বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম মনস্তাত্ত্বিক, বাস্তবধর্মী ও সুদীর্ঘ গদ্যকবিতা হলো ‘ভীরু’। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় শৈশবের অমূলক ভয়, বুলিং বা মানসিক নির্যাতনের স্মৃতি কীভাবে মানুষের মনে দীর্ঘছায়া ফেলে এবং জীবনের পরিপক্বতায় সেই ভয়ের শেকড় উপড়ে ফেলে আত্মমর্যাদার সাথে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ভীরু |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পুনশ্চ |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | গদ্যকবিতা ও মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান (Prose Poem and Psychological Narrative) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থটিতে কবি প্রাত্যহিক জীবনের নানা ছোটখাটো ঘটনা, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং মানুষের অন্তরের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে মুক্তছন্দে প্রকাশ করেছেন। ‘ভীরু’ কবিতায় সুনীত নামের এক সংবেদনশীল যুবকের গল্প বলা হয়েছে, যাকে স্কুলের দিনগুলোতে বটকৃষ্ণ নামের এক দুর্বৃত্ত ছেলে নানা কটূক্তি ও উপাধিতে (যেমন ‘হাঁসখালি’) জর্জরিত করত। সুনীতের সেই অন্ধ ভয় ও সংকোচ পরবর্তী জীবনেও তার মনে রেখাপাত করেছিল। কিন্তু সংগীত, বোন সুধা ও উমারানির সান্নিধ্য এবং জীবনের সঠিক সময়ে এসে সেই পুরোনো ভয় ও অত্যাচারীকে ঘৃণা ও দৃঢ়তার সাথে প্রতিহত করার মধ্য দিয়ে কবিতাটি এক অনন্য উচ্চতা লাভ করে।
পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের ভীরু কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ম্যাট্রিকুলেশনে পড়ে
ব্যঙ্গসুচতুর
বটেকৃষ্ট, ভীরু ছেলেদের বিভীষিকা।
একদিন কী কারণে
সুনীতকে দিয়েছিল উপাধি “পরমহংস’ ব’লে।
ক্রমে সেটা হল “পাতিহাঁস’।
শেষকালে হল “হাঁসখালি’–
কোনো তার অর্থ নেই, সেই তার খোঁচা।
আঘাতকে ডেকে আনে
যে নিরীহ আঘাতকে করে ভয়।
নিষ্ঠুরের দল বাড়ে,
ছোঁয়াচ লাগায় অট্টহাসে।
ব্যঙ্গরসিকের যত অংশ-অবতার
নিষ্কাম বিদ্রূপসূচি বিঁধে
অহৈতুক বিদ্বেষেতে সুনীতকে করে জরজর।
একদিন মুক্তি পেল সে বেচারা,
বেরোল ইস্কুল থেকে।
তার পরে গেল বহুদিন–
তবু যেন নাড়ীতে জড়িয়ে ছিল
সেদিনের সশঙ্ক সংকোচ।
জীবনে অন্যায় যত, হাস্যবক্র যত নির্দয়তা,
তারি কেন্দ্রস্থলে
বটেকৃষ্ট রেখে গেছে কালো স্থূল বিগ্রহ আপন।
সে কথা জানত বটু,
সুনীতের এই অন্ধ ভয়টাকে
মাঝে মাঝে নাড়া দিয়ে পেত সুখ
হিংস্র ক্ষমতার অহংকারে;
ডেকে যেত সেই পুরাতন নামে,
হেসে যেত খলখল হাসি।
বি. এল. পরীক্ষা দিয়ে
সুনীত ধরেছে ওকালতি,
ওকালতি ধরল না তাকে।
কাজের অভাব ছিল, সময়ের অভাব ছিল না–
গান গেয়ে সেতার বাজিয়ে
ছুটি ভরে যেত।
নিয়ামৎ ওস্তাদের কাছে
হ’ত তার সুরের সাধনা।
ছোটো বোন সুধা,
ডায়োসিসনের বি. এ.
গণিতে সে এম. এ. দিবে এই তার পণ।
দেহ তার ছিপ্ছিপে,
চলা তার চটুল চকিত,
চশমার নীচে
চোখে তার ঝলমল কৌতুকের ছটা–
দেহমন
কূলে কূলে ভরা তার হাসিতে খুশিতে।
তারি এক ভক্ত সখী নাম উমারানী–
শান্ত কণ্ঠস্বর,
চোখে স্নিগ্ধ কালো ছায়া,
দুটি দুটি সরু চুড়ি সুকুমার দুটি তার হাতে।
পাঠ্য ছিল ফিলজফি,
সে কথা জানাতে তার বিষম সংকোচ।
দাদার গোপন কথাখানা
সুধার ছিল না অগোচর।
চেপে রেখেছিল হাসি,
পাছে হাসি তীব্র হয়ে বাজে তার মনে।
রবিবার
চা খেতে বন্ধুকে ডেকেছিল।
সেদিন বিষম বৃষ্টি,
রাস্তা গলি ভেসে যায় জলে,
একা জানালার পাশে সুনীত সেতারে
আলাপ করেছে শুরু সুরট-মল্লার।
মন জানে
উমা আছে পাশের ঘরেই।
সেই-যে নিবিড় জানাটুকু
বুকের স্পন্দনে মিলে সেতারের তারে তারে কাঁপে।
হঠাৎ দাদার ঘরে ঢুকে
সেতারটা কেড়ে নিয়ে বলে সুধা,
“উমার বিশেষ অনুরোধ
গান শোনাতেই হবে,
নইলে সে ছাড়ে না কিছুতে।’
লজ্জায় সখীর মুখ রাঙা,
এ মিথ্যা কথার
কী করে যে প্রতিবাদ করা যায়
ভেবে সে পেল না।
সন্ধ্যার আগেই
অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে;
থেকে থেকে বাদল বাতাসে
দরজাটা ব্যস্ত হয়ে ওঠে,
বৃষ্টির ঝাপ্টা লাগে কাঁচের সাশিতে;
বারান্দার টব থেকে মৃদুগন্ধ দেয় জুঁইফুল;
হাঁটুজল জমেছে রাস্তায়,
তারি ‘পর দিয়ে
মাঝে মাঝে ছলো ছলো শব্দে চলে গাড়ি।
দীপালোকহীন ঘরে
সেতারের ঝংকারের সাথে
সুনীত ধরেছে গান
নটমল্লারের সুরে–
আওয়ে পিয়রওয়া,
রিমিঝিমি বরখন লাগে!
সুরের সুরেন্দ্রলোকে মন গেছে চলে,
নিখিলের সব ভাষা মিলে গেছে অখণ্ড সংগীতে।
অন্তহীন কালসরোবরে
মাধুরীর শতদল–
তার ‘পরে যে রয়েছে একা বসে
চেনা যেন তবু সে অচেনা।
সন্ধ্যা হল
বৃষ্টি থেমে গেছে;
জ্বলেছে পথের বাতি।
পাশের বাড়িতে
কোন্ ছেলে দুলে দুলে
চেঁচিয়ে ধরেছে তার পরীক্ষার পড়া।
এমন সময় সিঁড়ি থেকে
অট্টহাস্যে এল হাঁক,
“কোথা ওরে, কোথা গেল হাঁসখালি!’
মাংসলপৃথুলদেহ বটেকৃষ্ট স্ফীতরক্তচোখ
ঘরে এসে দেখে
সুনীত দাঁড়িয়ে দ্বারে নিঃসংকোচ স্তব্ধ ঘৃণা নিয়ে
স্থূল বিদ্রূপের ঊর্ধ্বে
ইন্দ্রের উদ্যত বজ্র যেন।
জোর করে হেসে উঠে
কী কথা বলতে গেল বটু,
সুনীত হাঁকল “চুপ’–
অকস্মাৎ বিদলিত ভেকের ডাকের মতো
হাসি গেল থেমে।
ভীরু (Bhiru) – Romanized Version
Matriculation-e pore
Byong-suchotur
Bote-krishto, bhiru chheleder vibhishika.
Ekdin ki karone
Sunitke diyechhe upadhi “poromhongsho” bo’le.
Krome sheita holo “patihash”.
Sheshkale holo “hashkhali”–
Kono tar ortho nei, shei tar khoncha.
Aghatke deke ane
Je niroho aghatke kore bhoy.
Nishturer dol bare,
Chhoyach lagay ottohashe.
Byong-roshiker joto ongsho-avatar
Nishkam bidrup-suchi bidhe
Ohotuk biddheshete Sunitke kore jorjor.
Ekdin mukti pelo se bechara,
Berolo iskul theke.
Tar pore gelo bohudin–
Tubu jeno nariye joriye chhilo
Shediner shoshonko shonkoch.
Jibone onnay joto, hashbrokr joto nirpoyota,
Tari kendrosthole
Bote-krishto rekhe geche kalo sthul bigroho apon.
Se kotha janot botu,
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
মানসিক অত্যাচার ও ভয়ের দীর্ঘছায়া:
“আঘাতকে ডেকে আনে / যে নিরীহ আঘাতকে করে ভয়। / নিষ্টুরের দল বাড়ে, / ছোঁয়াচ লাগায় অট্টহাসে।” — শৈশবে বা কৈশোরে কোনো মানুষের ওপর করা অন্যায় ও উপহাস কীভাবে তার মনে দীর্ঘমেয়াদী ভয়ের জন্ম দেয় এবং আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে তোলে, তা কবিতার প্রথমাংশে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
সুরের সাধনা ও প্রেমের মৃদু পরশ: সুনীতের ওকালতি পেশা বা অলস সময়গুলোতে সেতার বাজানো, সুরের চর্চা এবং উমারানির প্রতি তার সুক্ষ্ম ভালোলাগার আবহ গল্পটিকে এক স্নিগ্ধ রোমান্টিক মাত্রা দেয়।
অহংকার ও ভয়ের অবসান:
“সুনীত দাঁড়িয়ে দ্বারে নিঃসংকোচ স্তব্ধ ঘৃণা নিয়ে / স্থূল বিদ্রূপের ঊর্ধ্বে / ইন্দ্রের উদ্যত বজ্র যেন। / … সুনীত হাঁকল ‘চুপ’–” — জীবনের একটা সময়ে এসে সেই পুরোনো উৎপীড়ক বটকৃষ্ণ যখন আবার তার ওপর চড়াও হতে আসে, তখন সুনীত আর আগের মতো ভীরু বা সংকুচিত থাকে না। বরং সে এক দৃঢ় প্রতিহত করার শক্তি ও নিঃসংকোচ ঘৃণায় সেই ভয়ের জাল চিরতরে ছিন্ন করে দেয়।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
![পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের ভীরু কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 ভীরু bhiru [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভীরু-bhiru-কবিতা-.gif)