আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের যুগল কবিতা | Jugol Kobita | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যজীবনের শেষ পর্বে রচিত বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থ মানবচেতনার সূক্ষ্মতম স্তরগুলিকে স্পর্শ করেছে। ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে প্রেম, সৃষ্টি, মিলন-বিচ্ছেদ এবং বিশ্বজগতের অন্তর্লীন ছন্দ এক গভীর দার্শনিক আলোয় উদ্ভাসিত। বিচিত্রতা–র কবিতাগুলি ব্যক্তিগত অনুভবকে অতিক্রম করে মহাজাগতিক সত্যের দিকে যাত্রা করে। “যুগল” কবিতাটি এই গ্রন্থের একটি অনন্য রচনা, যেখানে কবি একাকিত্বের মধ্যেও যুগলের দর্শনে সৃষ্টির পরম অর্থ আবিষ্কার করেন।

এই কবিতায় কবি নিজেকে স্থাপন করেছেন এক নীরব পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়—“আমি থাকি একা”—কিন্তু সেই একাকিত্ব শূন্য নয়, বরং সার্থক। একটি বৃন্তে যুগলকে দেখা তাঁর কাছে বিশ্বসৃষ্টির মর্ম উপলব্ধির দ্বার খুলে দেয়। রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখান, মানুষ বাইরে বাইরে নিজের দান খুঁজে বেড়ায়, অথচ প্রকৃত দান ও মিলনের সত্য নিহিত আছে অন্তরের গভীরে। এই অনুসন্ধান থেকেই জন্ম নেয় বিশ্বের দুঃখ, আবার সেই দুঃখ থেকেই ফুটে ওঠে সব মধুরতা—বাণী, সুর, রূপ ও সৃষ্টির বহ্নিলিখা।

কবিতাটিতে প্রেম ও বাসনাকে কেবল মানবিক আবেগ হিসেবে নয়, বরং বিশ্বপ্রবাহের চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। গ্রহ-তারা-রবির মধ্যে যে আগুন জ্বলছে, তা বাসনারই দাহ; সেই দাহেই জগৎ চঞ্চল হয়ে ওঠে বিরহ ও মিলনের দ্বন্দ্বে। দিনরাত, কাল ও অনন্ত—সবকিছু ছাপিয়ে এক অনাদি আহ্বান ফিরে ফিরে আসে, আলো ও ছায়ার ভেতর দিয়ে।

ফাল্গুনের প্রকৃতিচিত্র এই কবিতায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অভিসারিকার দল, পত্রে-পুষ্পে চাঞ্চল্য—সবই সেই মহাজাগতিক আহ্বানের প্রতিধ্বনি। কবির দৃষ্টিতে, সমগ্র নিখিল ভুবনে যে নিত্য সংগীত বাজে, তা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় বনচ্ছায়ায় সাজানো যুগলের মূর্তিতে। অর্থাৎ যুগল কেবল দুই মানুষের মিলন নয়—তা সৃষ্টির চিরন্তন প্রতীক।

“যুগল” কবিতায় রবীন্দ্রনাথ একাকিত্ব ও মিলনকে বিরোধী নয়, পরিপূরক হিসেবে দেখিয়েছেন। একা বসে যুগলকে দেখা মানেই নিজের অস্তিত্বকে বিশ্বসত্তার সঙ্গে যুক্ত করা। এই কবিতা পাঠককে শেখায়—প্রেম ও মিলনের সত্য কেবল ব্যক্তিগত নয়, তা সমগ্র সৃষ্টির গভীরে প্রবাহিত এক অনন্ত ছন্দ।

 

যুগল কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    আমি থাকি একা,

এই বাতায়নে বসে এক বৃন্তে যু’গলকে দেখা–

                সেই মোর সার্থকতা।

             বুঝিতে পারি সে কথা

         লোকে লোকে কী আগ্রহ অহরহ

                করিছে সন্ধান

আপনার বাহিরেতে কোথা হবে আপনার দান।

তা নিয়ে বিপুল দুঃখে বিশ্বচিত্ত জেগে উঠে,

             তারি সুখে পূর্ণ হয়ে ফুটে

                   যা-কিছু মধুর।

                যত বাণী, যত সুর,

         যত রূপ, তপস্যার যত বহ্নিলিখা,

                        সৃষ্টিচিত্তশিখা,

                 আকাশে আকাশে লিখে

                      দিকে দিকে

অণুপরমাণুদের মিলনের ছবি।

 

গ্রহ তারা রবি

যে-আগুন জ্বেলেছে তা বাসনারই দাহ,

        সেই তাপে জগৎপ্রবাহ

চঞ্চলিয়া চলিয়াছে বিরহমিলনদ্বন্দ্বঘাতে।

                দিনরাতে

        কালের অতীত পার হতে,

অনাদি আহ্বানধ্বনি ফিরিতেছে ছায়াতে আলোতে।

                 সেই ডাক শুনে

     কত সাজে সাজিয়েছে আজি এ-ফাল্গুনে

            বনে বনে অভিসারিকার দল,

               পত্রে পুষ্পে হয়েছে চঞ্চল–

সমস্ত বিশ্বের মর্মে যে-চাঞ্চল্য তারায় তারায়

              তরঙ্গিছে প্রকাশধারায়,

     নিখিল ভুবনে নিত্য যে-সংগীত বাজে

             মূর্তি নিল বনচ্ছায়ে যুগলের সাজে।

Amar Rabindranath Logo

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত