রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে, কবির সৃজনজীবনের পরিণত পর্বে। বিচিত্রতা গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ নানা মানবচরিত্র, সমাজবাস্তবতা ও অন্তর্লীন সৌন্দর্যকে গভীর সহানুভূতি ও সূক্ষ্ম শিল্পবোধে তুলে ধরেছেন। এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “গোয়ালিনী” কবিতাটি কবির মানবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির এক অনুপম উদাহরণ। এখানে কোনো নায়ক-নায়িকার গৌরবগাথা নেই; আছে সাধারণ এক গ্রামবাংলার নারী—হাটে চলা এক গোয়ালিনী, যার কোলে শিশু, হাতে সংসারের ডোর, আর হৃদয়ে অশেষ মমতা।
কবিতার প্রথম স্তবকেই কবি আমাদের নিয়ে যান হাটের কোলাহলে—পথের বাঁকে বাঁকে ভিড়, শব্দ, ধুলো আর ব্যস্ততার মাঝখানে। সেই কঠিন বাস্তবতার ফাঁকেই গোয়ালিনী আপন ঘর ও হাটের জীবনকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। তার চলার ভঙ্গিতে কোনো অভিযোগ নেই, আছে সহজ স্বীকৃতি। রবীন্দ্রনাথ এখানে কোলাহলের বিপরীতে স্থাপন করেছেন এক নীরব মানবিক উপস্থিতি, যা ভিড়ের মধ্যেও আপন ছন্দে চলে।
দ্বিতীয় স্তবকে প্রকৃতি ও মানবজীবনের এক অন্তরঙ্গ সংযোগ ফুটে ওঠে। হাটের ধুলো, কেনাবেচার ব্যস্ততা সত্ত্বেও কোথাও কৃষ্ণকলি ফুলে ওঠে, তরুমূলে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যেন কবি বলতে চান—জীবনের সৌন্দর্য কখনো বাজারের হিসাব মানে না; সে আপন নিয়মে, আপন ছন্দে প্রস্ফুটিত হয়। গোয়ালিনীর উপস্থিতি সেই সৌন্দর্যেরই অংশ।
শেষ স্তবকে কবিতা পৌঁছায় তার গভীরতম আবেগে। মা ও শিশুর সম্পর্ক এখানে কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। দুধের ভাঁড়ে শুধু জীবিকা নয়, মায়ের প্রাণের মাধুরী ঢেলে দেওয়া আছে। লোভের পৃথিবীতে গোয়ালিনী দেয় স্নেহের স্পর্শ—নিঃশব্দে, নিরিবিলি। এইখানেই কবিতার মানবিক শক্তি সবচেয়ে উজ্জ্বল।
“গোয়ালিনী” কবিতাটি তাই কেবল একটি চরিত্রচিত্রণ নয়; এটি রবীন্দ্রনাথের সমাজদর্শনের এক কোমল প্রকাশ। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই যে চিরন্তন মানবিক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, এই কবিতা আমাদের তা নতুন করে দেখায়। বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়েও “গোয়ালিনী” নিজস্ব আলোয় উজ্জ্বল—নীরব, সংযত, অথচ গভীরভাবে স্পর্শকাতর।
গোয়ালিনী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাটেতে চল পথের বাঁকে বাঁকে,
হে গোয়া-লিনী, শিশুরে নিয়ে কাঁখে।
হাটের সাথে ঘরের সাথে
বেঁধেছ ডোর আপন হাতে
পরুষ কলকোলাহলের ফাঁকে।
হাটের পথে জানি না কোন্ ভুলে
কৃষ্ণকলি উঠিছে ভরি ফুলে।
কেনাবেচার বাহনগুলা
যতই কেন উড়াক ধুলা
তোমারি মিল সে ওই তরুমূলে।
শালিখপাখি আহারকণা-আশে
মাঠের ‘পরে চরিছে ঘাসে ঘাসে।
আকাশ হতে প্রভাতরবি
দেখিছে সেই প্রাণের ছবি,
তোমারে আর তাহারে দেখে হাসে।
মায়েতে আর শিশুতে দোঁহে মিলে
ভিড়ের মাঝে চলেছ নিরিবিলে।
দুধের ভাঁড়ে মায়ের প্রাণ
মাধুরী তার করিল দান,
লোভের ভালে স্নেহের ছোঁওয়া দিলে।
