কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর পরিণত বয়সের কাব্যচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থ। ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মানবমনের সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব, ভয়, সংকোচ ও আত্মসংগ্রামের রূপক ব্যাখ্যা দিয়েছেন গভীর দার্শনিক দৃষ্টিতে। বিচিত্রতা–র কবিতাগুলিতে প্রেম কেবল আবেগ নয়—তা এক নৈতিক ও অস্তিত্বগত পরীক্ষা। “ভীরু” কবিতাটি এই গ্রন্থের অন্যতম শক্তিশালী রচনা, যেখানে কবি প্রেমের মুখোমুখি মানুষের অন্তর্গত ভীতিকে প্রশ্ন করেন এবং সেই ভয় অতিক্রম করার আহ্বান জানান।
এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ প্রেমকে এক অগ্নিপরীক্ষার মতো উপস্থাপন করেছেন। ভীরু হৃদয় প্রেমকে সংসারে ডেকে আনে, কিন্তু তাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করার সাহস দেখাতে পারে না। প্রেম এখানে কাঁপতে থাকে, থমকে যায়—কারণ সংশয় তাকে নিজের পরিচয় পেতে দেয় না। কবির ভাষায়, বাইরের সামান্য বাধাই প্রেমকে হেয় করে তোলে; অথচ প্রকৃত পরাজয় ঘটে অন্তরের ভিতরেই। এই দৃষ্টিভঙ্গি রবীন্দ্রনাথের প্রেমভাবনার এক গভীর সত্য উন্মোচন করে—প্রেমের ব্যর্থতা বাইরের কারণে নয়, আত্মবিশ্বাসহীনতার ফল।
নিশীথরাত্রির অন্ধকারে যে আহ্বান বারবার আসে, তা আসলে সত্যের ডাক। কবি ভীরুকে বলেন—ভয়ের অন্ধ ঘেরাটোপে থেকো না, দুর্গম পথকে অবজ্ঞা করো না। প্রেমের গৌরব লুকিয়ে আছে দুঃখ ও যন্ত্রণাকে মেনে নেওয়ার সাহসে। অশ্রুজলও দীপ্তি দিতে পারে, আর নষ্ট আশাও নিষ্ফল হয় না—এই আশাবাদী উপলব্ধি কবিতাটিকে কেবল প্রেমের কবিতা নয়, জীবনদর্শনের স্তরে উন্নীত করে।
রবীন্দ্রনাথ এখানে কঠোর ভাষায় বলেন—দুর্বল মিথ্যার খাঁচায় বেঁচে থাকা অর্থহীন। শীর্ণ ফুল রৌদ্রে পুড়ে কালো হলেও সে সত্যের রোদে পুড়েছে; কিন্তু ভীরু প্রদীপ নিভে যাওয়া আরও করুণ। আত্মরক্ষার নামে জীবনকে আঘাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে যদি সত্যিকারের প্রেম ও মূল্যবান অভিজ্ঞতা হারিয়ে যায়, তবে সেই জীবনই বঞ্চিত হয়।
“ভীরু” কবিতায় প্রেম আত্মদানের মাধ্যমে মুক্তির পথ দেখায়। প্রেম কৃপণতা জানে না; সে ত্যাগবীর্যেই মুক্তিধন অর্জন করে। এই কবিতা পাঠককে প্রশ্ন করে—ভয় এড়িয়ে কি সত্যিকারের প্রেম সম্ভব? রবীন্দ্রনাথের উত্তর স্পষ্ট: সাহস ছাড়া প্রেমের পূর্ণতা নেই।
ভীরু কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কেন এ কম্পিত প্রেম, অয়ি ভীরু, এনেছ সংসারে–
ব্যর্থ করি রাখিবে কি তারে।
আলোকশঙ্কিত তব হিয়া
প্রচ্ছন্ন নিভৃত পথ দিয়া
থেমে যায় প্রাঙ্গণের দ্বারে।
হায়, সে যে পায় নাই আপন নিশ্চিত পরিচয়,
বন্দী তারে রেখেছে সংশয়।
বাহিরে সামান্য বাধা সেও
সে-প্রেমেরে কেন করে হেয়,
অন্তরেও তার পরাজয়।
ওই শোনো কেঁপে ওঠে নিশীথরাত্রির অন্ধকার,
আহ্বান আসিছে বারম্বার।
থেকো না ভয়ের অন্ধ ঘেরে,
অবজ্ঞা করিয়ো দুর্গমেরে,
জিনি লহো সত্যেরে তোমার।
নিষ্ঠুরকে মেনে লহো সুদুঃসহ দুঃখের উৎসাহে,
প্রেমের গৌরব জেনো তাহে।
দীপ্তি দেয় রুদ্ধ অশ্রুজল,
নষ্ট আশা হয় না নিষ্ফল,
সমুজ্জল করে চিত্তদাহে।
শীর্ণ ফুল রৌদ্রে পুড়ে কালো হয়, হোক-না সে কালো–
দীন দীপে নিবুক-না আলো।
দুর্বল যে মিথ্যার খাঁচায়
নিত্যকাল কে তারে বাঁচায়,
মরে যাহা মরা তার ভালো।
আঘাত বাঁচাতে গিয়ে বঞ্চিত হবে কি এ-জীবন,
শুধিবে না দুর্মূল্যের পণ।
প্রেম সে কি কৃপণতা জানে,
আত্মরক্ষা করে আত্মদানে–
ত্যাগবীর্যে লভে মুক্তিধন।
আরও দেখুনঃ
