পূরবী কাব্যগ্রন্থের আনমনা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম স্নিগ্ধ, সুরময় ও রোমান্টিক লিরিক কবিতা হলো ‘আনমনা’। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি এমন এক নারীর কথা বলেছেন যিনি আপন মনে উদাসীন ও আনমনা হয়ে আছেন। বাহ্যিক কোলাহল ছাপিয়ে যখন প্রকৃতির গোধূলি ও শান্ত সন্ধ্যা নেমে আসে, তখন কবির সুকুমার বাণী ও সুর কীভাবে সেই আনমনা হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, তার এক অপূর্ব চিত্রায়ণ এই কবিতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামআনমনা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপূরবী
প্রকাশের বছর১৯২৫ (১৩৩২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরোমান্টিক ও লিরিক কবিতা (Romantic and Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক পরিণত, সুরসমৃদ্ধ ও অন্তর্মুখী পর্বের পরিচায়ক। এই গ্রন্থের কবিতায় জীবনের নানা সূক্ষ্ম অনুভূতি, প্রেম এবং প্রকৃতির রূপান্তর অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ‘আনমনা’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে, প্রিয়জন যখন উদাসীন বা আনমনা থাকে, তখন তাকে জোর করে কথা বলাতে যাওয়া যায় না। বরং প্রকৃতির শান্ত লগ্ন ও সন্ধ্যার স্নিগ্ধ পরিবেশে যখন ক্লান্তি নেমে আসে, তখন নিভৃতে ছন্দে গাঁথা বাণীর মাধ্যমে তার মন জয় করার আকুলতা প্রকাশ পায়।

আনমনা – সম্পূর্ণ কবিতা

আন’মনা গো, আনম’না,
তোমার কাছে আমার বাণীর মালাখানি আনব না।
বার্তা আমার ব্যর্থ হবে,
সত্য আমার বুঝবে কবে?
তোমারো মন জানব না,
আন্‌মনা গো, আন্‌মনা।
লগ্ন যদি হয় অনুকূল মৌন মধুর সাঁঝে,
নয়ন তোমার মগ্ন যখন ম্লান আলোর মাঝে,
দেব তোমায় শান্ত সুরের সান্ত্বনা,
আন’মনা গো, আন’মনা।
জনশূন্য তটের পানে ফিরবে হাঁসের দল;
স্বচ্ছ নদীর জল
আকাশ-পানে রইবে পেতে কান
বুকের তলে শুনবে ব’লে গ্রহতারার গান;
কুলায়-ফেরা পাখি
নীল আকাশের বিরামখানি রাখবে ডানায় ঢাকি;
বেণুশাখার অন্তরালে অস্তপারের রবি
আঁকবে মেঘে মুছবে আবার শেষ-বিদায়ের ছবি;
স্তব্ধ হবে দিনের বেলার ক্ষুব্ধ হাওয়ার দোলা,
তখন তোমার মন যদি রয় খোলা —
তখন সন্ধ্যাতারা
প পায় যদি তার সাড়া
তোমার উদার আঁখিতারার পারে,
কনকচাঁপার গন্ধ-ছোঁওয়া বনের অন্ধকারে
ক্লান্তি-অলস ভাব্‌না যদি ফুল-বিছানো ভুঁয়ে
মেলিয়ে ছায়া এলিয়ে থাকে শুয়ে;
ছন্দে গাঁথা বাণী তখন পড়ব তোমার কানে
মন্দ মৃদুল তানে —
ঝিল্লি যেমন শালের বনে নিদ্রানীরব রাতে
অন্ধকারের জপের মালায় একটানা সুর গাঁথে।
একলা তোমার বিজন প্রাণের প্রাঙ্গণে
প্রান্তে বসে একমনে
এঁকে যাব আমার গানের আল্‌পনা
আন’মনা গো, আন’মনা।

An’mona Romanized Version

An’mona go, an’mona,
Tomar kache amar banir malakhani anbo na.
Barta amar byartho hobe,
Sotyo amar bujhibe kobe?
Tomaro mon janbo na,
An’mona go, an’mona.
Logno jodi hoy onukul mouno modhur sajhe,
Noyon tomar mogno jokhon mlan alor majhe,
Debo tomay shanto shurer shantona,
An’mona go, an’mona.
Jonoshunyo toter pane firbe hasher dol;
Swachho nodir jol
Akash-pane roibe pete kan
Buker tole shunbe bo’le grohotarar gan;
Kulay-fera pakhi
Nil akasher biramkhani rakhbe danay dhaki;
Benushakhar ontorale ostoparer robi
Ankbe meghe muchbe abar shesh-bidayer chobi;
Stabdho hobe diner belar khubdho hawar dola,
Tokhon tomar mon jodi roy khola —
Tokhon shondhyatara
Pay jodi tar shara
Tomar udhar ankhitarar pare,
Konokchapar gondho-chhowa boner ondhokare
Klanti-olosh bhabna jodi ful-bichhano bhuye
Meliye chhaya eliye thake shuye;
Chhonde gatha bani tothon porbo tomar kane
Mondo mridul tane —
Jhilli jemon shaler bone nidranirob rate
Ondhokarer joper malay ektana shur ganthe.
Ekla tomar bijon praner prangone
Prante bose ekmone
Enke jabo amar ganer alpana
An’mona go, an’mona.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • উদাসীনতার প্রতি শ্রদ্ধা: প্রিয়জন যখন আনমনা ও উদাসীন থাকে, তখন তার কাছে বাণীর মালাখানি জোড়াজুড়ি করে না নিয়ে একটু অপেক্ষা করার সুর রয়েছে কবিতার শুরুতে।
  • প্রকৃতির শান্ত রূপ ও সন্ধ্যার লগ্ন:
“জনশূন্য তটের পানে ফিরবে হাঁসের দল; / স্বচ্ছ নদীর জল / আকাশ-পানে রইবে পেতে কান / বুকের তলে শুনবে ব’লে গ্রহতারার গান…”
— দিনের কোলাহল থেমে গিয়ে যখন কুলায়-ফেরা পাখি, অস্তপারের রবি এবং সন্ধ্যাতারার স্নিগ্ধ আলো নেমে আসে, তখন প্রকৃতির পরিবেশ এক অপূর্ব প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।
  • নিভৃতে মনের দুয়ারে সুরের ছোঁয়া:
“ঝিল্লি যেমন শালের বনে নিদ্রানীরব রাতে / অন্ধকারের জপের মালায় একটানা সুর গাঁথে। / একলা তোমার বিজন প্রাণের প্রাঙ্গণে / প্রান্তে বসে একমনে / এঁকে যাব আমার গানের আল্‌পনা…”
— রাতের বেলা ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা সুরের মতো, আনমনা মানুষটির বিজন প্রাণের প্রাঙ্গণে বসে একা একা মনের সুখে গানের আল্পনা এঁকে যাওয়ার মধ্য দিয়েই এই কবিতার পরম অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পূরবী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন