পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের মধুমঞ্জরী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম স্নিগ্ধ, প্রকৃতিপ্রেমিক ও মননশীল দীর্ঘ কবিতা হলো ‘মধুমঞ্জরী’। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত এই কবিতাটির শুরুতে একটি গদ্যভূমিকা রয়েছে, যেখানে কবি একটি নামহীন বিদেশী লতাদলকে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে ‘মধুমঞ্জরী’ নামে ভূষিত করেছেন। লতাটির সাথে প্রকৃতির ঋতুপরিবর্তন এবং মানবজীবনের মৃত্যু ও স্মৃতির এক অপূর্ব দার্শনিক মেলবন্ধন এখানে রচিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামমধুমঞ্জরী
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপুনশ্চ
প্রকাশের বছর১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রকৃতি ও জীবনমুখী গদ্য-পদ্য লিরিক কবিতা (Nature and Life-oriented Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্যকবিতা ও ভাবমূলক রচনার এক অনন্য নিদর্শন। এই গ্রন্থের কবিতায় পারিপার্শ্বিক প্রকৃতি, ছোটোখাটো উদ্ভিদ বা ফুল এবং তার সাথে কবির অন্তরের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ফুটে উঠেছে। ‘মধুমঞ্জরী’ কবিতায় কবি এক লতার সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের মানসিক ও ঋতুভিত্তিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন। বসন্তের ফুল থেকে শুরু করে শ্রাবণের ধারা, শরৎকালের শিশির এবং পরিশেষে মৃত্যুর ওপারেও স্মৃতির অমরত্ব বজায় রাখার আকুতি এই কবিতাকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে।

মধুমঞ্জরী – সম্পূর্ণ কবিতা

এ লতার কোনো-একটা বিদেশী নাম নিশ্চয় আছে– জানি নে, জানার দরকারও নেই।  আমাদের দেশের মন্দিরে এই লতার ফুলের ব্যবহার চলে না, কিন্তু মন্দিরের বাহিরে যে দেবতা মুক্তস্বরূপে আছেন তাঁর প্রচুর প্রসন্নতা এর মধ্যে বিকশিত।  কাব্যসরস্বতী কোনো মন্দিরের বন্দিনী দেবতা নন, তাঁর ব্যবহারে এই ফুলকে লাগাব ঠিক করেছি, তাই নতুন করে নাম দিতে হল।  রূপে রসে এর মধ্যে বিদেশী কিছুই নেই, এদেশের হাওয়ায় মাটিতে এর একটুও বিতৃষ্ণা দেখা যায় না, তাই দিশী নামে একে আপন করে নিলেম।

