আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের কন্যাবিদায় কবিতা | Konyabiday Kobita | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা বাংলা সাহিত্যের এক গভীর অন্তর্মুখী পর্বের দলিল। ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে কবি জীবনের শেষপ্রান্তে এসে মানবজীবনের নিত্য ও অনিত্য, স্মৃতি ও বিচ্ছেদ, সময়ের আবর্তন এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে সংযত অথচ তীক্ষ্ণ কাব্যভাষায় রূপ দিয়েছেন। “কন্যাবিদায়” কবিতাটি এই গ্রন্থের একটি বিশেষভাবে সংবেদনশীল রচনা, যেখানে কন্যার বিদায়ের মুহূর্তে জননীর অন্তরে জেগে ওঠা অতীত, স্মৃতি ও জীবনচক্রের পুনরাবৃত্তিকে গভীর মানবিকতায় চিত্রিত করা হয়েছে।

এই কবিতার কেন্দ্রে রয়েছে বিদায়ের ক্ষণ—কিন্তু তা কেবল কন্যার নয়, মায়ের নিজের জীবনেরও এক প্রতিফলিত বিদায়। কবি দেখান, কন্যাকে বিদায় দিতে গিয়ে জননীর মনে ফিরে আসে নিজের বাল্যকাল, মাতৃক্রোড় থেকে ভাগ্যের স্রোতে ভেসে যাওয়া, সংসারের দীর্ঘ যাত্রা। সুখ-দুঃখের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে বিচ্ছেদের ক্ষত ক্ষীণ হয়েছিল বটে, কিন্তু আজ কন্যার বিদায়ের মুহূর্তে সেই ক্ষত আবার নতুন করে স্পর্শ পায়।

রবীন্দ্রনাথ এখানে জীবনকে এক আবর্তমান বৃত্ত হিসেবে দেখেছেন। জননীর জীবনের শুরু—বাল্য, শুভ্র মাঙ্গল্যের টিকা, সিন্দূররেখা—সবই কবিতায় স্মৃতির মতো ভেসে ওঠে। সেই সিন্দূররেখা, যা একদিন জীবনের পূর্বভাগকে চিহ্নিত করেছিল, আজ যেন কন্যার অশ্রুসজল বিদায়ে আবার ফিরে আসে। কন্যার চোখের জলে জননী নিজের জীবনের ছিন্নখণ্ড খুঁজে পান—এ এক গভীর প্রতিসরণ, যেখানে মা ও মেয়ের জীবন একে অপরের মধ্যে মিলিত হয়ে যায়।

কবিতার ভাষা শান্ত, সংযত, কিন্তু আবেগে ভারী। এখানে কোনো নাটকীয়তা নেই; আছে নিঃশব্দ বেদনা ও স্বীকৃতি। বিদায়কে কবি দেখিয়েছেন অনিবার্য সত্য হিসেবে—যেমন মাতৃক্রোড় থেকে একদিন মা নিজেও বিদায় নিয়েছিলেন, তেমনি আজ কন্যা বিদায় নেয়। এই পুনরাবৃত্তির মধ্যেই জীবনের গভীরতম সত্য নিহিত।

“কন্যাবিদায়” কেবল এক সামাজিক রীতির কাব্যরূপ নয়; এটি জীবনচক্রের এক অন্তর্লীন দর্শন। মা ও মেয়ের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখান, মানুষ যতই এগিয়ে যাক, তার স্মৃতি ও অতীত কখনো সম্পূর্ণ বিদায় নেয় না। এই কবিতা তাই বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের মানবিক ও দার্শনিক গভীরতার এক অনন্য নিদর্শন।

কন্যাবিদায় কবিতা | konyabiday-kobita | বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

জননী, কন্যারে আজ বিদায়ের ক্ষণে

আপন অতীতরূপ পড়িয়াছে মনে

যখন বালিকা ছিলে।

                  মাতৃক্রোড় হতে

তোমারে ভাসালো ভাগ্য দূরতর স্রোতে

সংসারের।

          তার পর গেল কত দিন

দুঃখে সুখে,

          বিচ্ছেদের ক্ষত হল ক্ষীণ।

এ-জন্মের আরম্ভভূমিকা– সংকীর্ণ সে

প্রথম উষার মতো– ক্ষণিক প্রদোষে

মিলাইল লয়ে তার স্বর্ণ কুহেলিকা।

বাল্যে পরেছিলে শুভ্র মাঙ্গল্যের টিকা,

সিন্দূররেখায় হল লীন।

                     সে-রেখাটি

জীবনের পূর্বভাগ দিল যেন কাটি।

আজ সেই ছিন্নখণ্ড ফিরে এল শেষে

তোমার কন্যার মাঝে অশ্রুর আবেশে।

Amar Rabindranath Logo

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত