বাসাবদল কবিতা । সানাই কাব্যগ্রন্থ । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাসাবদল’ কবিতাটি পড়তে গিয়ে আপনি নিশ্চিতভাবেই এক ধরনের অদ্ভুত বিষণ্ণতা ও স্মৃতিকাতরতায় আচ্ছন্ন হবেন। একটি পরিচিত ঘর, যেখানে জীবনের অনেকগুলো দিন কেটেছে, সেই ঘর ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তটি মানুষের মনে যে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির জন্ম দেয়, তা এই কবিতায় নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতাটি কেবল স্থান পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি স্মৃতি, সম্পর্ক এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার এক অসাধারণ দলিল। আসুন, বিদায়বেলার এই বিষণ্ণ কাব্যিক মুহূর্তটিকে একটু গুছিয়ে অনুভব করি।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামবাসাবদল
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসানাই
প্রকাশের বছর১৯৪০
কবিতার ধরনমনস্তাত্ত্বিক আখ্যান ও স্মৃতিচারণ

কবিতার প্রেক্ষাপট ও চরিত্র

রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ের কাব্যগ্রন্থগুলোতে প্রাত্যহিক জীবনের খুব সাধারণ ঘটনাগুলোকে অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায় তুলে ধরেছেন। ‘বাসাবদল’ ঠিক তেমনই একটি কবিতা। এখানে একজন নারী (বা মূল কথক) তাঁর পুরনো বাসা ছেড়ে যাচ্ছেন। বাসা বদলের দিন সকালে প্যাক করার যে একঘেয়েমি এবং ক্লান্তি, তা কথকের শরীর ও মন উভয়কেই গ্রাস করেছে।

কবিতায় ‘অবিনাশ’ নামের একটি চরিত্র রয়েছে, যে অত্যন্ত যত্ন ও আবেগের সাথে কথকের জিনিসপত্র গুছিয়ে দিচ্ছে। অবিনাশের এই নীরব প্রেম বা ভক্তি এবং কথকের নির্লিপ্ততা ও অবদমিত বিরক্তি—এই দ্বৈত মানসিকতাই কবিতাটির মূল চালিকাশক্তি।

বাসাবদল – সম্পূর্ণ কবিতা

যেতেই হবে।

দিনটা যেন খোঁড়া পায়ের মতো

ব্যান্ডেজেতে বাঁধা।

একটু চলা, একটু থেমে-থাকা,

টেবিলটাতে হেলান দিয়ে বসা

সিঁড়ির দিকে চেয়ে।

আকাশেতে পায়রাগুলো ওড়ে

ঘুরে ঘুরে চক্র বেঁধে।

চেয়ে দেখি দেয়ালে সেই লেখনখানি

গেল বছরের,

লালরঙা পেন্‌সিলে লেখা–

“এসেছিলুম; পাই নি দেখা; যাই তা হলে।

দোসরা ডিসেম্বরে।’

এ লেখাটি ধুলো ঝেড়ে রেখেছিলেম তাজা,

যাবার সময় মুছে দিয়ে যাব।

পুরোনো এক ব্লটিং কাগজ

চায়ের ভোজে অলস ক্ষণের হিজিবিজি-কাটা,

ভাঁজ ক’রে তাই নিলেম জামার নিচে।

প্যাক করতে গা লাগে না,

মেজের ‘পরে বসে আছি পা ছড়িয়ে।

হাতপাখাটা ক্লান্ত হাতে

অন্যমনে দোলাই ধীরে ধীরে।

ডেস্কে ছিল মেডেন্‌-হেয়ার পাতায় বাঁধা

শুকনো গোলাপ,

কোলে নিয়ে ভাবছি বসে–

কী ভাবছি কে জানে।

অবিনাশের ফরিদপুরে বাড়ি,

আনুকূল্য তার

বিশেষ কাজে লাগে

আমার এ দশাতেই।

কোথা থেকে আপনি এসে জোটে

চাইতে না চাইতেই,

কাজ পেলে সে ভাগ্য ব’লেই মানে–

খাটে মুটের মতো।

জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা,

লাগল ক’ষে আস্তিন গুটিয়ে।

ওডিকোলন মুড়ে নিল পুরোনো এক আনন্দবাজারে।

ময়লা মোজায় জড়িয়ে নিল এমোনিয়া।

ড্রেসিং কেসে রাখল খোপে খোপে

হাত-আয়না, রূপোয় বাঁধা বুরুশ,

নখ চাঁচবার উখো,

সাবানদানি, ক্রিমের কৌটো, ম্যাকাসারের তেল।

ছেড়ে-ফেলা শাড়িগুলো

নানা দিনের নিমন্ত্রণের

ফিকে গন্ধ ছড়িয়ে দিল ঘরে।

সেগুলো সব বিছিয়ে দিয়ে চেপে চেপে

পাট করতে অবিনাশের যে-সময়টা গেল

নেহাত সেটা বেশি।

বারে বারে ঘুরিয়ে আমার চটিজোড়া

কোঁচা দিয়ে যত্নে দিল মুছে,

ফুঁ দিয়ে সে উড়িয়ে দিল ধুলোটা কাল্পনিক

মুখের কাছে ধ’রে।

দেয়াল থেকে খসিয়ে নিল ছবিগুলো,

একটা বিশেষ ফোটো

মুছল আপন আস্তিনেতে অকারণে।

একটা চিঠির খাম

হঠাৎ দেখি লুকিয়ে নিল

বুকের পকেটেতে।

দেখে যেমন হাসি পেল, পড়ল দীর্ঘশ্বাস।

কার্পেটটা গুটিয়ে দিল দেয়াল ঘেঁষে–

জন্মদিনের পাওয়া,

হল বছর-সাতেক।

 

অবসাদের ভারে অলস মন,

চুল বাঁধতে গা লাগে নাই সারা সকালবেলা,

আলগা আঁচল অন্যমনে বাঁধি নি ব্রোচ দিয়ে।

কুটিকুটি ছিঁড়তেছিলেম একে-একে

পুরোনো সব চিঠি–

ছড়িয়ে রইল মেঝের ‘পরে, ঝাঁট দেবে না কেউ

বোশেখমাসের শুকনো হাওয়া ছাড়া।

ডাক আনল পাড়ার পিয়ন বুড়ো,

দিলেম সেটা কাঁপা হাতে রিডাইরেক্টেড ক’রে।

রাস্তা দিয়ে চলে গেল তপসি-মাছের হাঁক,

চমকে উঠে হঠাৎ পড়ল মনে–

নাই কোনো দরকার।

মোটর-গাড়ির চেনা শব্দ কখন দূরে মিলিয়ে গেছে

সাড়ে-দশটা বেলায়

পেরিয়ে গিয়ে হাজরা রোডের মোড়।

উজাড় হল ঘর,

দেয়ালগুলো অবুঝ-পারা তাকিয়ে থাকে ফ্যাকাশে দৃষ্টিতে

যেখানে কেউ নেই।

সিঁড়ি বেয়ে পৌঁছে দিল অবিনাশ

ট্যাক্সিগাড়ি-‘পরে।

এই দরোজায় শেষ বিদায়ের বাণী

শোনা গেল ঐ ভক্তের মুখে–

বললে, “আমায় চিঠি লিখো।’

রাগ হল তাই শুনে

কেন জানি বিনা কারণেই।

বাসাবদল Romanized Version

Jetei hobe.

Dinta jeno khora payer moto

Byandejete bandha.

Ektu chola, ektu theme-thaka,

Tebiltate helan diye bosha

Shirir dike cheye.

Akashete payragulo ore

Ghure ghure chokro bedhe.

Cheye dekhi deyale shei lekhonkhani

Gelo bochhorer,

Lalronga pensile lekha–

“Eshechilum; pai ni dekha; jai ta hole.

Doshra disembore.’

E lekhati dhulo jhere rekhechhilem taja,

Jabar shomoy muche diye jabo.

Purono ek bloting kagoj

Chayer bhoje olosh khhoner hijibiji-kata,

Vanj ko’re tai nilem jamar niche.

Pyak korte ga lage na,

Mejer ‘pore boshe achi pa chhoriye.

Hatpakhata klanto hate

Onnomone dolai dhire dhire.

Deske chilo meden-heyar patay bandha

Shukno golap,

Kole niye bhabchi boshe–

Ki bhabchi ke jane.

Obinasher Foridpure bari,

Anukullo tar

Bishes kaje lage

Amar e doshatei.

Kotha theke apni eshe jote

Chaite na chaitei,

Kaj pele she bhaggo bo’lei mane–

Khate muter moto.

Jinispotro bandhachhanda,

Laglo ko’she astin gutiye.

Odikolon mure nilo purono ek anondobajare.

Moyla mojay joriye nilo emoniya.

Dreshing kese rakhlo khope khope

Hat-ayna, rupoy bandha burush,

Nokh chanchbar ukho,

Shabandani, krimer kouto, myakasharer tel.

Chhere-fela sharigulo

Nana diner nimontroner

Fike gondho chhoriye dilo ghore.

Shegulo shob bichiye diye chepe chepe

Pat korte Obinasher je-shomoyta gelo

Nehat sheta beshi.

Bare bare ghuriye amar chotijora

Koncha diye jotne dilo muche,

Fun diye she uriye dilo dhulota kalponik

Mukher kache dho’re.