প্রত্যাশী হয়ে ছিনু এতকাল ধরি,

বসন্তে আজ দুয়ারে, আ মরি মরি,

ফুলমাধুরীর অঞ্জলি দিল ভরি

        মধুমঞ্জরীলতা।

কতদিন আমি দেখিতে এসেছি প্রাতে

কচি ডালগুলি ভরি নিয়ে কচি পাতে

আপন ভাষায় যেন আলোকের সাথে

        কহিতে চেয়েছে কথা।

কতদিন আমি দেখেছি গোধূলিকালে

সোনালি ছায়ার পরশ লেগেছে ডালে,

সন্ধ্যাবায়ুর মৃদু-কাঁপনের তালে

        কী যেন ছন্দ শোনে।

গহন নিশীথে ঝিল্লি যখন ডাকে,

দেখেছি চাহিয়া জড়িত ডালের ফাঁকে

কালপুরুষের ইঙ্গিত যেন কাকে

        দূর দিগন্তকোণে।

শ্রাবণে সঘন ধারা ঝরে ঝরঝর

পাতায় পাতায় কেঁপে ওঠে থরথর,

মনে হয় ওর হিয়া যেন ভরভর

        বিশ্বের বেদনাতে।

কতবার ওর মর্মে গিয়েছি চলি,

বুঝিতে পেরেছি কেন উঠে চঞ্চলি,

শরৎশিশিরে যখন সে ঝলমলি

        শিহরায় পাতে পাতে।

ভুবনে ভুবনে যে প্রাণ সীমানাহারা

গগনে গগনে সিঞ্চিল গ্রহতারা

পল্লবপুটে ধরি লয় তারি ধারা,

        মজ্জায় লহে ভরি।

কী নিবিড় যোগ এই বাতাসের সনে,

যেন সে পরশ পায় জননীর স্তনে,

সে পুলকখানি কত-যে, সে মোর মনে

        বুঝিব কেমন করি।

বাতাসে আকাশে আলোকের মাঝখানে–

ঋতুর হাতের মায়ামন্ত্রের টানে

কী-যে বাণী আছে প্রাণে প্রাণে ওই জানে,

        মন তা জানিবে কিসে।

যে ইন্দ্রজাল দ্যুলোকে ভূলোকে ছাওয়া,

বুকের ভিতর লাগে ওর তারি হাওয়া–

বুঝিতে যে চাই কেমন সে ওর পাওয়া,

        চেয়ে থাকি অনিমেষে।

ফুলের গুচ্ছে আজি ও উচ্ছ্বসিত,

নিখিলবাণীর রসের পরশামৃত

গোপনে গোপনে পেয়েছে অপরিমিত

        ধরিতে না পারে তারে।

ছন্দে গন্ধে রূপ-আনন্দে ভরা,

ধরণীর ধন গগণের মন-হরা,

শ্যামলের বীণা বাজিল মধুস্বরা

        ঝংকারে ঝংকারে।

আমার দুয়ারে এসেছিল নাম ভুলি

পাতা-ঝলমল অঙ্কুরখানি তুলি

মোর আঁখিপানে চেয়েছিল দুলি দুলি

        করুণ প্রশ্নরতা।

তার পরে কবে দাঁড়াল যেদিন ভোরে

ফুলে ফুলে তার পরিচয়লিপি ধরে

নাম দিয়ে আমি নিলাম আপন ক’রে–

        মধুমঞ্জরীলতা।

তার পরে যবে চলে যাব অবশেষে

সকল ঋতুর অতীত নীরব দেশে,

তখনো জাগাবে বসন্ত ফিরে এসে

        ফুল-ফোটাবার ব্যথা।

বরষে বরষে সেদিনও তো বারে বারে

এমনি করিয়া শূন্য ঘরের দ্বারে

এই লতা মোর আনিবে কুসুমভারে

        ফাগুনের আকুলতা।

তব পানে মোর ছিল যে প্রাণের প্রীতি

ওর কিশলয়ে রূপ নেবে সেই স্মৃতি,

মধুর গন্ধে আভাসিবে নিতি নিতি

        সে মোর গোপন কথা।

অনেক কাহিনী যাবে যে সেদিন ভূলে,

স্মরণচিহ্ন কত যাবে উন্মূলে;

মোর দেওয়া নাম লেখা থাক্‌ ওর ফুলে

        মধুমঞ্জরীলতা।

 

মধুমঞ্জরী Romanized Version

E lotar kono-e-ta bideshi nam nischoy ache– jani ne, janar dorkar o nei. Amader desher mondire ei lotar fuler byabohar chole na, kintu mondirer bahire je debota muktoswarupe achen tar prochur proshonnota er modhye bikoshito. Kabbyasoroswoti kono mondirer bondini debota non, tar byabohare ei lulke [e fule] lagabo thik korechi, tai notun kore nam dite holo. Rupe rose er modhye bideshi kichu nei, edesher haway matite er ekto-o bitrishna deka jay na, tai dishi name aike [ake] apon kore nilem.

Prottashi hoye chhinu etokal dhori,
Boshonte aj duyare, a mori mori,
Ful-madhurir anjoli dil bhori
Madhumonjorilata.
Kotodin ami dekhte eshechhi prate
Kochi dalguli bhori niye kochi pate
Apon bhashay jeno aloker sathe

Kohite cheyeche kotha.

