রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে—কবির সৃজনজীবনের এক অন্তর্মুখী, দার্শনিক ও আত্মবিশ্লেষণধর্মী পর্যায়ে। এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ দৃশ্যমান জগতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চেতনা, প্রেম, আত্মবিস্মৃতি ও রূপান্তরের রহস্য অন্বেষণ করেছেন। বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি অনেক সময়ই সরল প্রতীকের মাধ্যমে গভীর ভাব প্রকাশ করে—আলো, ছায়া, প্রতিচ্ছবি, নীরবতা ও আয়নার মতো অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে। এই গ্রন্থের অন্তর্গত “আরশি” কবিতাটি সেই প্রবণতার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত, যেখানে আয়না বা প্রতিবিম্বকে কেন্দ্র করে প্রেম ও সৃষ্টির রূপান্তরময় দর্শন নির্মিত হয়েছে।
কবিতার শুরুতেই ‘আরশি’ বা আয়নাকে এক নির্লিপ্ত, স্ফটিকস্বচ্ছ সত্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ যেমন আয়নায় নিজের ছায়া দেয়, আয়নাও ঠিক তেমন করেই সেই ছায়া ফিরিয়ে দেয়—না রাখে কিছু, না বদলে দেয় কিছু। চাঁদ-সূর্য আসে যায়, তাদের প্রতিবিম্ব আয়নায় ধরা পড়ে, কিন্তু আয়নার নিজের কোনো অধিকার বা আসক্তি নেই। এই অংশে রবীন্দ্রনাথ শিল্পসত্তার এক আদর্শ রূপকে ইঙ্গিত করেন—যে কেবল গ্রহণ ও প্রতিফলন করে, ব্যক্তিগত লাভের কোনো দাবি রাখে না।
কিন্তু কবিতার বাঁক ঘোরে দ্বিতীয় স্তবকে। এক বসন্তসন্ধ্যায় খেলাচ্ছলে নেওয়া একটি ‘ছায়া’ আর ফিরে আসে না। সেই ছায়া কবির প্রাণে প্রাণবান হয়ে ওঠে, তার গানে ধরা দেয়, সৃষ্টির অংশ হয়ে যায়। এখানে ছায়া আর নিছক প্রতিচ্ছবি নয়—তা হয়ে ওঠে সৃজনশীলতার বীজ। প্রেমের দান শিল্পীর অন্তরে প্রবেশ করে রূপান্তরিত হয়, নতুন মহিমা পায়।
শেষ অংশে কবি বলেন, এই রূপান্তরের কথা প্রিয়জন জানতেও নাও পারে। প্রেমের অমৃতস্নানে সেই ছায়া সীমা হারিয়েছে, ব্যক্তিগত খেয়াল ছেড়ে পূজার গৌরবে উত্তীর্ণ হয়েছে। পার্থিব স্বপ্ন ভুলে সে অমরাবতীর ফুলের সৌরভ পেয়েছে—অর্থাৎ মানবিক প্রেম শিল্পে রূপ নিয়ে চিরন্তনের স্তরে পৌঁছেছে।
“আরশি” কবিতাটি তাই কেবল প্রেমের কবিতা নয়; এটি শিল্পসৃষ্টির এক সূক্ষ্ম তত্ত্ব। প্রেম যখন স্রষ্টার অন্তরে প্রবেশ করে, তখন তা আর আগের মতো থাকে না—সে হয়ে ওঠে গান, কবিতা, শিল্প। বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থে এই কবিতা আমাদের শেখায়, সত্যিকারের সৃজনশীলতা হলো নিঃস্বার্থ গ্রহণ ও রূপান্তরের আনন্দ।
আরশি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার যে ছায়া তুমি দিলে আরশিরে
হাসিমুখ মেজে,
সেইক্ষণে অবিকল সেই ছায়াটিরে
ফিরে দিল সে যে।
রাখিল না কিছু আর,
স্ফটিক সে নির্বিকার
আকাশের মতো–
সেথা আসে শশী রবি,
যায় চলে, তার ছবি
কোথা হয় গত।
একদিন শুধু মোরে ছায়া দিয়ে, শেষে
সমাপিলে খেলা
আত্মভোলা বসন্তের উন্মত্ত নিমেষে
শুক্ল সন্ধ্যাবেলা।
সে ছায়া খেলারই ছলে
নিয়েছিনু হিয়াতলে
হেলাভরে হেসে,
ভেবেছিনু চুপে চুপে
ফিরে দিব ছায়ারূপে
তোমারি উদ্দেশে।
সে ছায়া তো ফিরিল না, সে আমার প্রাণে
হল প্রাণবান।
দেখি, ধরা পড়ে গেল কবে মোর গানে
তোমার সে দান।
যদিবা দেখিতে তারে
পারিতে না চিনিবারে
অয়ি এলোকেশী–
আমার পরান পেয়ে
সে আজি তোমারো চেয়ে
বহুগুণে বেশি।
কেমনে জানিবে তুমি তারে সুর দিয়ে
দিয়েছি মহিমা।
প্রেমের অমৃতস্নানে সে যে, অয়ি প্রিয়ে,
হারায়েছে সীমা।
তোমার খেয়াল ত্যেজে
পূজার গৌরবে সে যে
পেয়েছে গৌরব।
মর্তের স্বপন ভুলে
অমরাবতীর ফুলে
লভিল সৌরভ।