Deyal theke khoshiye nilo chhobigulo,

Ekta bisesh foto

Muchlo apon astinete okarone.

Ekta chithir kham

Hothat dekhi lukiye nilo

Buker poketete.

Dekhe jemon hashi pelo, porlo dirghoshwash.

Karpetta gutiye dilo deyal gheshe–

Jonmodiner paowa,

Holo bochor-shatek.

Oboshader bhare olosh mon,

Chul bandhte ga lage nai shara shokalbela,

Alga anchol onnomone bandhi ni broch diye.

Kutikuti chhirtechhilem eke-eke

Purono shob chithi–

Chhoriye roilo mejher ‘pore, jhannt debe na keu

Boshekhmasher shukno haowa chara.

Dak anlo parar piyon buro,

Dilem sheta kampa hate ridairekted ko’re.

Rasta diye chole gelo toposhi-macher hank,

Chomke uthe hothat porlo mone–

Nai kono dorkar.

Motor-garir chena shobdo kokhon dure miliye geche

Share-doshta belay

Periye giye Hajora roder mor.

Ujar holo ghor,

Deyalgulo obujh-para takiye thake fyakashe drishtite

Jekhane keu nei.

Shiri beye pouche dilo Obinash

Tyaksigari-‘pore.

Ei dorojay shesh bidayer bani

Shona gelo oi bhokter mukhe–

Bolle, “Amay chithi likho.’

Rag holo tai shune

Keno jani bina karonei.

কবিতার মূল ভাব ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

  • অবসাদ ও স্মৃতিকাতরতা: কবিতার শুরুতেই আমরা দেখি বিদায়ের দিনটি যেন “খোঁড়া পায়ের মতো ব্যান্ডেজেতে বাঁধা”। এই উপমাটি কথকের মানসিক পঙ্গুত্ব এবং বিদায়ের দীর্ঘসূত্রিতাকে তুলে ধরে। পুরোনো দিনের হিজিবিজি কাটা ব্লটিং পেপার বা শুকনো গোলাপের মতো তুচ্ছ জিনিসগুলো আজ অমূল্য হয়ে উঠেছে। দেয়ালে লেখা “এসেছিলুম; পাই নি দেখা” স্মৃতিটি তিনি এতদিন তাজা রেখেছিলেন, আজ যাবার বেলায় তা মুছে ফেলার মধ্যে এক নীরব হাহাকার লুকিয়ে আছে।

  • অবিনাশের নীরব প্রেম: অবিনাশ চরিত্রটি এই কবিতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সে নীরবে কথককে ভালোবাসে। তাই জিনিস গোছানোর ছলে সে শাড়ির ভাঁজে সময় কাটায়, চটিজোড়া নিজের কোঁচা দিয়ে মোছে এবং একটি চিঠির খাম লুকিয়ে বুকের পকেটে রেখে দেয়। তার এই অযৌক্তিক ভক্তি ও দুর্বলতা দেখে কথকের হাসি পেলেও, একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

  • শূন্যতা ও মানসিক স্থানান্তর: যখন ঘর পুরোপুরি খালি হয়ে যায়, তখন দেয়ালগুলো যেন “অবুঝ-পারা তাকিয়ে থাকে ফ্যাকাশে দৃষ্টিতে”। এই ফ্যাকাশে দেয়াল আসলে কথকের নিজেরই শূন্য হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি।

  • মনস্তাত্ত্বিক সমাপ্তি: কবিতার শেষে অবিনাশ যখন বলে “আমায় চিঠি লিখো”, তখন কথকের বিনা কারণে রাগ হয়। এই রাগ মূলত অবিনাশের প্রতি নয়, বরং নিজের অতীত, স্মৃতির প্রতি টান এবং বাসা বদলের এই নির্মম বাস্তবতার প্রতি এক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া (Displacement of emotion)।

“উজাড় হল ঘর, / দেয়ালগুলো অবুঝ-পারা তাকিয়ে থাকে ফ্যাকাশে দৃষ্টিতে / যেখানে কেউ নেই।”

— এই চরণগুলো শূন্যতার এমন এক জীবন্ত চিত্র তৈরি করে, যা পাঠকের মনকেও নিমিষেই ভারাক্রান্ত করে তোলে।

‘বাসাবদল’ কেবল একটি ভৌত স্থান পরিবর্তন নয়, এটি মানুষের জীবনের এক অধ্যায় থেকে অন্য অধ্যায়ে প্রবেশের মানসিক টানাপোড়েনের এক নিখুঁত শব্দচিত্র।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ ও বিন্যাস বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ থেকে সংগ্রহ ও সতর্কতার সাথে যাচাই করা হয়েছে। ‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থের মূল পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে কবিতাটির শব্দচয়নের বিশুদ্ধতা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।

মন্তব্য করুন