Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | মধুমঞ্জরী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পুনশ্চ |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | প্রকৃতি ও জীবনমুখী গদ্য-পদ্য লিরিক কবিতা (Nature and Life-oriented Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
মধুমঞ্জরী – সম্পূর্ণ কবিতা
এ লতার কোনো-একটা বিদেশী নাম নিশ্চয় আছে– জানি নে, জানার দরকারও নেই। আমাদের দেশের মন্দিরে এই লতার ফুলের ব্যবহার চলে না, কিন্তু মন্দিরের বাহিরে যে দেবতা মুক্তস্বরূপে আছেন তাঁর প্রচুর প্রসন্নতা এর মধ্যে বিকশিত। কাব্যসরস্বতী কোনো মন্দিরের বন্দিনী দেবতা নন, তাঁর ব্যবহারে এই ফুলকে লাগাব ঠিক করেছি, তাই নতুন করে নাম দিতে হল। রূপে রসে এর মধ্যে বিদেশী কিছুই নেই, এদেশের হাওয়ায় মাটিতে এর একটুও বিতৃষ্ণা দেখা যায় না, তাই দিশী নামে একে আপন করে নিলেম।
প্রত্যাশী হয়ে ছিনু এতকাল ধরি,
বসন্তে আজ দুয়ারে, আ মরি মরি,
ফুলমাধুরীর অঞ্জলি দিল ভরি
মধুমঞ্জরীলতা।
কতদিন আমি দেখিতে এসেছি প্রাতে
কচি ডালগুলি ভরি নিয়ে কচি পাতে
আপন ভাষায় যেন আলোকের সাথে
কহিতে চেয়েছে কথা।
কতদিন আমি দেখেছি গোধূলিকালে
সোনালি ছায়ার পরশ লেগেছে ডালে,
সন্ধ্যাবায়ুর মৃদু-কাঁপনের তালে
কী যেন ছন্দ শোনে।
গহন নিশীথে ঝিল্লি যখন ডাকে,
দেখেছি চাহিয়া জড়িত ডালের ফাঁকে
কালপুরুষের ইঙ্গিত যেন কাকে
দূর দিগন্তকোণে।
শ্রাবণে সঘন ধারা ঝরে ঝরঝর
পাতায় পাতায় কেঁপে ওঠে থরথর,
মনে হয় ওর হিয়া যেন ভরভর
বিশ্বের বেদনাতে।
কতবার ওর মর্মে গিয়েছি চলি,
বুঝিতে পেরেছি কেন উঠে চঞ্চলি,
শরৎশিশিরে যখন সে ঝলমলি
শিহরায় পাতে পাতে।
ভুবনে ভুবনে যে প্রাণ সীমানাহারা
গগনে গগনে সিঞ্চিল গ্রহতারা
পল্লবপুটে ধরি লয় তারি ধারা,
মজ্জায় লহে ভরি।
কী নিবিড় যোগ এই বাতাসের সনে,
যেন সে পরশ পায় জননীর স্তনে,
সে পুলকখানি কত-যে, সে মোর মনে
বুঝিব কেমন করি।
বাতাসে আকাশে আলোকের মাঝখানে–
ঋতুর হাতের মায়ামন্ত্রের টানে
কী-যে বাণী আছে প্রাণে প্রাণে ওই জানে,
মন তা জানিবে কিসে।
যে ইন্দ্রজাল দ্যুলোকে ভূলোকে ছাওয়া,
বুকের ভিতর লাগে ওর তারি হাওয়া–
বুঝিতে যে চাই কেমন সে ওর পাওয়া,
চেয়ে থাকি অনিমেষে।
ফুলের গুচ্ছে আজি ও উচ্ছ্বসিত,
নিখিলবাণীর রসের পরশামৃত
গোপনে গোপনে পেয়েছে অপরিমিত
ধরিতে না পারে তারে।
ছন্দে গন্ধে রূপ-আনন্দে ভরা,
ধরণীর ধন গগণের মন-হরা,
শ্যামলের বীণা বাজিল মধুস্বরা
ঝংকারে ঝংকারে।
আমার দুয়ারে এসেছিল নাম ভুলি
পাতা-ঝলমল অঙ্কুরখানি তুলি
মোর আঁখিপানে চেয়েছিল দুলি দুলি
করুণ প্রশ্নরতা।
তার পরে কবে দাঁড়াল যেদিন ভোরে
ফুলে ফুলে তার পরিচয়লিপি ধরে
