কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা তাঁর শেষজীবনের কাব্যভাবনার এক অনন্য নিদর্শন। ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ দৃশ্য, স্মৃতি ও অনুভবকে চিত্রকলার মতো করে কবিতার ভাষায় রূপ দিয়েছেন। নিজস্ব ও সমকালীন শিল্পীদের চিত্রকর্মের ভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রচিত এই কবিতাগুলিতে দৃশ্যের অন্তর্গত আবেগ ও নীরব অর্থই হয়ে উঠেছে মুখ্য। “বিদায়” কবিতাটি এই গ্রন্থের একটি গভীরভাবে বেদনাস্পর্শী রচনা, যেখানে বিচ্ছেদ কেবল ব্যক্তিগত অনুভব নয়—সময়, স্মৃতি ও অস্তিত্বের এক মৌন রূপান্তর।
উল্লেখযোগ্য যে, রবীন্দ্রনাথের আরেকটি “বিদায়” কবিতা রয়েছে তাঁর খেয়া (১৯০৬) কাব্যগ্রন্থে। নামের মিল থাকলেও ভাবগত দিক থেকে বিচিত্রতার “বিদায়” সম্পূর্ণ ভিন্ন—এখানে বিদায় মানে হঠাৎ ঘটে যাওয়া এক যুগান্তর, যেখানে মুহূর্তের মধ্যে হাজার বছরের দূরত্ব নেমে আসে।
এই কবিতায় বিদায় কোনো নাটকীয় উচ্চারণে নয়, বরং নিঃশব্দে ঘটে। “মাথায় ঘোমটা টানি / যখনি ফিরালে মুখখানি”—এই ক্ষুদ্র অঙ্গভঙ্গির মধ্যেই বিচ্ছেদের সম্পূর্ণ অভিঘাত ধরা পড়ে। কোনো কথা না বলেই কবি চলে যান অতীতে—সেই অতীতে, যেখানে অসীম বিরহ ছায়ার মতো বর্তমানের প্রেমহারা মানুষদের ঘিরে রাখে। এখানে অতীত ও বর্তমান একে অপরের মধ্যে মিশে যায়, সময়রেখা ঝাপসা হয়ে ওঠে।
কবিতার মাঝখানে যে “ছোটো নির্ঝরিণী”, সে যেন দুই মানুষের মাঝখানের ক্ষুদ্র অথচ অতিক্রমণযোগ্য দূরত্বের প্রতীক। এই সামান্য ব্যবধানের উপর দিয়েই বয়ে যায় বিদায়ের করুণ সুর। বিদায় নেওয়া মানুষটি কবির চোখে ধীরে ধীরে কাছের মূর্তি থেকে দূরের মূর্তিতে রূপান্তরিত হয়—দূরত্বই তাকে আরও মহিমান্বিত করে তোলে।
শেষাংশে কবি তাঁর সমস্ত স্মৃতি, অব্যক্ত প্রীতি ও ব্যক্ত গীতিকে একত্র করে বিদায়-যাত্রীর উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। এখানে কোনো দাবি নেই, নেই স্পর্শের অনিবার্যতা—“স্পর্শ যদি নাই করো যাক তবে ভেসে।” এই স্বীকৃতির মধ্যেই রয়েছে বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্লীন দর্শন: সম্পর্কের সত্যতা তার অধিকারবোধে নয়, তার মুক্তিতে।
“বিদায়” কবিতা তাই কেবল প্রস্থান নয়—এ এক নীরব আত্মসমর্পণ, যেখানে বিচ্ছেদ নিজেই হয়ে ওঠে এক শান্ত, দীপ্ত উপলব্ধি।

বিদায় কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার আমার মাঝে হাজার বৎসর
নেমে এল, মুহূর্তেই হল যুগান্তর।
মাথায় ঘোমটা টানি
যখনি ফিরালে মুখখানি
কোনো কথা নাহি বলি,
তখনি অতীতে গেলে চলি–
যে-অতীতে অসীম বিরহে
ছায়াসম রহে
বর্তমানে যারা
হয়েছে প্রেমের পথহারা।
যে-পারে গিয়েছ হোথা
বেশি দূর নহে এখনো তা।
ছোটো নির্ঝরিণী শুধু বহে মাঝখানে,
বিদায়ের পদধ্বনি গাঁথে সে করুণ কলগানে।
চেয়ে দেখি অনিমিখে
তুমি চলিয়াছ কোন্ শিখরের দিকে;
যেন স্বপ্নে উঠিতেছ ঊর্ধ্ব-পানে,
যেন তুমি বীণাধ্বনি, শান্ত সুরে তানে
চলিয়াছ মেঘলোকে।
আজি মোর চোখে
কাছের মূর্তির চেয়ে দূরের মূর্তিতে তুমি বড়ো
অনেক দিনের মোর সব চিন্তা করিয়াছি জড়ো,
সব স্মৃতি,
অব্যক্ত সকল প্রীতি, ব্যক্ত সব গীতি–
উৎসর্গ করিনু আজি, যাত্রী তুমি, তোমার উদ্দেশে।
স্পর্শ যদি নাই করো যাক তবে ভেসে।

