বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম সুন্দর, রোমান্টিক ও রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘ইটালিয়া’। ১৯২৫ সালে (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত এই কবিতায় কবি ইতালির প্রকৃতি, শিল্প-সংস্কৃতি এবং রোমান্টিক আবহকে এক রাজকীয় রানীরূপে কল্পনা করেছেন। কবির ইতালি ভ্রমণ ও সেখানকার রানীর সাথে কাল্পনিক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে বসন্তের প্রতীক্ষা এবং মিলনের এক অপূর্ব কাব্যিক রূপ ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ইটালিয়া |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পূরবী |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৫ (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক ও লিরিক কবিতা (Romantic and Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিদেশ ভ্রমণ এবং জীবনের এক পরিণত ও রোমান্টিক মানসিকতার ফসল। ১৯২৬ সালে কবি ইতালি ভ্রমণ করেছিলেন (যদিও কবিতাটি ১৯২৫ সালে পূরবী গ্রন্থে সংকলিত হয়)। ‘ইটালিয়া’ কবিতায় কবি ইতালিকে এক মানবী বা ‘রানী’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ইতালিতে যখন কবি উপস্থিত হন, তখন রানী তাকে বসন্তকালে অর্থাৎ ফুল ফোটার দিনে আসার আমন্ত্রণ জানান। কবির মনে এই প্রতীক্ষা এবং মিলনের আশাই এই কবিতার মূল প্রেরণা।
ইটালিয়া – সম্পূর্ণ কবিতা
কহিলাম, “ওগো রানী,
কত কবি এল চরণে তোমার উপহার দিল আনি।
উষার দুয়ারে পাখির মতন গান গেয়ে চলে যাই।’
শুনিয়া দাঁড়ালে তব বাতায়ন-‘পরে;
ঘোমটা আড়ালে কহিলে করুণ স্বরে,
“এখন শীতের দিন
কুয়াশায় ঢাকা আকাশ আমার, কানন কুসুমহীন।’
কহিলাম, “ওগো রানী,
সাগরপারের নিকুঞ্জ হতে এনেছি বাঁশরিখানি।
উতারো ঘোমটা তব,
বারেক তোমার কালো নয়নের আলোখানি দেখে লব।’
কহিলে, “আমার হয় নি রঙিন সাজ;
হে অধীর কবি, ফিরে যাও তুমি আজ;
মধুর ফাগুন মাসে
কুসুম-আসনে বসিব যখন ডেকে লব মোর পাশে।’
কহিলাম, “ওগো রানী,
সফল হয়েছে যাত্রা আমার, শুনেছি আশার বাণী।
বসন্তসমীরণে
তব আহ্বানমন্ত্র ফুটিবে কুসুমে আমার বনে।
মধুপমুখর গন্ধমাতাল দিনে
ওই জানালার পথখানি লব চিনে,
আসিবে সে সুসময়।
আজিকে বিদায় নেবার বেলায় গাহিব তোমার জয়।’
ইটালিয়া Romanized Version
Kohilam, “Ogo rani,
Koto kobi elo chorone tomar upohar dilo ani.
Ushar duyare pakhir moton gan geye chole jai.’
Shuniya danrale tobo batayon-‘pere;
Ghomta arale kohile korun shore,
“Ekhon sheeter din
Kuyashay dhaka akash amar, kanon kushumhin.’
Kohilam, “Ogo rani,
Shagorparer nikunjo hote eneche bashorikhani.
Utaro ghomta tobo,
Bare k tomar kalo noyoner alokhani dekhe lob.’
Kohile, “Amar hoy ni rongin saj;
He odhir kobi, fire jao tumi aj;
Modhur fagun mase
Kushum-asune bosibo jokhon deke lob mor pashe.’
Kohilam, “Ogo rani,
Sofol hoyechhe jatra amar, shunechhi ashar bani.
Boshontosomirene
Tobo ahbanmontro futibe kusume amar bone.
Modhupmokhro gondhomatal dine
Oi janalar pothkhani lob chine,
Ashibe se sushomoy.
Ajike biday nebar belay gahibo tomar joy.’
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- ইতালিকে রানীরূপে কল্পনা: ইউরোপের শিল্প-সাহিত্যের পুণ্যভূমি ইতালিকে কবি এক সুদূরপ্রসারী রানীরূপে দেখেছেন, যাঁর চরণে নানা দেশের কবিরা এসে অঞ্জলি দেন।
- শীতের রিক্ততা ও বসন্তের অপেক্ষা: কবি যখন সেখানে পৌঁছান, তখন শীতের কুয়াশায় প্রকৃতি রিক্ত ও ম্লান। রানী তখন কবিকে বসন্তের দিনে, অর্থাৎ যখন ফুল ফুটবে এবং চারদিক রঙিন হয়ে উঠবে, তখন আবার আসার অনুরোধ জানান।
- “আসিবে সে সুসময়। / আজিকে বিদায় নেবার বেলায় গাহিব তোমার জয়।”— এই চরণের মাধ্যমে কবি তাঁর মিলন-প্রতীক্ষার আনন্দ ও আশাবাদের কথা প্রকাশ করেছেন। এখনই মিলন না হলেও রানীর সেই আশার বাণী শুনেই কবির যাত্রা সফল হয়েছে এবং তিনি বিদায়ের মুহূর্তেও সেই সৌন্দর্যের জয়গান গেয়েছেন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পূরবী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।