নাম দিয়ে আমি নিলাম আপন ক’রে–
মধুমঞ্জরীলতা।
তার পরে যবে চলে যাব অবশেষে
সকল ঋতুর অতীত নীরব দেশে,
তখনো জাগাবে বসন্ত ফিরে এসে
ফুল-ফোটাবার ব্যথা।
বরষে বরষে সেদিনও তো বারে বারে
এমনি করিয়া শূন্য ঘরের দ্বারে
এই লতা মোর আনিবে কুসুমভারে
ফাগুনের আকুলতা।
তব পানে মোর ছিল যে প্রাণের প্রীতি
ওর কিশলয়ে রূপ নেবে সেই স্মৃতি,
মধুর গন্ধে আভাসিবে নিতি নিতি
সে মোর গোপন কথা।
অনেক কাহিনী যাবে যে সেদিন ভূলে,
স্মরণচিহ্ন কত যাবে উন্মূলে;
মোর দেওয়া নাম লেখা থাক্ ওর ফুলে
মধুমঞ্জরীলতা।
মধুমঞ্জরী Romanized Version
E lotar kono-e-ta bideshi nam nischoy ache– jani ne, janar dorkar o nei. Amader desher mondire ei lotar fuler byabohar chole na, kintu mondirer bahire je debota muktoswarupe achen tar prochur proshonnota er modhye bikoshito. Kabbyasoroswoti kono mondirer bondini debota non, tar byabohare ei lulke [e fule] lagabo thik korechi, tai notun kore nam dite holo. Rupe rose er modhye bideshi kichu nei, edesher haway matite er ekto-o bitrishna deka jay na, tai dishi name aike [ake] apon kore nilem.
Kohite cheyeche kotha.
Bujhibo kemon kori.
Madhumonjorilata.
Madhumonjorilata.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- প্রকৃতির সাথে আত্মিক সংযোগ: কবি একটি নামহীন লতাদলকে দেশী নামে ‘মধুমঞ্জরী’ হিসেবে আপন করে নেন। সকালের রোদ, গোধূলির ছায়া, শ্রাবণের ধারা এবং শরৎকালের শিশিরের সাথে লতার এই নিবিড় সংযোগ বিশ্বপ্রাণেরই এক রূপ।
- নামকরণ ও সম্পর্কের গভীরতা:
“আমার দুয়ারে এসেছিল নাম ভুলি / পাতা-ঝলমল অঙ্কুরখানি তুলি / মোর আঁখিপানে চেয়েছিল দুলি দুলি / করুণ প্রশ্নরতা।”— অবহেলায় বেড়ে ওঠা একটি সাধারণ লতা কবির দুয়ারে এসে আশ্রয় নেয় এবং কবি তাকে নিজের মতো করে নাম দিয়ে ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়ে নেন।
- মৃত্যুর ওপারে স্মৃতির অমরতা:
“তার পরে যবে চলে যাব অবশেষে / সকল ঋতুর অতীত নীরব দেশে, / তখনো জাগাবে বসন্ত ফিরে এসে / ফুল-ফোটাবার ব্যথা।”— কবি উপলব্ধি করেছেন যে একদিন তাঁকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু বসন্ত আসবে, আর এই লতা প্রতি বছর কবির দেওয়া ‘মধুমঞ্জরী’ নামটি বুকে নিয়ে ফুল ফোটাবে এবং কবির গোপন স্মৃতির সৌরভ ছড়িয়ে দেবে।
![পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের মধুমঞ্জরী কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 মধুমঞ্জরী madhumonjori [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/মধুমঞ্জরী-madhumonjori-কবিতা-.gif)