে কবি বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেকে দেখেন। সেই হিন্দুস্থানি লোকটির কাছেও এই প্রখ্যাত কবি কোনো অর্থ বহন করেন না; তার কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্তের প্রান্তে কবিও নিতান্তই এক অনাত্মীয় ও অস্তিত্বহীন ‘একজন লোক’।
- পৃথক জীবনের বাস্তব বৃত্ত:“তার ঘরে তার বাছুর আছে, / ময়না আছে খাঁচায়; / স্ত্রী আছে তার, জাঁতায় আটা ভাঙে, / … কোনোখানেই নেই / আমি– একজন-লোক।”— প্রতিটি মানুষের জীবনই তার নিজস্ব সম্পর্ক, পরিজন, গৃহপালিত পশু, পাড়া-প্রতিবেশী ও ঋণের টানাপোড়েনে পরিপূর্ণ এক স্বয়ংসম্পূর্ণ মহাবিশ্ব। সেই সুনির্দিষ্ট জীবনের কোথাও কবির কোনো স্থান বা ছায়া পর্যন্ত নেই। মানুষের এই বহুমাত্রিক আত্মপরতা ও বিচ্ছিন্নতাকে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত মমতা ও প্রজ্ঞার সাথে উন্মোচন করেছেন।