Kotodin ami dekhechhi godhulikale
Sonali chhayar porosh legeche dale,
Shondhyabayur mridu-kaponer tale
Ki jeno chhondo shone.
Gohon nisithe jhilli jokhon dake,
Dekhechhi chahiya joritor daler fake
Kalpurusher ingit jeno kake
Dur digontokone.
Srabone soghono dhara jhore jhorjhor
Patay patay kepe othe thorthor,
Mone hoy or hiya jeno bhorbhor
Bishwer bedonate.
Kotobar or morme giyechhi choli,
Bujhite perechhe keno uthe choncholi,
Shorot-shishire jokhon se jolmoli
Shihoray pate pate.
Bhubane bhubane je pran simanhara
Gagone gagone sinchilo groho-nokhotro
Pollobpute dhori loy tari dhara,
Mojzay lohe bhori.
Ki nibiro jog ei bataser sone,
Jeno se porosh pay jononir stone,
Se polokhkhani koto-je, se mor mone

Bujhibo kemon kori.

Batase akashe aloker majhkane–
Ritur hater mayamontrer tane
Ki-je bani ache prane prane oi jane,
Mon ta janibe kise.
Je indrojal dyuloke bhuloke chhawa,
Buker bhitor lage or tari hawa–
Bujhite je চাই kemon se or paoya, [Bujhite je chai kemon se or paoya]
Cheye thaki onimeshe.
Fuler guchchhe aji o uchchhoshito,
Nikhilbanir roser poroshamrito
Gopone gopone peyeche oporimito
Dhorite na pare tare.
Chhonde gondhe rup-anonde bhara,
Dhoronir dhono gogoner mon-hara,
Shyamaler bina bajilo modhuswara
Jhongare jhongare.
Amar duyare eshechhilo nam bhuli
Pata-jholmol onkurkhani tuli
Mor ankhipane cheyechilo duli duli
Korun proshnorata.
Tar pore kobe daralo je din bhore
Fule fule tar porichoyolipi dhore
Nam দিয়ে ami nilam apon ko’re– [Nam diye ami nilam apon ko’re]

Madhumonjorilata.

Tar pore jobe chole jabo obosheshe
Sokol ritur otito nirobo deshe,
Tokhono jagabe boshonto fire eshe
Ful-fotabar byatha.
Boroshe boroshe shedin-o to bare bare
Emni koriya shunyo ghorer dware
Ei lota mor anibe kusumbhare
Faguner akulta.
Tobo pane mor chhilo je praner priti
Or kisholoye rup nebe shei smriti,
Modhur gondhe abhasibe niti niti
Se mor gopon kotha.
Entries… [Anek kahini jabe je sedin bhule]
Smaron-chihno koto jabe unmule;
Mor dewa nam lekha thak or fule

Madhumonjorilata.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • প্রকৃতির সাথে আত্মিক সংযোগ: কবি একটি নামহীন লতাদলকে দেশী নামে ‘মধুমঞ্জরী’ হিসেবে আপন করে নেন। সকালের রোদ, গোধূলির ছায়া, শ্রাবণের ধারা এবং শরৎকালের শিশিরের সাথে লতার এই নিবিড় সংযোগ বিশ্বপ্রাণেরই এক রূপ।
  • নামকরণ ও সম্পর্কের গভীরতা:
“আমার দুয়ারে এসেছিল নাম ভুলি / পাতা-ঝলমল অঙ্কুরখানি তুলি / মোর আঁখিপানে চেয়েছিল দুলি দুলি / করুণ প্রশ্নরতা।”
— অবহেলায় বেড়ে ওঠা একটি সাধারণ লতা কবির দুয়ারে এসে আশ্রয় নেয় এবং কবি তাকে নিজের মতো করে নাম দিয়ে ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়ে নেন।
  • মৃত্যুর ওপারে স্মৃতির অমরতা:
“তার পরে যবে চলে যাব অবশেষে / সকল ঋতুর অতীত নীরব দেশে, / তখনো জাগাবে বসন্ত ফিরে এসে / ফুল-ফোটাবার ব্যথা।”
— কবি উপলব্ধি করেছেন যে একদিন তাঁকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু বসন্ত আসবে, আর এই লতা প্রতি বছর কবির দেওয়া ‘মধুমঞ্জরী’ নামটি বুকে নিয়ে ফুল ফোটাবে এবং কবির গোপন স্মৃতির সৌরভ ছড়িয়ে দেবে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন